”ছোটো…ছোটো…নারান হালদার, ছোটো।” বিড়বিড় করে সে নিজেকে বলল।
পায়ের জ্বালাটা এবার অসহ্য লাগছে। নারান উবু হয়ে বসে কেডস জোড়া খুলে হাতে নিয়ে, খালি পায়েই আবার ছুটতে শুরু করল।
”সারা জীবন পরিশ্রম করেছ, আর এটুকু পরিশ্রম করতে পারবে না? …ছোটো, ছোটো…থামছ কেন…পায়ের শির টেনে ধরছে? তা হলে কি শেষ করতে পারবে না?”
নারান দাঁড়িয়ে পড়েছে। ঝুঁকে বাঁ পায়ে হাত বোলাতে গিয়ে আবার সিধে হয়ে ছুটতে শুরু করল।
”টোলুবাবু, আপনি আমার সঙ্গে নেমেছিলেন। বলেছিলেন, ফাঁকা মাঠে গোল দিলে সম্মান থাকে না, অসম্মান নিয়ে জিতবে কেন? আমাকে সম্মান দিতে আপনি সে দিন নেমেছিলেন। …আর এই দেখুন এই রেসে এখন আমি সবার পিছনে একা ছুটছি। কেউ নেই সঙ্গ দেবার জন্য…বলেছিলেন স্পোর্টসম্যানশিপ দেখাতে জানি। টোলুবাবু, আপনি বলেছিলেন, নারান আমি ফিনিশ করবই। …আমি ফিনিশ করবই…স্পোর্টসম্যানশিপ…ডাকপিওনের মতো দরজায় দরজায় পৌঁছে দিতে হবে।”
নারান ছুটে যাচ্ছে একটা ঘোরের মধ্যে। সেই একই রাস্তা ধরে তার ফিরে—যাওয়া। যশোর রোড থেকে নজরুল ইসলাম সরণি। কৈখলি… রাস্তার ধারে টেবলে জল নিয়ে বসা লোকেরা আর নেই। পাততাড়ি গুটিয়ে নিয়ে তারা চলে গেছে।
বাগুইআটি। মোড়ে জমাট ভিড়। অবাক চোখে সবাই দেখছে। নারান কিন্তু কিছুই দেখছে না। শূন্য দৃষ্টি সামনে রেখে সে ছুটছে। যতক্ষণ ফুসফুস কাজ করবে থামা চলবে না।
একের পর এক, কেষ্টপুর, বাঙুর, লেকটাউন, শ্রীভূমি আর বাঁদিকে সল্ট লেক উপনগরী পিছনে রেখে নারান উল্টোডাঙা মোড়ে পৌঁছল। এবার বাঁদিকে ইস্টার্ন বাইপাস ধরে সোজা স্টেডিয়াম। বলে দিয়েছে, পাঁচ নম্বর গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতে হবে। একটা চক্কর দিয়ে থামতে হবে মঞ্চের সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে এমিল আর ডানা।
”আরে দেখে, দেখে মশাই, মোটরের সামনে পড়তেন যে।”
মাথা নাড়ল নারান। এসব কথা গ্রাহ্য করার মতো অবস্থা তার এখন নেই। সে ছুটছে, না হাঁটছে তাও সে জানে না। শুধু অনুভব করছে সে এগোচ্ছে, ফিনিশিং লাইনের দিকে ক্রমাগত নিজেকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।…পাঁচ নম্বর গেট তার চাই।
বাইপাসের ধারে টিনের ঘর। কয়েকটা বাচ্চচা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। জুতো হাতে নারানকে ছুটে আসতে দেখে তারা এগিয়ে এল। মজা পাওয়ার জন্যই তারা ওর পাশে পাশে ছুটতে শুরু করল। কিছু দূর গিয়ে তারা থেমে পড়ল।
বাঁ দিকে কাদাপাড়ার মাটির পাহাড়ে জঙ্গল। এবার বঁ দিকে স্টেডিয়ামের পাঁচিল ধরে এগোলে ঢোকার গেট। রাস্তাটা নির্জন! একটা মিনিবাস আসছে। নারান ধারে সরে গেল।
পাঁচ নম্বর গেট। খোলাই রয়েছে। ভিতরে ঢুকে বাঁ দিকে চক্কর শুরু করতে হবে।
নারান ডান হাতটা তুলল। কী সুন্দর, হলুদ, নীল রঙের চেয়ার দিয়ে ফুলের মতো সাজানো। সে কি কখনও ভেবেছিল এমন একটা জায়গায় দৌড়বে।
কিন্তু লোকজন কই। নিস্তব্ধ। কয়েকজন মজুর ছাড়া একটা লোকও নেই। এ কী, মঞ্চটা খোলা হচ্ছে কেন? এমিল কই, ডানা কই? নারান সমাপ্তি—সীমায় দাঁড়িয়ে টলতে শুরু করল।
ধুতি—শার্ট পরা এক প্রৌঢ় নারানকে দেখে, মঞ্চ খোলায় ব্যস্ত মজুরদের কাছ থেকে এগিয়ে এল।
”আপনি কি ম্যারাথন রেসে ছিলেন?”
”হ্যাঁ।”
লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
”সব গেল কোথায়?” নারান হাঁফাচ্ছে। চোখে মুখে হতাশা।
”সবাই তো চলে গেছে। ক’টা বাজে দেখেছেন?” লোকটি বাঁ হাত তুলে ঘড়ি দেখাল। ”এগারোটা পঞ্চাশ! এতক্ষণ কি কেউ বসে থাকে?”
”জ্যাটোপেক কোথায়, তাঁর যে থাকার কথা।”
”তাঁর কি আর কাজকর্ম নেই! আপনি আসবেন পাঁচ—ঘণ্টা পর, আর সেজন্য বসে থাকবেন? শেষ তো করেছে মাত্র দশজন, আপনি হলেন এগারো। দু’ঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছেছে মাত্র চারজন। আমি তখন ছিলাম না। শুনলাম ওদের কনগ্র্যাচুলেট করেই সস্ত্রীক তিনি চলে গেছেন। চাঁপাদানিতে ওদের রিসেপশন দেওয়া হবে?”
নারান শূন্য স্টেডিয়ামের চারধারে চোখ বোলাল। ধীরে ধীরে তার মুখে ফুটে উঠল অদ্ভুত এক হাসি। মাথা নাড়তে শুরু করল। সেই সঙ্গে তার হাসিটাও উজ্জ্বল হয়ে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়তে লাগল সারা মুখে।
সন্ধ্যাবেলায় পোঁটলা বদলে নারান বিধাননগর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছিল। তখন বছর পঁয়তাল্লিশ বয়সি, কোট—প্যান্ট—টাই—পরা একটি লোক তাকে কয়েকবার লক্ষ করে এগিয়ে এসে বলল, ”কিছু মনে করবেন না, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?”
”বলুন।”
”আচ্ছা আপনি কি এক সময় সাইকেলে ঝাউডাঙায় খবরের কাগজ বিক্রি করতেন?”
”হ্যাঁ।”
লোকটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ”ঠিক ধরেছি আমি। আপনাকে চিনতে পারলাম, কারণ আপনি এত বছরে…প্রায় ত্রিশ—পঁয়ত্রিশ তো হবেই, একটুও বদলাননি, একই রকম রয়ে গেছেন। আমি হলাম ঝাউডাঙার বাদল নস্করের নাতি। আপনার জন্য আমি রোজ তখন অপেক্ষা করতাম।”
নারান হাসিমুখে তাকাল। সেদিন এই লোকটি এক কিশোর ছিল। হ্যাঁ, মুখখানি চেনা ঠেকছে।
”আপনাকে আরও মনের রেখেছি কেন জানেন? …বোকার মতো বলেছিলাম, কে জ্যাটোপেক? …রেকর্ড তো কতই হচ্ছে কে মনে করে রাখে?”
”হ্যাঁ আমার মনে আছে।”
”তখন কত বোকা ছিলাম। …আপনি এখানে কোথায় এসেছিলেন?”
”এসেছিলাম এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে। একটু দেরি করে ফেলায় তার সঙ্গে আর দেখা হল না। তাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।”
