ঘর থেকে নিঃশব্দে কোনি বেরিয়ে এল।
”ব্যাপার কি তোর! আজ যাসনি কেন? এভাবে কামাই দিলে, আর তাহলে যেতে হবে না। তোর দাদাকে আমি জানিয়ে দেব, হবে—টবে না কিছু তোর দ্বারা।” বিরক্তস্বরে ক্ষিতীশ বেশ জোরেই কথাগুলো বলল।
কোনি কথা না বলে একইভাবে দাঁড়িয়ে। অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছে না।
হঠাৎ ক্ষিতীশের পিছন থেকে খনখনে স্বরে কে বলে উঠল, ”কেমন লোক গা তুমি, কাল রাতে মেয়েটার দাদা মরে গেল আর তুমি এখন তাকে ধমকাতে নেগেছ?”
ক্ষিতীশ প্রথমে বুঝতে পারেনি সে কি শুনল। পিছনে তাকিয়ে বলল, ”কে মরে গেছে?”
”জান না দেখছি! কাল বিকেল থেকে মুখে অক্ত উঠল, ভলকে ভলকে, রাত্তিরেই কাবার। কোনির দাদা গো!”
ক্ষিতীশ বার দুয়েক কেঁপে উঠল এবং শুনল কোনি খুব ক্লান্ত এবং শান্ত স্বরে বলছে, ”ক্ষিদ্দা, এবার আমরা কি খাব?”
।। ৯ ।।
রাগে চীৎকার করে উঠল ক্ষিতীশ, ”পারতেই হবে, পারতেই হবে। কোন কথা শুনব না।”
পায়ের কাছে পড়ে থাকা ঢিলটা তুলে সে কোনির দিকে ছুঁড়ে মারল।
”পায়ে পড়ি ক্ষিদ্দা, আর আমি পারছি না।”
”মাথা ফাটিয়ে দোব তোর…মরে যা তুই… মরে যা, মরে যা।” ক্ষিতীশ ঢিল খুঁজে পেল না। এধার ওধার তাকিয়ে মালির ঘরের গায়ে দাঁড় করানো সরু বাঁশের লগাটাকে দেখতে পেল।
”ক্ষিদ্দা, আমি আর পারব না।”
ক্ষিতীশ রেলিং টপকে ছুটে গিয়ে লগাটা আনল। কোনি পাড়ের কাছে এগিয়ে এসেছে। ক্ষিতীশ দু’হাতে লগাটা তুলে জলে আঘাত করল। কোনির মুখের হাত তিনেক সামনে সেটা পড়ল। আবার সে লগাটা দু’হাতে উঁচু করে জলে আঘাত করল।
”মাথা ভেঙ্গে দেব। জল থেকে উঠবি তো মরে যাবি। এখনো দুশো মিটার বাকি।”
কোনি জল থেকে ওঠার জন্য পশ্চিমের স্টাটিং প্ল্যাটফর্মের পিছন দিকে এগোতেই ক্ষিতীশ লগা তুলে পাড় ধরে ছুটল। কোনি থমকে গিয়ে প্ল্যাটফর্মের কিনার ধরে উঁকি দিতে লাগল। ক্ষিতীশ প্ল্যাটফর্মে উঠতে পারছে না, কেননা পাড় থেকে সেটা অন্তত বারো হাত দূরে এবং মাঝে কোন সেতু নেই।
”ক্ষিদ্দা ক্ষিদ্দা, আমায় এবেলা ছেড়ে দাও। ওবেলা আমি পুষিয়ে দোব।” কোনি ফোঁপাচ্ছে।
”কোন কথা আমি শুনতে চাই না। আমার রুটিন অনুযায়ী কাজ চাই। যতক্ষণ না কাজ পাচ্ছি আজ তোকে উঠতে দোব না।”
প্ল্যাটফর্ম ধরা দু’হাতের মধ্যে মুখটা গুঁজে কোনি কাঁদছে। ক্ষিতীশ পাথরের মতো মুখ করে দাঁড়িয়ে। সকাল ন’টা বেজে গেছে। কমলদিঘির জলে আর কেউ নেই এখন। বেঞ্চগুলোয় অনেকেই বসে, কমলদিঘির ভিতরের পথ দিয়ে পথিকের আনাগোনা। তাদের অনেকে কৌতূহলে তাকাচ্ছে ক্ষিতীশের দিকে। কেউ কেউ দাঁড়িয়েও পড়ছে।
কোনি সাঁতরাচেছ। পশ্চিম থেকে পুবের প্ল্যাটফর্মের দিকে। ক্ষিতীশও লগা হাতে পাড় ধরে পুবদিকে হাঁটছে। বিশ্বাস নেই, হয়তো ওপারে পৌঁছেই কোনি জল থেকে উঠে পড়তে পারে।
ওর ক্লান্ত হাত দুটো যেন কেউ জল থেকে টেনে তুলে আবার নামিয়ে রাখছে। মুখ ফিরিয়ে হাঁ করে বাতাস গিলছে। তখন চোখ দুটো দেখাচ্ছে যেন ঘুমে আচ্ছন্ন। গলায় ঝোলান স্টপওয়াচটা মুঠোয় ধরে ক্ষিতীশ বিড়বিড় করে আপন মনে বকে যাচ্ছে: জানি রে, জানি কষ্ট হচ্ছে, হাত—পা খুলে খুলে আসছে, কলজে ফেটে যাচ্ছে। যাক যাক, তুই যন্ত্রণা ঠেলে ঠেলে এগিয়ে যা। তুই জানিস ক্ষিদে যখন থাবা মারে, ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়, তখন কেমন লাগে। তুই পারবি বুঝতে যন্ত্রণা কি জিনিস। ফাইট কোনি ফাইট—
…মার খেয়ে ইস্পাত হয়ে উঠতে হবে। যন্ত্রণাকে বোঝ, ওটাকে কাজে লাগাতে শেখ, ওটাকে হারিয়ে দে। …কাম অন কোনি, জোর লাগা, আরো জোরে—
… ট্রেনিং করে করে নিজেকে বাড়াতে হবে কোনি। যন্ত্রণাকে তুই বল, ‘দেখে নেব আমাকে কাঁদাতে পারিস কিনা, আমাকে ভয় দেখাতে পারিস কিনা,’ বলে যা কোনি, ‘ক্ষিদ্দা তোমাকে খুন করব। তুমি শয়তান, ছিঁড়ে খাবো তোমাকে।’ কমলদিঘিকে টগবগ করে ফুটিয়ে তোল তোর রাগে।
…মানুষের ক্ষমতার সীমা নেই রে, ওরা পাগলা বলছে, বলুক। মূর্খ, মূর্খের দল সব। ঘণ্টাখানেক আরামে হাত—পা ছুঁড়িয়ে ওরা চ্যামপিয়ন বানাবার স্বপ্ন দেখে। … ট্রেনিং ট্রেনিং—
—আরো পঞ্চাশ মিটার এখনো যেতে হবে, শরীরটাকে যন্ত্রণায় ঘষে ঘষে শানিয়ে তোল। দেখবি কি অবাক তোকে করে দেবে ওই শরীর, যা অসম্ভব ভাবছিস তাকে সম্ভব করে দেবে। সোনার মেডেল ফেডেল কিছু নয় রে, ওগুলো এক একটি চাকতি মাত্র। ওগুলোর মধ্যে যে কথাগুলো ঢুকে আছে সেটাই আসল—মানুষ পারে, সব পারে।
কোনি সাঁতার শেষ করে দু’হাতে প্ল্যাটফর্ম ধরে হাঁপাচ্ছে মাথা নিচু করে। একবার সে মাথা ঘুরিয়ে ক্ষিতীশের দিকে তাকাল। দু’চোখে ঘৃণা আর আক্রোশ। ক্ষিতীশ সেটা লক্ষ করল। লগাটা যথাস্থানে রেখে সে ক্লাবে ঢুকে একটা মোটা খাতা খুলে বসল। এটা কোনির লগ—বুক। প্রতি বেলার ট্রেনিং—এ কাজের ও সময়ের হিসাব ছাড়াও খাওয়ার, ওজনের, নাড়ির স্পন্দনের, রক্তের হেমোগ্লোবিন স্তর পরীক্ষার, আয়রন ও ভিটামিন ট্যাবলেটের তালিকাও এতে লেখা আছে।
লগ—বুকে লিখতে লিখতে ক্ষিতীশ দেখল কোনি ব্যস্ত হয়ে বেরিয়ে গেল ক্লাব থেকে। প্রতিদিন বেরোবার আগে একবার ‘যাচ্ছি’ বলে যায়। আজ বলল না। ক্লাব থেকে কোনি যায় ক্ষিতীশের বাড়ি। সেখানেই ওর খাওয়া। ঠিক দশটায় তাকে ‘প্রজাপতি’—র রোলার শাটারের তালা খুলতে হয়। দোকান ঝাঁট দিয়ে, কাউন্টার মুছে, কুঁজোয় জল তুলে, তাকে ফাইফরমাশ খাটতে হয়। দুপুরে আবার আসে ভাত খেতে। তখন ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে পনেরো মিনিট ব্যায়াম করে অ্যপোলোয় যেতে হয়। সাঁতার থেকে আবার প্রজাপতিতে। দোকান বন্ধ করে সে লীলাবতীর সঙ্গে ফেরে। রাত্রে খেয়ে ফিরে যায় বস্তিতে মা ও ভাইয়েদের কাছে। কোনি মাইনে পায় চল্লিশ টাকা।
