”যারা পারে পারুক।” মহামায়া ছেঁড়া চটি কুড়িয়ে বাড়ির দিকে রওনা হল।
”হাঁটার জন্য কেডসই পরা দরকার। অফিস থেকে ফিরে তোমাকে নিয়ে আজই জুতোর দোকানে যাব।”
”হাতের একটা ঘড়িও কেনা দরকার। তা হলে সময়ের হুঁশ রেখে দৌড়তে পারবে।”
”অফিসে কো—অপারেটিভের লোনটা স্যাংশন হলেই কিনব।”
রাতে মহামায়াকে নিয়ে বাজারের একমাত্র জুতোর দোকানটায় নারান যখন পৌঁছল, তখন দোকান বন্ধের জন্য দরজার পাটা লাগানো হচ্ছে। দোকানি খদ্দের হাতছাড়া করতে চায় না। ওদের দুজনকে ভিতরে এনে বসাল।
নারান চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসল। তার পাশে বসল মহামায়া, খালি পা কাপড়ে ঢেকে। দোকানি নারানের পায়ের দিকে তাকাল।
”কেডস দিন তো…আমার নয় ওর পায়ের।”
কথাটা বলেই নারানের মাথার মধ্যে ঢং ঢং করে দমকলের গাড়ির মতো ঘণ্টা বেজে উঠল। তার সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে। তার মুখ দিয়ে কার গলার স্বর, কার বলা কথা বেরোল!
টোলুবাবু! …চোদ্দো বছর আগে, কোলেবাজারের পাশে জুতোর দোকানে ঢুকেই ঠিক এই কথা বলে উঠেছিলেন। …টোলুবাবু আপনি এখনও বেঁচে আছেন? আমার বুকের মধ্যে আপনি!
…’তুই এত পরিশ্রমী, তোকে দেখেও যে আনন্দ হয়!”
…টোলুবাবু আপনাকে আমি আনন্দে রাখব, যতদিন বাঁচব আপনাকে…।
‘লিগ জেতার মতোই সুখ পাচ্ছি রে।’
টোলুবাবু আপনার মোহনবাগান বছর বছর লিগ পাবে না, কিন্তু আমি আপনাকে সুখ দেব…।
টোলুবাবু, টোলুবাবু, বাস্তু ছেড়ে এসে নতুন বাস্তু বসিয়েছি, আমার পরিশ্রম করার ক্ষমতা আছে, আপনাকে আমি বাঁচিয়ে রাখব, আনন্দ দেব…আপনি দয়া করে আমাকে ছেড়ে যাবেন না, আমি ঠিক সময়েই আপনার কাছে পৌঁছব…চার মিনিট আঠাশ সেকেন্ডেই…
”এ কী! তোমার চোখে জল, কাঁদছ কেন? কী হল? বিড় বিড় করে কীসব বলছ?”
মহামায়া হাত ধরে ঝাঁকাতেই নারান ফ্যালফ্যাল করে দোকানদারের মুখের দিকে তাকাল, তারপর মহামায়ার দিকে। সম্বিৎ ফিরে আসতে, কাঁধের জামায় চোখ ঘষে সে শান্ত স্বরে বলল, ”চোখের জল মানেই কান্না নয়। ছেচল্লিশ বছর বয়সে পুরুষমানুষ কি কাঁদে? …নীল নয়, সাদা রঙের কেডসই আপনি দেখান।”
।। ৬।।
কুড়ি বছর তারপর কেটে গেছে।
উনিশশো ছিয়াশির ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে এক সন্ধ্যায় নারান খেলার বিভাগে এল। মাত্র এক মাস আগে রিটায়ার করে সে ছ’মাসের জন্য এক্সেটনশন পেয়েছে।
দোতলা থেকে তিনতলায় উঠে এসেছে সংবাদ বিভাগ, সেই সঙ্গে রিপোর্টিং, প্রুফ রিডিং, টেলেক্স, খেলার বিভাগও। লম্বা হলঘরের এক কোনায়, পুরনো টেবিলটার দু পাশে আগের মতোই চেয়ার পাতা, কিন্তু পুরনো লোকেরা আর কেউ নেই। শৈলেনবাবু আর শ্যামলবাবুর পর আরও তিনজন লোক এসেছে। খুব অল্পবয়সি, নারান তাদের চেনে না।
মাণ্টাবাবু রিটায়ার করেছেন। অফিসের স্পোর্টসের দিন তিনি মাঠে আসেন, তখন দেখা হয়। প্রতিবারই বলেন, ‘তুই আমাকে খুব ঠকান ঠকিয়েছিলি নারান। আটশো, চারশো আর দুশো, পর পর তিনটে রেসে নামতে চাওয়ায় আমি তো ভেবড়ে গেছলুম। তখন তোর বয়সের কথা ভেবে আমি তো রাজিই হইনি তোর এন্ট্রি নিতে। মনে আছে?” নারান শুনে যায় আর মিটমিটি হাসে আর বলে, ”সে বছর যে ওলিম্পিকে জ্যাটোপেক তিনটে সোনা জিতেছিল! …আমাদের যে একই তারিখে জন্ম।” মাণ্টাবাবু হেসে শ্যামলবাবুকে বলেছিলেন, ”বুঝলে শ্যামল, আমি বিরক্ত হয়ে ওকে বলেছিলুম, তুই কি জ্যাটোপেক হয়ে গেছিস ভেবেছিস?”
নারান সেদিন খেলার বিভাগে এসে দেখল একজন বসে কপি অনুবাদ করছে। একে সে দেখেছে, কিন্তু নাম জানে না। এ—ও বোধহয় তাকে চেনে না। দেয়ালের ধারে টুলে বসে আছে অমিয়। নারান তাকে জিজ্ঞেস করল, ”শৈলেনবাবু, শ্যামলবাবু কখন আসেন?”
”এবার তো মাঠ থেকে আসার সময় হল। আপনি বরং শশধরবাবুকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, ওই যে টেবিলে বসে।”
নারান কুণ্ঠিতভাবে শশধরের পাশে দাঁড়াল। নমস্কার করে বলল, ”আমার নাম নারান হালদার, এখানে বেয়ারার কাজ করি। অনেক দিন খেলার বিভাগে ছিলাম, তারপর স্টোরে। অনেক বিভাগ ঘুরে এখন পোস্ট বক্সে আছি। রবিবাবু, টোলুবাবু, মাণ্টাবাবু আমায় খুব ভালবাসতেন। আপনি বোধহয় ওদের দেখেননি।”
শশধর ভ্রূ কোঁচকাল। ”নাম শুনেছি, মাণ্টাবাবু ছাড়া কাউকে দেখিনি।”
সংক্ষেপে জবাব দিল শশধর, নিরাসক্ত স্বরে। সে ধরে নিয়েছে, এই কৃশকায়, কৃষ্ণবর্ণ, আধময়লা হাফ—হাতা পাঞ্জাবিপরা লোকটি এবার পকেট থেকে চার ভাঁজ করা ময়লা একটি কাগজ বার করে বলবে, ”পাড়ার ফাইভ এ সাইড রবারের বল ফাইনাল, খবরটা যদি একটু…”
”একটা খবর…”
”কিন্তু এসব আর ছাপা হয় না।” বিব্রত স্বরে শুরুতেই নারানকে থামিয়ে দিল শশধর।
থতমত নারান লাজুক গলায় বলল, ”আজ্ঞে ছাপাতে নয়, একটা খবর জানতে এসেছি।”
শশধর এবার লজ্জা পেল, অপ্রতিভও বোধ করল। গত বছর অফিসের স্পোর্টসে এই নারান হালদারকে সে দৌড়তে আর প্রাইজ নিতে দেখেছে।
”কী খবর?”
”কাগজে দেখলুম, এ মাসের সাতাশে ক্রীড়া দিবস হবে। তাতে নাকি এমিল জ্যাটোপেক আর তার বউ ডানা কলকাতায় আসবেন।…সত্যি নাকি?”
”হ্যাঁ, সেইরকমই তো আমাদের বলেছেন ক্রীড়ামন্ত্রী।”
”কোথায়, কখন ওঁদের দেখা যাবে, জানেন নাকি?”
”এখনও কিছু আমাদের জানানো হয়নি। হলে কাগজে নিশ্চয় দেখতে পাবেন। আজ বেঙ্গল অ্যামেচার অ্যাথলেটিক অ্যাসোসিয়েশনের একটা প্রেস কনফারেন্স আছে, শ্যামলদা গেছে। হয়তো জ্যাটোপেকের প্রোগ্রাম সম্পর্কে কিছু জানা যাবে।”
