স্টেডিয়ামটা সে দেখতে পাচ্ছে। আলোয় আলোয় ঝলমল করছে। থোকা থোকা বেলুন, পতাকা। দেখে নারানের মন ভরে উঠল খুশিতে, শরীরে চনমনানি লাগল।
”ভাই, জ্যাটোপেক কি এসেছিলেন?” নারান মাঝবয়সি একজনকে জিজ্ঞেস করল। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ, অল্প অল্প ঠাণ্ডা, কিন্তু লোকটি ঘামছে।
”হ্যাঁ। এই তো চলে গেলেন।”
”চলে গেলেন!” নারানের ভিতরটা চোপসানো বেলুন হয়ে গেল। দেখা হল না।”একটু দেরি হয়ে গেল।” আপনমনে সে বলল।
লোকটি অবাক হয়ে বলল, ”একটু বলছেন কী, জ্যাটোপেকের প্লেন কত দেরি করে এসেছে জানেন?”
”সাড়ে চারঘণ্টা, শুনলাম।”
”তবে? তার ওপর এই মিসম্যানেজমেন্ট।”
”ওঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে তো?” উৎকণ্ঠিত দেখাল নারানকে।
”নিশ্চয় হয়েছে। আমি কিছুই দেখতে পাইনি। বক্তৃতার একটু একটু কানে এল, এই পর্যন্তই।” লোকটি পা বাড়াল যাবার জন্য, নারান তার হাত টেনে ধরল।
”কী বললেন?”
লোকটি হাত ছাড়িয়ে বিরক্তভাবে বলল, ”শুধু টাকা রোজগারটাই খেলোয়াড়—জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়” লোকটি চলে যেতে গিয়েও আবার ঘুরে দাঁড়াল। ”আর একটা কথা বলেছেন, ”একজন অ্যাথলিট আসলে একজন ডাকপিওনের মতো। তার সামাজিক দায়িত্ব আছে। সেটা পালনের জন্য তাকে দরজায় দরজায় ঘুরতে হবে। এখন আর খেলা শুধুই মজার জিনিস নয়।”
লোকটি ভিড়ে মিশে যাবার পরও নারান তাকিয়ে ছিল। কথাগুলোর অর্থ সে ধরতে পারছে না। অ্যাথলিট দরজায় দরজায় ঘুরে ডাকপিওনের মতে কড়া নেড়ে চিঠি পৌঁছে দেবে, মানে খবর পৌঁছে দেবে। কী খবর পৌঁছে দেবে। স্পোর্টসম্যান হও! জীবনের সর্বক্ষেত্রে খেলোয়াড়ি মনোভাব দেখাও! জীবনে হারজিতকে সমানভাবে হাসিমুখে মেনে নাও…এইসব খবর কি পৌঁছে দেওয়া খেলোয়াড়দের কাজ?
রাতে বড় হলঘরে সারি দিয়ে শোওয়া অ্যাথলিটদের সঙ্গে নারানও আলোয়ান মুড়ি দিয়ে শুয়ে ভেবে যাচ্ছিল। তার কানে এল একজনের নিচুগলার কথা : ”আমি তো দশ—বারো মাইল দৌড়েই বসে যাব। কী লাভ বল এইসব আজেবাজে কম্পিটিশনে মিছিমিছি দৌড়ে? কী পাব? একটা সার্টিফিকেট আর কিছু স্যুভেনির! তার জন্য এই পরিশ্রম করব কেন?”
”ঠিক বলেছিস। ন্যাশানাল মিট হলেও নয় কথা ছিল, চাকরিতে কিছু সুবিধে করা যেত। স্টেট আমাকে কী দেয় যে বাংলার হয়ে নামব? ন্যাশনাল মিটে আমার সিলেকশন পাওয়ার জন্যই তো তুই এখানে নামছিস? আমার ওসব চিন্তা নেই, আমি অটোমেটিক সিলেকশন পাব আমার অফিস স্টিল অথরিটি থেকে।”
”বাংলা থেকে ক’জন কাল নামছে জানিস? মোটে বারোজন!”
”বলিস কী!”
”হ্যাঁ। এর মধ্যে আট জন জীবনে কখনও আগে ম্যারাথনই করেনি। বোঝ তা হলে?”
”বারোজনে আটজন নভিস?”
”শুধু তাই নয়, কাউকে বলিসনি, আমি খুব ভাল জায়গা থেকেই শুনেছি, তার মধ্যে একজনের বয়স নাকি ষাটের ওপরে!”
”সেরেছে। পথেই কোলাপস করে, মরে টরে না যায়!”
”ফিনিশ করার সময় বেঁধে দিয়েছে—দু’ ঘণ্টা পঞ্চাশ মিনিট। ওর মধ্যে পৌঁছতে না পারলে রাস্তা থেকেই কম্পিটিটারদের তুলে নেওয়া হবে। দেখা যাক, অতক্ষণ ক’জন দৌড়তে পারে।”
দাঁতে দাঁত চেপে নারান শুনল এই কথোপকথন। মুখ ঢাকা আলোয়ানটা আর একটু টেনে সে কাত হয়ে গেল। কাল তাকে শেষ করতেই হবে। কিছুতেই সে নিজেকে তুলে নিতে দেবে না। যেভাবেই হোক। …হেঁটে হেঁটে, হামাগুড়ি দিয়ে… যেভাবেই হোক, সে দরজায় দরজায় যাবে…কড়া নাড়বে। খট খট খট…খট…খট…খট…। কড়া নাড়তে নাড়তে নারান ঘুমিয়ে পড়ল।
সকাল সাতটায় স্টেডিয়াম—ফটক থেকে রওনা হল সাতান্নজন। নারানের বুকে আঁটা নম্বর হল: ৫১। শ্যামলবাবু তা হলে ঠিকই বলেছিলেন, যা বলেছিল কর্তারা, তার অর্ধেকও হয়নি। নারান একটু দমে গেল। তার চারপাশে সবাই অচেনা। যে রাস্তা দিয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসতে হবে সেটা অবশ্য তার চেনা। বাসে কয়েকবার সে ধান্যকুড়িয়া থেকে কলকাতায় এসেছে।
দৌড়ের রুট খুব সহজ। প্রথমে দক্ষিণ মুখে রওনা। ইস্টার্ন বাইপাস থেকে ডাইনে বেলেঘাটা মেইন রোড। তারপর আবার ডাইনে ফুলবাগান। এরপর সোজা উত্তরে দমদম এয়ারপোর্টের রাস্তা ধরে, সি আই টি রোড কাঁকুড়গাছি মোড়, উল্টোডাঙার মোড়, কেষ্টপুর মোড়, বাগুইআটি মোড়, কৈখালি পিছনে ফেলে যশোর রোড। ডান দিকে পুবে ঘুরে মধ্যমগ্রাম, বারাসত যাবার বাসরুট ধরে, এয়ারপোর্টের পাঁচিল ডানদিকে রেখে ছুটতে হবে। তারপর একসময় আসবে একটা মোড়। যশোর রোড বাঁ দিকে ঘুরে মধ্যমগ্রামের দিকে, আর একটা রাস্তা সোজা গিয়ে গঙ্গানগরের মধ্য দিয়ে কাটাখালের পোল পার হয়ে বাঁ দিকে ঘুরে আবার মিশেছে যশোর রোডে। এই কাটাখালের পোল পর্যন্ত গিয়ে ম্যারাথনারদের ফিরে আসতে হবে সল্ট লেক স্টেডিয়ামে।
মন্থরভাবে সবাই শুরু করল। নারান রয়েছে ঝাঁকের মাঝে। এত লম্বা রেসে আরম্ভ থেকেই কেউ জোরে দৌড়য় না। দম যাতে শেষ পর্যন্ত থাকে, সেটাই আগে দেখতে হবে। নারান ঠিকই করে রেখেছে, কোনওভাবেই জোরে ছোটার জন্য প্রলোভিত হবে না। কচ্ছপ আর খরগোশের গল্পটা আজ সকালেও তার মনে পড়েছে। তাকে স্লো আর স্টেডি থাকতে হবে।
নারান ফুলবাগানের মোড় থেকে দেখল সে সবার পিছনে। সবার আগে সাদা পতাকা বাঁধা একটা মোটর, তার আগে একটা পুলিশভ্যান। প্রথমে যাচ্ছে যে রানার সে তাকে দেখতে পেল না। দেখার চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই। তার সামনে শুধু অনেক মাথা আর কাঁধ, দুলছে, ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে উঠছে। যাক সবাই এগিয়ে, সে প্রাইজ জেতার জন্য দৌড়চ্ছে না।
