”কিন্তু ওরা পঞ্চাশ বছর বয়সিকেও কি দৌড়তে দেবে?” শশধর সন্দেহ প্রকাশ করল।
”দেখা যাক। নারানদা তা হলে কাল ছ’টায়, সিটি টেন্টের সামনে।”
নারান যখন চলে যাচ্ছে, ওরা তিনজনই মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে তাকে দেখতে লাগল।
”রোজ দেড়ঘণ্টা দৌড়োনো কি সোজা ব্যাপার! অতক্ষণ হাঁটতে বললে তো পারব না।”
”এই বয়সে!”
”গাঁজা দিয়ে গেল না তো।”
পরদিন সাড়ে পাঁচটা থেকেই নারান দাঁড়িয়ে রইল সিটি টেন্টের সামনে। শ্যামল এল ছ’টায়।
”দেরি হয়ে গেল। চলুন ক্যান্টিনে চা খাওয়া যাক। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন তো…যা ট্র্যাফিকের অবস্থা!”
চা খেতে খেতে শ্যামল নিচু গলায় বলল, ”বয়স টয়স যা বলার আমি বলব, আপনি শুধু সায় দিয়ে যাবেন।”
চা খাওয়ার পর শ্যামল তাকে টেন্টের বাইরে একটা চেয়ারে বসিয়ে রেখে ভিতরে গেল। নারান দুরু দুরু বুকে তাকিয়ে রইল। জনা চারেক লোক টেবলে, শ্যামল তাদের সঙ্গে কথা বলছে। নোটবই বার করে কী সব টুকতে লাগল। নারানের মনে হল, শ্যামলের সঙ্গে ওদের সর্ম্পকটা যথেষ্টই ভাল, বন্ধুর মতোই।
মিনিট—পনেরো পর শ্যামল তার কাছে এসে বলল, ”হয়ে যাবে। এন্ট্রি ফর্মটা নিন।”
ফর্মটা হাতে নিয়ে নারান অবিশ্বাসীর মতো দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বলল, ”হবে? সত্যি!”
”হবে না? এত মিথ্যে কথা তা হলে কী জন্য বললুম! দিল্লিতে ম্যারাথনে ফিফটিনথ, পুণে ম্যারাথনে এইটিনথ, আপনি তো উত্তরপ্রদেশের গোরখপুরের লোক, এখন বাংলায় থাকেন…সার্টিফিকেট দেখাবেন কী, আমার মুখের কথাই তো যথেষ্ট! আসলে কী জানেন—”নারানের কনুই ধরে শ্যামল তাকে টেনে আনল বাইরে ফুটপাথে। ”আসলে যত এন্ট্রি পাবে ভেবেছিল তা আর পাচ্ছে না। বাংলার প্রথম সারিতে পড়ে যারা, তারা নামছে না। বলল, বাইরে থেকে বিরাশি জন বাংলার বাহান্ন জন, মোট একশো চৌত্রিশ জন নামবে। কিন্তু কথা শুনে মনে হল এর অর্ধেকও হবে না। প্রাইজ মানি নেই তো, তাই নামকরাদেরও কোন উৎসাহ নেই। …আপনার বয়স সম্পর্কে আমি কোনও উচ্চবাচ্য করিনি। যা বলার এন্ট্রি ফর্মে লিখে দেবেন।”
”কিন্তু জ্যাটোপেকের সামনে ফিনিশ করবে, এর থেকে বড় প্রাইজ আর কী হতে পারে!” নারান অবাক হয়ে তাকাল শ্যামলের দিকে।
”আরে দূর! জ্যাটোপেকের নামই এরা শোনেনি। আপনাদের সময়ের হিরো ছিল বলে কি এখনও তাই থাকবে? খেলার দুনিয়ার আজ যে ওয়ার্লড রেকর্ড করে হিরো, কালই আর একজন সেটা ভেঙে দিয়ে হিরোকে জিরো করে দিচ্ছে।”
”কিন্তু জ্যাটোপেকের তিনটে বড় দৌড় সাতদিনের মধ্যে জেতা…আজও তো পৃথিবীতে কেউ পারল না!”
”পারবে। স্পোর্টস টেকনোলজি তেমন অ্যাথলিক ঠিকই তৈরি করে দেবে। বাহান্ন সালে মানুষ মহাকাশে যাবার কথা ভাবতেই পারেনি আর এখন তো ডজন ডজন যাচ্ছে আর আসছে।”
নারান চুপ করে গেল। শ্যামলের কথাগুলো মিথ্যে নয়। তবু সে কেন জানি মন থেকে সায় দিতে পারল না। মানুষের শরীরের এতবড় একটা কৃতিত্ব বিজ্ঞান ভেঙে দেবে?
পরদিনই সে এন্ট্রি ফর্ম পুরণ করে শ্যামলের হাতে দিল জমা দেবার জন্য।
।। ৭।।
রবিবার সকাল সাতটায় যখন তারা সল্ট লেক স্টেডিয়ামের ফটকের সামনে দাঁড়াল তখন অল্প কয়েকজন অফিসিয়াল ছাড়া আর ছিল বেলেঘাটার স্থানীয় কয়েকজন দর্শক। নারান গত রাত্রেই এসে স্টেডিয়ামের একতলায় একটা বড় ঘরে অন্যদের সঙ্গে ছিল।
নারান ছেলেদের কিছু বলেনি। সে ধরেই নিয়েছে, বললে অবশ্যই ওরা তাকে ম্যারাথন দৌড়তে বাধা দেবে। শুধু মহামায়কে সে বলেছিল, ”একটা রোড রেস হবে কলকাতায়। অফিসের তিন—চারজন নাম দিয়েছে, আমিও দিয়ে দিলাম।”
”কতটা দৌড়তে হবে?” মহামায়া জানতে চায়।
”বেশি নয়, দু’ মাইল। ভোরবেলায় শুরু হবে, তাই রাতে ওখানে গিয়ে থাকতে হবে। থাকার জায়গা ওরাই দেবে, খাওয়াও। আমাকে নিয়ে যেতে হবে বিছানা আর মশারি। তুমি হাওয়া—বালিশ, সুজনি আর আলোয়ানটা দাও। মশারি লাগবে না। একটা রাত তো, কত আর কামড়াবে!”
”কী প্রাইজ দেবে? রুপোর কাপ?”
”হ্যাঁ। তবে আমি পাচ্ছি না। এই বয়সে কি জেতা যায়!”
”মোটে দু’ মাইল তো! একটু জোরেই শুরু থেকে ছুটবে।”
মহামায়ার অলক্ষে নারান হেসেছিল।
শনিবার সে অফিসে ছুটি নিল। দুপুরে ঘুমিয়ে ছ’টা চব্বিশের ট্রেন ধরল। বিধাননগর স্টেশনে নেমে উল্টোডাঙা—ভি আই পি রোডের মোড়ে এসে দেখল প্রচুর লোক। হেঁটে, লরিতে তারা ফিরছে। একজনের কাছে শুনল, এমন মিছিল হয়েছে যে সারা কলকাতায় ট্র্যাফিক জ্যাম! লোকেদের খুব অসুবিধা হয়েছে। ব্রিগেড প্যারেড মাঠ থেকে সল্ট লেক স্টেডিয়াম প্রায় আট মাইল পথ। স্কুলের বাচ্চচা বাচ্চচা ছেলেমেয়েরা হেঁটে আসতে পারছিল না। অনেকে কান্না জুড়ে দিয়েছিল। সন্ধ্যার পরও মিছিলের শেষভাগ স্টেডিয়ামে পৌঁছতে পারেনি।
ইস্টার্ন বাইপাস দিয়ে স্টেডিয়ামের দিক থেকে যারা হেঁটে ফিরে আসছে তাদের একজনকে সে জিজ্ঞেস করল, ”জ্যাটোপেক এসেছেন কি?”
”আরে দূর মশাই জ্যাটেপেক! ব্রিগেড গ্রাউন্ডে অপেক্ষা করে করে শুনলাম তাঁর প্লেন সাড়ে চারঘণ্টা লেট। এতটা পথ হেঁটে এসে আর মশাই পারছি না। স্টেডিয়ামের কাছে যা ভিড়, ধাক্কাধাক্কি, তাতে আর ভেতরে যেতে ইচ্ছে করল না। কাগজে কাল ছবিতেই ওঁকে দেখে নেব।”
লোকটিকে বিরক্ত, ক্লান্ত দেখাচ্ছে। নারান আর কোনও প্রশ্ন না করে ইস্টার্ন বাইপাস ধরে হাঁটতে শুরু করে। যত এগোচ্ছে ভিড় ততই বাড়ছে। বিছানার পোঁটলাটা বগলে নিয়ে চলতে অসুবিধা হচ্ছে। রাত বেশি হয়ে যাবার ভয়ে, ছোট ছেলে মেয়ে নিয়ে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা স্টেডিয়ামে না ঢুকেই ফিরে যাচ্ছেন। নারানের মনে হল, এত বিশৃঙ্খলা বোধহয় সে জীবনেও দেখেনি।
