টোলুবাবু শেষে আপনিই কিনা এই কাজ করলেন! আপনিই আমার বড় দুঃখ? না কি আরও দুঃখ ঘাপটি দিয়ে রয়েছে? জীবনে তো অনেক কষ্ট, অনেক দুঃখ সইলাম, দেখলামও, কিন্তু এমন করে দেওয়ার মতো তো আগে কখনও পাইনি!
‘নারান জীবনে কোনটে বড় দুঃখ আর কোনটে ছোট দুঃখ, সে সবের হিসেব কষা ছেড়ে দে। ওতে শুধু সময় নষ্ট আর মন খারাপ করা।’
ঠিক বলেছেন টোলুবাবু, আমি আর মন খারাপ করব না। আপনাকে আমি ভুলেই যাব, আপনাকে আমি মন থেকেই মুছে ফেলব। নারান ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। পাশে বসা মহামায়া তার মুঠোয় চেপে ধরল নারানের বাহু।
”ঘুম পাচ্ছে?”
নারান চোখ তুলে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, ”হ্যাঁ।”
.
ডাক্তারবাবুর দেখিয়ে দেওয়া ব্যায়াম শুরু করল মহামায়া আর উঠোনে এধার থেকে ওধার আধ ঘণ্টা হাঁটা। কিন্তু কয়েক দিন পরই তার বিরক্তি ধরল, একঘেয়ে লাগল ছোট জায়গায় এইভাবে হাঁটতে।
”উঠোনে আর পারছি না, এবার রাস্তায় হাঁটব।” মহামায়া একদিন নারানকে বলল।
”পাকা রাস্তা তো একটা, বাস আর লরি অবিরাম চলেছে। হাঁটবে কোথায়? ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তা দিয়ে হাঁটলে তো চোট পাবে।”
”তুমি কাগজ বিক্রি করতে সাইকেলে যেতে যে রাস্তায়…”
”ওরে বাবা! সেটা তো আরও বিপজ্জনক! গত চোদ্দো বছরে তাতে দু’বার ইট আর খোয়া পড়েছিল। সেসব কবে উঠে গিয়ে আবার গত্ত বেরিয়ে পড়েছে। তবে পঁয়ত্রিশ নম্বর হাইওয়ের থেকে এক দিক দিয়ে ভাল, গাড়ি কম যায়। ঠিক আছে, কাল থেকে ভোরবেলায় দু’জনে বেরোব। তুমি হাঁটবে, আমি দৌড়ব। প্র্যাকটিসটা রাখা দরকার।”
পরদিন ভোর পাঁচটায় তারা দু’জন বাড়ি থেকে বেরোল। রেললাইন পার হয়ে হরিহর ভটচাযের বন্ধ দোকানের সামনে নারান দাঁড়াল। এখন একশো ষাটটা কাগজ হরিহর নিচ্ছে। বিলি করার জন্য দু’টো ছেলেকে রেখেছে। সেই পাঁচটা গ্রাম—শালকোনা, আন্দুলিয়া, ঝাউডাঙা, রঘুরামপুর, তুবড়িয়ায় সে একাই কাগজ বিলি করত, আর এখন কিনা লাগছে দু’জন। নারান আত্মপ্রসাদ বোধ করল।
ভোরের আলো ভাল করে ফোটেনি। আবছা রাস্তাটার দিকে আঙুল তুলে সে মহামায়াকে বলল, ”এই রাস্তা দিয়ে বছরের পর বছর কাগজ নিয়ে গেছি আর ফিরেছি, প্রায় আটাশ মাইল…রোজ, একদিনও কামাই করার জো ছিল না, তা হলেই লোকে কাগজ পাবে না। চলো, হাঁটো।’
হাঁটতে হাঁটতে নারান বলে যেতে লাগল, জায়গাটায় কী কী বদল ঘটেছে। কোন কোন দোকান আর বাড়িগুলো নতুন হয়েছে। কোথায় একটা সজনে গাছ ছিল, কোন নারকেল গাছটাকে এতটুকু দেখেছে, কোন পুকুরটা ইট—ভাটার জন্য মাটি কাটতে তৈরি হল। ভাগাড় ছিল, শকুনি বসে থাকত, এখন সেখানে ধান চাষ হচ্ছে।
কথা বলতে বলতে নারান তার স্বভাবগত জোরে হাঁটা শুরু করে দিল। মহামায়া বার বার পিছিয়ে পড়ে আর ছুটে নারানের পাশে আসে।
”তুমি ছুটবে বলেছিলে, যাও ছোটো। আমি তোমার সঙ্গে হাঁটতে পারব না।”
”সেই ভাল।”
নারান পা থেকে চচি খুলে দু’হাতে নিল। মহামায়া হাত বাড়িয়ে বলল, ”চটি হাতে ছুটবে কী? আমায় দাও।”
”সেই ভাল। …তোমার তো আধ ঘণ্টা হাঁটার কথা? দশ মিনিট হাঁটা হয়ে গেছে! আরও দশ মিনিট হাঁটবে, তারপর ফিরে আসতে দশ মিনিট। ঠিক এইখানে অপেক্ষা করবে, আমি এখনি ঘুরে আসছি।”
বিবর্ণ, গোড়ালির রবার ক্ষয়ে যাওয়া চটিজোড়া মহামায়ার হাতে দিয়ে, ধুতিটা একটু টেনে তুলে নারান ধীর গতিতে ছুটতে শুরু করল।
মহামায়া সামনে তাকিয়েই হাঁটতে হাঁটতে দেখল নারান ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে ছোট থেকে ছোট হয়ে। গাছপালা বাড়ির আড়ালে এক একবার অদৃশ্য হয়ে আবার বেরিয়ে পড়ছে। রাস্তাটা ডান দিকে ঘুরে ধানখেতের মাঝ দিয়ে শালকোনা গ্রামের দিকে গেছে। নারানকে সে আবার দেখতে পেল একই গতিতে ছুটছে।
পিছনে আকাশটা আলোয় ভরে উঠছে। পাখি উড়ছে। আনাজ নিয়ে গোরুর গাড়ি আসছে ধান্যকুড়িয়ার বাজারে। বাতাসে ভেসে রয়েছে মাটির গন্ধ। চারদিকে থমথমে স্তব্ধতা। মাথার উপর গাছের ডালে শালিক ডেকে উঠতে মহামায়া মুখ তুলে তাকাল আর তখনই একটা ইটের ডগায় হোঁচট খেয়ে সে পড়ি পড়ি হয়ে কোনওক্রমে টাল সামলাল।
তার চটির ফিতে ছিঁড়ে গেছে। এটা পরে আর হাঁটা সম্ভব নয়। দু’হাতে দু’জোড়া চটি নিয়ে মহামায়া আবার হাঁটতে শুরু করেই বুঝল, তার শরীর কষ্ট সহ্য করার যত ঘমতাই রাখুক না কেন, পায়ের তলার চামড়া তত রাখে না। কাঁকর আর ভাঙা ইটের টুকরো মাড়িয়ে হাঁটতে তার কষ্টই হচ্ছে। সে দাঁড়িয়ে পড়ল নারানের ফিরে আসার জন্য।
মিনিট চল্লিশ পরে ছুটতে ছুটতে ফিরে এল নারান। মুখে ক্লান্তির চিহ্নমাত্রও নেই। মহামায়া কিছু বলার আগেই সে বলে উঠল, ”শালকোনার বটগাছটা ছুঁয়েই চলে এলাম, দেরি হয়ে গেল…তাড়াতাড়ি চলো, অফিস যেতে হবে…ক’টা বাজল?”
”ঘড়ি কোথায় পাব এই রাস্তার মধ্যে?” বহু কষ্টে ধরে রাখা ধৈর্য মহামায়া আর ধরে রাখতে পারল না।
”টেবিল—ঘড়িটা নিয়ে কাল বেরোব।”
”কাল আর বেরোনো হবে না, এই দ্যাখো।” মহামায়া চটিগুলো হাত থেকে ফেলে দিল। নিজের চটি পায়ে গলিয়ে নারান বলল, ”কী হয়েছে?”
”ছিঁড়ে গেছে। খালি পায়ে এই রাস্তায় আমি হাঁটতে পারব না।”
”কই, আমার তো খালি পায়ে অসুবিধে হল না? কত লোকই তো খালি পায়ে…!”
