সন্ধ্যার সময় সে খেলার বিভাগে অনাদিবাবুর সামনে দাঁড়াল।
”কী ব্যাপার নারান, অফিস স্পোর্টস তো হয়ে গেছে, তা হলে আবার যে তুমি…এবারই তো ছিল শেষবারের মতো মাঠে নামা?” অনাদিবাবু প্রশ্নটা করার সময় স্বর নামিয়ে নিলেন। নারান লক্ষ করল, ওঁর মাথার চাঁদিতে টাক পড়েছে। অনাদিবাবুর চাকরিও প্রায় তিরিশ বছর হতে চলল।
”নারানদাকে একটা ফেয়ারওয়েল দিতে হবে যেদিন ফাইনালি রিটায়ার করবেন।” শ্যামল বলল।
”স্পোর্টস থেকে না চাকরি থেকে রিটায়ারমেন্টের ফেয়ারওয়েল, শ্যামল?” শৈলেন পকেট থেকে নোটবই বার করে টেবিলে রাখল। ”নারানদাকে দেখে তো মনে হচ্ছে, আরও বছর দশেক প্রাইজগুলো নিতে পারেন। …শশধর মোহনবাগান টু ফিফটি টু অল আউট, অরুণলাল হান্ড্রেড টেন। …আমি ক্যান্টিন থেকে ঘুরে আসছি।”
”একটা কথা ছিল অনাদিবাবু।” নারান ঝুঁকে, লাজুক স্বরে বলল, ”খবর দেখলাম, একটা আমন্ত্রণী ম্যারাথন প্রতিযোগিতা হবে, জ্যাটোপেক তার ফিনিশিংয়ে রানারদের অভিনন্দন জানাবেন। …সত্যি?”
”ও অ্যাথলেটিকসের ব্যাপার, তুমি বরং শ্যামলকে জিজ্ঞেস করো। ওই খবরটবর করে।”
নারান টেবল ঘুরে শ্যামলের পাশে গেল।
সে জিজ্ঞেস করার আগেই শ্যামল বলল, ”হ্যাঁ, জ্যাটোপেক থাকবেন ফিনিশিং পয়েন্টে।”
”অভিনন্দন জানাবেন…মানে হ্যান্ডশেক করবেন?”
”হ্যান্ডশেক করবেন কি আলিঙ্গন করবেন, তা আমি কী করে বলব? হয়তো গালে চুমুও খেতে পারেন…সাহেব তো!” শ্যামল গোছা করা কপি টেনে নিল।
”আমি ম্যারাথনে নামব…ব্যবস্থা করে দেবেন?”
এত মৃদু স্বরে নারান কথাটা বলল যে, টেবলের কেউই শুনতে পেল না। সে সেকেন্ড কুড়ি অপেক্ষা করে, একটু জোরে বলল, ”যে ম্যারাথনটা হবে তাতে আমি দৌড়তে চাই…শ্যামলবাবু আপনার তো চেনাশোনা…।”
”কী বললেন?” সিধে হয়ে বসল শ্যামল। ”আর একবার বলুন!”
”ম্যারাথনে আমি দৌড়ব।”
নারান এবার স্পষ্ট স্বরে বলল। তিনজনের মুখের উপর চোখ বুলিয়ে, পাতলা হাসিতে মুখ ভরিয়ে সে আবার বলল, ”কোথায় কাদের কাছে নাম দিতে হবে জানি না। আমায় দেখলে হয়তো তারা নাম নিতে রাজি হবে না, তাই আপনাদের সাহায্য চাই।”
কিছুক্ষণ কেউ কোনও কথা বলল না। তিনজনই তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। অবশেষে অনাদিবাবু একটু বিরক্ত স্বরেই বললেন, ”নারান এটা অফিসের স্পোর্টস নয়…ম্যারাথন কী জিনিস জানো?”
”ছাব্বিশ মাইল তিনশো পঁচাশি গজ…”
”দূরত্বটা কতখানি সে সম্পর্কে কোনও ধারণা আছে?” শ্যামল জানতে চাইল।
”প্রায় অতটাই আমি রোজ সাইকেল চালিয়ে কাগজ বিলি করেছি, আট বছর ধরে।”
”কবে?” শশধর তার জ্যেষ্ঠদের কথার মাঝে নিজের প্রশ্নটা গুঁজে দিল।
”তা প্রায় ছাব্বিশ—সাতাশ বছর আগে।”
”আর তারই জোরে আপনি এখন ম্যারাথন দৌড়তে চান?” শ্যামল ভ্রূ তুলে, কপালে ভাঁজ ফেলে তেরছা চোখে তাকাল।
”গত কুড়ি বছর ধরে রোজ সকালে আমি দৌড়ই। আমার বউ হাঁটে। …কুড়ি বছর ধরে, আমরা দু’জনে…বৃষ্টি হলে অবশ্য বেরোই না, মাটি পিছল হয়ে থাকে।”
”ক’ মাইল দৌড়ন?”
”তা কি আমি মেপে দেখেছি? পাঁচটার সময় বেরোই, সাড়ে ছ’টার মধ্যে ফিরে আসি। বউকে রান্না করতে হবে, আমাকে অফিসের ট্রেন ধরতে হবে তো।”
”দেড় ঘণ্টা! তার মানে…।” শ্যামল জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল অনাদিবাবুর দিকে। ওই সময়ের মধ্যে কতটা দৌড়োনো সম্ভব সেটারই আন্দাজ পাবার জন্য সে সাহায্য চাইছে।
”দেড় ঘণ্টায় কতটা দৌড়বে, শশধর?” অনাদিবাবু সাহায্য চাইলেন, বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকা শশধরের কাছে।
”দেড় ঘণ্টায়…তা ধরুন গিয়ে…এখন তো পুরুষদের ম্যারাথন দু’ঘণ্টা দশ মিনিটে দৌড়োনোটাই ইন্টারন্যাশনাল স্টান্ডার্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে।” শশধর গাম্ভীর্য টেনে দিল মুখের উপর।
”তুমি কি বলতে চাও, নারান রোজ একটা থ্রি—ফোর্থ ম্যারাথন দৌড়য়? কী যে বলো!”
”না না তা বলছি না,” শশধর কাঁচুমাচু হল। ”নারানদের পক্ষে…আচ্ছা এখন আপনার বয়স ঠিক কত?”
”ছেষট্টি।”
”অ্যাঁ!” শুধু শশধরেরই নয়, আরও দু’ জোড়া চোখ নারানের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
”পুরো ছেষট্টি নয়, এখনও সাতমাস বাকি। ওঁর আর আমার জন্ম তারিখ একই, উনিশে সেপ্টেম্বর।” নারানের স্বরে ঈষৎ গর্ব চাপা রইল না।
”ওঁর মানে?” শ্যামলের প্রশ্ন।
”জ্যাটোপেকের।”
”কিন্তু নারান, এই বয়সে তুমি ম্যারাথনে নামবে! কেন? এখন তো বানপ্রস্থে যাবার কথাই তোমার ভাবা উচিত।”
”অনাদিবাবু, আজীবন সংসারের জন্য খেটে এসেছি। বানপ্রস্থ ফ্রস্থ নিয়ে মাথা ঘামাবার টাইম আর পেলাম কই? ম্যারাথন মানে তো অন্য এক জীবনের অভিজ্ঞতা পাওয়া! এইটে পাওয়া হলেই রিয়াটার করব সব জায়গা থেকে।…আমার জন্য যদি আপনারা একটু ব্যবস্থা করে দেন।” নারান হাত জোড় করল।
নারানের কণ্ঠস্বরে এমন এক মিনতি, উৎকণ্ঠা, অসহায়তা আর সারল্য মিলিয়ে রয়েছে যা প্রত্যেকের মন ছুঁয়ে গেল।
শ্যামল বলল, ”ঠিক আছে, নারানদা কাল আপনি ঠিক ছ’টায় সিটি টেন্টের সামনে থাকবেন। ওখানেই অ্যাথলেটিকসের কর্তাদের পাওয়া যাবে। আমি আপনাকে নিয়ে গিয়ে কথা বলব। তবে একটা কথা, ওরা যদি আপনার বয়সের জন্য রিসক নিতে না চায়, তা হলে কিন্তু আমি কিছু করতে পারব না।”
”নারানকে তো অনায়াসে পঞ্চাশ বলে চালানো যায়, যায় না শশধর? ওর মুখের চামড়া কোঁচকায়নি, ঝুলে পড়েনি। চুল তো সবই কালো শুধু কয়েকটা মাত্র সাদা হয়েছে।” অনাদিবাবু বললেন।
