ফুটপাথে লোক দাঁড়িয়ে যাচ্ছে, বারান্দায় বাচ্চচা—বুড়ো, মেয়েরা। রবিবার সকালে ছুটির মেজাজ। এখন হালকা রোদ। নারানের কষ্ট হচ্ছে না। সে একই গতিতে দৌড়ে পৌঁছল উল্টোডাঙার মোড়ে। সামনেই একটা ব্রিজ। বোর্ডে লেখা রয়েছে : নজরুল ইসলাম সরণি। লোকে এটাকেই ভি আই পি রোড বলে।
”দাদা, আরও জোরে ছুটুন। সবাই যে এতক্ষণে লেকটাউনে পৌঁছে গেছে।” একজন চেঁচিয়ে বলল।
”লেকটাউন কী বলছেন! প্রথম ঝাঁকটা কতক্ষণ আগে গেছে জানেন?” আর একজন বলল।
নারান মাথা নামিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। শুনতে চায় না সে। এগুলোই প্রলোভন। এই সব কথাবার্তাই ধৈর্যচ্যুতি ঘটায়, তাতিয়ে দেয়। সে কোনও কথা শুনবে না, ডাইনে—বাঁয়ে তাকাবে না। রোজ সকালে যেভাবে দৌড়য় সেইভাবেই দৌড়বে।
মাথাটা একটু বাঁকিয়ে, রাস্তার দিকে তাকিয়ে নারান ছুটে চলল। পাশ দিয়ে বাস, মোটর, ট্রাম ছুটে যাচ্ছে। গাড়ির জানলা দিয়ে কৌতূহলী মুখ তাকে দেখছে। সে ভ্রূক্ষেপ করল না।
একটা মোটরবাইকে দু’জন অফিসিয়াল। তার পাশে এসে গতি মন্থর করে বলল, ”শেষ করতে পারবেন তো?”
”হ্যাঁ।” নারান ওদের দিকে তাকাল না।
”দু’ঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিটের মধ্যে ফিনিশ করতে হবে, না হলে কিন্তু তুলে নেওয়া হবে গাড়িতে।” বলেই ওরা বিকট শব্দ করে মোটরবাইকটা চালিয়ে দিল। নারান একবার মুখ তুলে দেখল, সামনে কোনও রানার আর চোখে পড়ল না।
রাস্তার ধারে টেবল পেতে গ্লুকোজ মেশানো জল, বরফ নিয়ে ভলেন্টিয়াররা রয়েছে। তেষ্টা পেয়েছে, কিন্তু খাওয়াটা কি উচিত হবে? ঘাম দিচ্ছে শরীরে। গেঞ্জি সপসপ করছে। সে একটা গ্লাস তুলে নিল।
”খুব পিছিয়ে আছেন।”
”আপনি ব্যস্ত হবেন না দাদা, যেমন যাচ্ছেন যান। ফিনিশটা করুন।”
”একটু হুঁশিয়ার থাকবেন। যশোর রোডে লরি আর বাস বড্ড বেপরোয়া চলে।”
গ্লাস রেখে মাথা হেলিয়ে হেসে নারান আবার ছুটতে শুরু করল। ফুসফুস সমান তালে কাজ করছে। ঊরু আর পায়ের গোছ ভারী লাগছে না। নারান নিরুদ্বিগ্ন বোধ করল। এয়ারপোর্ট হোটেল ছাড়িয়ে ডান দিকে ঘুরে সে আটকে গেল বাস আর সাইকেল রিকশর ভিড়ে। ট্র্যাফিক দেখার জন্য বিশেষ পুলিশ ব্যবস্থা আছে। কিন্তু আর কোনও রানার নেই ভেবে তারা ঢিলে দিয়েছে।
এইবার রাস্তা সত্যিই বিপজ্জনক। পিচবাঁধানো রাস্তার উপর দিয়ে ছুটতে তার ভয় করল। পিছন থেকে যে কোনও সময় গাড়ির ধাক্কা খাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে রাস্তার ধারের মাটির কাঁচা পথ ধরে ছুটতে শুরু করল। এখানেও পদে পদে বাধা। মানুষজন রিকশ, গোরুর গাড়ি, বাজার—ছোটা অসম্ভব।
এইবার তার বাঁ হাঁটুতে সামান্য একটা চিড়িক দিল। থমকে থমকে ছোটার জন্য তো বটেই, দু’ বার গর্তে পা পড়েছিল। পতন সামলাতে গিয়ে হাঁটুতে ধাক্কা লাগে। কাঁচারাস্তা ছেড়ে সে এইবার পিচের রাস্তায় উঠল। এখানেও ভাঙাচোরা, পাথরকুচি ছড়ানো। তবু কাঁচারাস্তার থেকে তো ভাল!
বিশাল একটা প্লেন নামছে তার মাথার উপর দিয়ে। এত কাছ থেকে নারান কখনও প্লেন দেখেনি। বড় একটা সাদা পাখির মতো ডানা ছড়িয়ে হালকাভাবে ভেসে এল। জানলায় মুখ দেখা যাচ্ছে। মেঘ গর্জনের বদলে একটা তীক্ষ্ন শিশের মতো শব্দ করে রানওয়েতে চাকা ছুঁইয়েই ঝাঁকুনি খেল। নারান দেখতে দেখতে দৌড়চ্ছিল, এবার মুখ ফিরিয়ে সামনে তাকিয়েই অবাক হল।
পুলিশের জিপ তার পিছনে ছ—সাতজন রানার ফিরে আসছে গঙ্গানগর থেকে। তাকে দেখে সবাই তাকাল। দু—তিনজন হাত তুলল। সবাই অল্পবয়সি। মাথায় টুপি, রোদ থেকে চোখ বাঁচানোর জন্য। আঠারো, চব্বিশ, ছাব্বিশ…এই ক’টা নম্বর সে পড়তে লাগল।
যাক। জোয়ান ছোকরারা আগে যাবে না তো কি ছেষট্টি বছরের বুড়ো প্রথমে যাবে!
আর একটু এগিয়ে সে আর কয়েকজনকে ফিরতে দেখল। সেই মোটরবাইক আবার তার কাছে এল।
”এইভাবে চললে ফিনিশ করবেন কখন? তেইশ জন ইতিমধ্যেই গাড়িতে উঠে পড়েছে।”
”উঠুক…আমাকে নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না…আমি শেষ করবই।
”কবে? আজকেই কি?” অধৈর্য, বিরক্ত প্রশ্ন।
নারান হাসল।
”আমরা কি সারাদিন স্টেডিয়ামে বসে থাকব ভেবেছেন?”
নারান জবাব দিল না। মোটরবাইক চলে গেল। আরও কয়েকজন রানার ফিরে চলেছে। ক্লান্ত পদক্ষেপ, চোখ মুখ বসা। দেখে মনে হল, আর একটু পরেই এরা বসে যাবে। একজন হুমড়ি খেয়ে রাস্তার উপর উপুড় হয়ে পড়ল। তাকে পাশ কাটিয়ে অন্যরা এগিয়ে গেল। কেউ ফিরে তাকালও না। একটা ভ্যান এসে দাঁড়াল। রানারটিকে দু’জন লোক ধরে তুলছে। নারানও আর তাকাল না। তাকে এখন অনেক পথ দৌড়তে হবে।
গঙ্গানগর কাটাখাল থেকে ফেরার সময় সে অনুভব করল, শরীরে গোলমাল ঘটছে। কোমরের পিছন দিকে একটা খচ—খচানি শুরু হয়েছে। আগে কখনও এখানে ব্যথা হয়নি। আজই প্রথম। বাঁ পায়ের ডিমের কাছে শিরাটা মাঝে মাঝে টেনে ধরছে। কেডসটা গরম হয়ে পায়ের তলা জ্বালা করছে। ফোসকা পড়ার মতো অবস্থা। রোদ্দুরে চোখ—করকরানি শুরু হয়েছে।
এইবার ক্লান্ত লাগছে। ঊরু দুটো ভার ভার লাগছে। একটু দাঁড়িয়ে জিরিয়ে নেবে কি? নারান মনে মনে ইতস্তত করল। এখন ক’টা বাজে?
.
না, ঘড়ি দেখবে না। আর সেজন্যই তো সে বাড়িতে হাতঘড়িটা রেখে এসেছে। সময় নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। তার দরকার দৌড়টা শেষ করা…জ্যাটোপেকের সামনে।
