নারানের যা জানার তা জানা হয়ে গেছে। জ্যাটোপেকের আসার কথাটা তা হলে সত্যিই। টোলুবাবুকে একদিন বলেছিল, জীবনে এত বড় দুঃখ সে আর কখনও পায়নি। ওঁকে দেখার ওই প্রথম আর শেষ সুযোগ সে হারিয়েছে। তখন টোলুবাবু বলেছিলেন কোনটে বড় আর কোনটে ছোট দুঃখ, সে সবের হিসেব কষে শুধু মন খারাপ আর সময় নষ্ট হয়। …জীবনে এমন একদিন আসবে যখন জ্যাটোপেককে তোর আনইম্পর্ট্যান্ট মনে হবে।
তিরিশ বছর আগের সেই প্রথম আর শেষ সুযোগটা আবার তার সামনে আসছে। এবার আর সে হাতছাড়া করবে না। ট্রেনকে আর বিশ্বাস করবে না। যদি একদিন আগেও কলকাতায় গিয়ে থাকতে হয় তা হলেও সে শেয়ালদার স্টেশনে কিংবা অফিসে রাত কাটাবে।
ইলেকট্রিক ট্রেনে বাড়ি ফেরার সময় গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিরিশ বছর আগের সেই দিনটার কথা তার মনে পড়তে লাগল। ময়দান থেকে অফিসে ফিরে গেছিল নাইট ডিউটি করতে। টেবিলে আলোচনা হচ্ছিল জ্যাটোপেকের দৌড় নিয়ে।
মাণ্টাবাবু বললেন, ”বুঝলেন রবিদা, জ্যাটোপেক যখন দৌড়চ্ছিল কীরকম একটা কষ্টের ছাপ ওর মুখে ফুটে উঠছিল। কাঁধটা, দুটো হাত, শরীর যেন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে আছে, মনে হচ্ছিল এই বুঝি মাটিতে লুটিয়ে পড়বে!”
”মাণ্টা, এটাই ওর দৌড়বার স্টাইল। আসলে এত কষ্ট আর অসুবিধের মধ্যে ট্রেনিং করেছে যে মুখে হাসি ফোটাবার মতো অবস্থা ছিল না। ভাবতে পারো, জ্যাটোপেক যখন দু’বছর মিলিটারিতে ছিল, তখন জঙ্গলের মধ্যে ওর ক্যাম্পের কাছে শুধু চারশো মিটারের একটা মাটির রাস্তা ছাড়া দৌড়বার মতো কোনও জায়গা ছিল না। বৃষ্টিতে কাদায়, শীতকালে বরফে ঢাকা। তাই ভেঙে ভারী মিলিটারি বুট পরে আর শরীরের ওজন বাড়াবার জন্য ভারী ভারী ওভারকোট গায়ে দিয়ে, রুকস্যাক পিঠে বেঁধে দৌড় প্র্যাকটিস করত। ওই চারশো মিটার ষাটবার তার মধ্যে দু’শো মিটার স্প্রিন্ট অর্থাৎ, চব্বিশ হাজার মিটার, মানে চব্বিশ কিলোমিটার ওইভাবে প্রতিদিন!”
”তার মানে প্রায় পনেরো মাইল, প্রতিদিন!” টোলুবাবু হাঁ করে তাকিয়ে থেকে ছিলেন।
”প্রতিদিন, দু’বছর! কাদায় পা আটকে যেত বলে তাই উঁচু করে হাঁটু তুলে দৌড়ত। এটাই পরে নতুন এক টেকনিক হয়ে যায়। স্পিডের জন্য জোরে দৌড় আর এনডিওরেন্সের জন্য বারবার রিপিট করা। দৌড়ের মধ্যে হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে কিছুটা ছুটে যাওয়া, তারপরই আবার সহজ ছন্দে ছুটতে থাকা। এটা নতুন ব্যাপার—একে ইন্টারভ্যাল রানিং বলে।”
শুনতে শুনতে নারান রোমাঞ্চ বোধ করেছিল। এইভাবে ট্রেনিং! ওর তো পেটের দায়, সংসার চালাবার দায় ছিল না, তা হলে এমন পাগলের মতো একা একা পরিশ্রম কীসের জন্য? রাতে ডিউটি করার পর খালি পেটে, শুধু চা আর এক আনার বিস্কুট খেয়ে আটাশ মাইল সাইকেল চালানো, নারানের মনে হল, জ্যাটোপেকের ট্রেনিংয়ের কাছে কিছুই নয়।
”টোলু, একজন জিজ্ঞেস করেছিল জ্যাটোপেককে, দৌড়বার সময় আপনার মুখে কষ্টের ছাপ ফুটে ওঠে। হাসতে পারেন না? তাইতে উত্তর দিয়েছিল : একই সঙ্গে দৌড় আর হাসি, এই দুটো জিনিস করার মতো যথেষ্ট প্রতিভা আমার নেই।”
কথাটা শুনে সবার সঙ্গে নারানও তখন হেসে উঠেছিল। ট্রেনে যেতে যেতে তিরিশ বছর আগের স্মৃতি মনে পড়ায় তার মুখে হাসি ফুটল। রাতের বনগাঁ লোকালের ভিড়ের মধ্যেও হাসি? নারান নিজেকে নিয়ে অবাক হল। জীবনের পিছন দিকে তাকালে এখন তার হাসিই পায়। কত জিনিস তুচ্ছ, অকারণ, বাহুল্য মনে হয়। যেমন, শিবুর দোকানে রসগোল্লার হাঁড়িটা ভেঙে ফেলার কোনও দরকার ছিল কি? শঙ্কর, নারু, শচীন হালদাররা কেউই আজ বেঁচে নেই। প্রাইজ হাতে নিয়ে গত মাসেও ফিরেছে, কেউ তাকিয়েও আর দেখে না।
”এমন একদিন আসবে যখন জ্যাটোপেককে তোর আনইম্পর্ট্যান্ট মনে হবে”…না না, টোলুবাবু, এটা আপনি ঠিক বলেননি। কিছু কিছু লোক, কিছু কিছু ঘটনা চিরকাল আমার কাছে ইম্পর্ট্যান্ট থেকে যাবে। …আমাকে কেডস কিনে দেওয়া…।
”বসে পড়ুন দাদু, সিট খালি হয়েছে।” পাঞ্জাবির কোণ ধরে টানল এক ছোকরা। নারান বসে পড়ল।
এখন তার পাকা একতলা বাড়ি। প্রভিডেন্ট ফান্ডের হাজার পঞ্চাশ টাকা পাবে। তখন দোতলা তুলবে। তিন বছর আগে সে টিভি কিনেছে। অবনী ডবলু বি সি এস হয়ে এখন বীরভূমে আছে বউ আর তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে। নবনী জোড়া নিমতলা স্কুলে সায়েন্সের মাস্টার। রজনী বি এস সি পাশ করে মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি করছে। দু’বার ক্লাস এইটে ফেল করে পড়া ছেড়ে দিয়ে গৌতম এখন প্রথম ডিভিসনে ফুটবল খেলছে। মহামায়া প্রবল আপত্তি তুলেছিল, নারান তা নাকচ করে বলেছিল, ”খেলাটাও তো এক ধরনের শিক্ষার ব্যাপার। যদি টাকা রোজগার করতে পারে তা হলে খেলুক না!” নয়নের বিয়ে হয়েছেই শুধু নয়, তার বড় মেয়ে শর্মিষ্ঠা এই বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। হাবড়া বাজারে জামাইয়ের কাটা ছিট কাপড়ের দোকান।
পরদিন কাগজে খেলার পাতায় নারানের চোখ আটকে গেল একটা খবরে—রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, সারা ভারত আমন্ত্রণী ম্যারাথন দৌড় প্রতিযোগিতা! সল্ট লেক স্টেডিয়াম থেকে সকাল সাতটায় শুরু হয়ে আবার স্টেডিয়ামেই শেষ। ”সমাপ্তি—সীমায় প্রতিযোগীদের অভিনন্দন জানাতে উপস্থিত থাকবেন জ্যাটোপেক—দম্পতি।”
