নারান অনেকক্ষণ খবরটার দিকে তাকিয়ে রইল। তা হলে সত্যিই ওঁরা আসছেন। গড়ের মাঠে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড থেকে শনিবার দুপুর একটায় মিছিল বেরিয়ে যাবে সল্টলেক স্টেডিয়ামে। জ্যাটোপেক—দম্পতি এগারোটায় দমদমে নামবেন। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হবে ব্রিগেড প্যারেড মাঠে। তাঁরা মিছিলের সূচনা করবেন।
খবরের আর কিছু জানার দরকার সে বোধ করল না। এমিলকে যদি কাছ থেকে দেখতে হয় তা হলে ব্রিগেড মাঠের বিরাট ভিড়ের মধ্যে গিয়ে লাভ নেই। পরে ওঁদের সল্টলেক স্টেডিয়ামেও নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু সেখানেও ভিড় হবে। ধাক্কাধাক্কিতে কোথায় যে ছিটকে যাবে তার ঠিকঠিকানা নেই। সে কাছের থেকে ওঁদের দুজনকে দেখতে চায়।
ঠিক তিরিশ বছর আগে, মোহনবাগান মাঠে ওঁর দৌড়ের ছবি বেরিয়েছিল কাগজে। ছবিটা নারান কেটে রেখে দিয়েছে। জ্যাটোপেক সম্পর্কে একটা লেখাও তখন বেরিয়েছিল, টোলুবাবুর লেখা। সেটাও সে কেটে রেখে দিয়েছে।
নারান খাটের নীচে হামা দিয়ে ঢুকে কবজা—ভাঙা একটা টিনের তোরঙ্গ বার করে আনল। এর মধ্যে তার পুরনো জিনিস রাখা আছে। নানারকমের রেশমের, পশমের ছেঁড়া জামা—কাপড়, কাঠের ভাঙা খেলনা, সাইকেলের টিউব, স্পোর্টসের স্মারক পুস্তিকা ঘেঁটে সে একটা খাম বার করল।
খবরের কাগজ থেকে কেটে নেওয়া কয়েকটা টুকরো। লালচে হয়ে গেছে। তারই একটা জ্যাটোপেকের দৌড়ের ছবি। সন্তর্পণে সে ভাঁজ খুলল। হাতকাটা গেঞ্জি, পায়ে জুতো। ওঁর পিছনেই খালি পায়ে একজন অনুসরণ করছে। দেখা যাচ্ছে ট্র্যাকের দাগ, ওলটানো একটা মাটির গ্লাস। পিছনে গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে দর্শকরা, মাটিতেও বসে আছে অনেকে। জ্যাটোপেকের মাথার সামনের দিকের চুল উঠে গেছে। তখন ওঁর বয়স ছিল ছত্রিশ। নারানের মনে হল, এত বছর কেটে গেছে, এখন বয়স ছেষট্টি, নিশ্চয় টাক পড়ে গেছে! ডান পায়ের হাঁটু উঠিয়েছেন, ঊরুর পেশিতে একটা ভাঁজ। নারান অনুমান করতে পারল, কী প্রচণ্ড শক্তি ওই ভাঁজটা থেকে কুঁচকি পর্যন্ত ফুলে—ওঠা অংশে জমা হয়ে আছে।
কিন্তু দৌড়ের সময় ওঁর মুখে নাকি কষ্টের ভাব ফুটে ওঠে, অথচ খুব খুঁটিয়ে দেখেও সে তেমন কিছু খুঁজে পেল না। হয়তো সহজ রেস, তাই সহজ ভাবে দৌড়চ্ছেন। উনি তো জানেনই পৃথিবীতে তাঁকে হারাবার মতো কেউ তখন নেই। অফিসের স্পোর্টসে অমন আলগা মেজাজে সেও তো দৌড়ত। মুগ্ধ চোখে অনেকক্ষণ ছবিটা দেখে সে কাগজের আর—এক টুকরো তুলে নিল।
টোলুবাবুর লেখা। চার ভাঁজ করে রাখা। খোলা মাত্র ভাঁজ থেকে কেটে আলাদা হয়ে গেল কাগজটা। সযত্নে আবার তুলে রাখতে গিয়ে সে কী মনে করে একটা টুকরো তুলে পড়তে শুরু করল :
‘তারপর ১৯৫২ সালে হেলসিঙ্কি ওলিম্পিকে ৫০০০ মিটার, ১০০০০ মিটার এবং ম্যারাথন দৌড়ে বিজয়ীর মঞ্চে যখন উঠে দাঁড়ালেন, তখন দৌড়ের বিস্ময়, নব—ইতিহাসের স্রষ্টা এবং রক্তমাংসের বাষ্পীয় যান নামে অভিহিত করল তাঁকে বিশ্বের অগণিত নরনারী। পঞ্চদশ ওলিম্পিকের নতুন নামকরণ করল জনসাধারণ ওই বিজয়ী বীরের নামে—হেলসিঙ্কি ওলিম্পিক—জ্যাটোপেকের ওলিম্পিক।’
নারান আর একটা কাগজের টুকরো তুলে নিল।
‘কিন্তু এইখানেই শেষ নয়। স্বামীর কৃতিত্বে উদ্বেলিত হৃদয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে এলেন ওই দৌড়বীরের সাধ্বী স্ত্রী। সহধর্মিণী শুধু নন, সহকর্মিণী হিসাবে স্বামীর গৌরবকে আরও গৌরবান্বিত আরও মহিমান্বিত করার জন্য এগিয়ে এলেন বর্শা হাতে বীর নারী। বর্শা ছুড়ে দিলেন প্রিয় স্বামীকে স্মরণ করে। ঝলসিয়ে উঠল সূর্যকিরণে সেই বর্শাফলক। তির বেগে এগিয়ে চলল সেই বর্শা। শ্যামল কোমল দূর্বাদলের মধ্যে যখন সেই শাণিত বর্শার মুখ গিয়ে বিঁধল মাটিতে তখন বিচারকেরা বিস্মিত বিস্ফারিত নেত্রে তাকিয়ে রইলেন সেই কম্পমান বিদ্ধ বর্শার দিকে। ঘোষণা করা হল বর্শা নিক্ষেপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নূতন ওলিম্পিক রেকর্ড। স্বামী—স্ত্রী উভয়ে উভয়ের গৌরবে আলিঙ্গন করলেন একে অপরকে।’
পড়তে পড়তে আচ্ছন্ন হয়ে গেল নারান। কী মিষ্টি ভাব, কী মিষ্টি ভাষা দিয়ে টোলুবাবু লিখেছেন। চোখের সামনে যেন ঘটনাটা দেখা যায়।
”কী দেখছ অমন করে ছেঁড়া কাগজে?” মহামায়া পিছন থেকে বলল।
”কিছু না, পুরনো একটা খবর।” নারান কাগজগুলো যত্ন করে খামে ভরে পিছনে তাকাল।
”আজকের কাগজ কি পড়া হয়েছে? নবু চাইছে একটা খবর দেখার জন্য।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিয়ে যাও।” কাগজটা মহামায়ার হাতে দেবার আগে সে আর—একবার খেলার পাতাটায় চোখ বোলাল। আমন্ত্রণী ম্যারাথন প্রতিযোগিতার খবরটার নীচে ঘন গভীর কালো অক্ষরে লেখা। লাইনগুলোয় তার চোখ আটকে গেল। ‘সোমবার সন্ধ্যায় সিটি ক্লাব তাঁবুতে জ্যাটোপেক—দম্পতিকে বাংলার অ্যামেচার অ্যাথলেটিক সংস্থা সংবর্ধনা জানাবেন। তিনি আরও বলেন তখন ম্যারাথন বিজয়ীর হাতে ট্রফি তুলে দেবেন সেই কিংবদন্তির মানুষটিই যিনি বলেছিলেন, ‘দৌড়তেই যদি চাও তা হলে দৌড়ও এক মাইল। যদি অন্য এক জীবনের অভিজ্ঞতা চাও তা হলে দৌড়ও ম্যারাথন।’
অন্য এক জীবন!
কী সেই জীবন? কেমন সেই জীবন?…তার হাত থেকে কাগজটা তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল মহামায়া। নারান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আবার ভাবল, এখন আমার বয়স ছেষট্টি, আর কী অভিজ্ঞতা, আর কী জীবন বাকি আছে?
