টোলুবাবু ফিকে হাসলেন। নিচু গলায় বললেন, ”না হলেই ভাল। তবে জীবনে বড় বড় সারপ্রাইজগুলো ঘাপটি মেরে থাকে। কখন, কোথায় যে লাফ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে কেউ তা জানে না! …তা হলে রোববার দেখা হচ্ছে।”
নারানও জানত না, রবিবারই তার সামনে এসে দাঁড়াবে একটা সারপ্রাইজ।
মহামায়াকে নিয়ে সে বিকেল চারটে—পঁয়ত্রিশে ট্রেন থেকে শেয়ালদায় নামল। হাসপাতালের সামনে পৌঁছতে লাগল চার মিনিট। তারপর অপেক্ষা করতে করতে বাজল পাঁচটা। টোলুবাবু তখনও আসেননি। সাড়ে পাঁচটা। টোলুবাবুর দেখা নেই।
”কী ব্যাপার, ঠিক বুঝতে পারছি না তো!” নারান হতাশ, উদভ্রান্তের মতো মৌলালি থেকে বউবাজার মোড় পর্যন্ত ঘনঘন তাকাতে লাগল।
”পাঁচটা বলেছিলেন না ছ’টা?” মহামায়া সন্দিগ্ধ স্বরে জানতে চাইল।
”পাঁচটা। আর একটু দেখি। না এলে ডাক্তারের কাছেই সোজা টোলুবাবুর নাম করে চলে যাব, এই তো সামনেই ওঁর চেম্বার।”
ছ’টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে নারান আর মহামায়া ডাক্তারের চেম্বারে এল। চোদ্দো বছরে জায়গাটার বিশেষ কিছু বদল ঘটেনি। অপেক্ষার জায়গাটায় রোগীর সংখ্যাটা বেশি। পুরনো দুটো চেয়ারকে নারান চিনতে পারল। নতুন একটা হাতলওলা বেঞ্চ আর ঘরের দরজার ধারে টেবল চেয়ার। একটি অল্পবয়সি রুগণ মেয়ে সেখানে বসে।
”আপনার কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করা আছে?” মেয়েটি জিজ্ঞেস করল? নারান ফাঁপরে পড়ল। ডাক্তারকে টোলুবাবু বলে রেখেছেন কি না সে জানে না। তবে আগেরবার তো ডাক্তারকে বলা—কওয়া ছিল বলে তার মনে হয়নি। হাঁদু বলে টোলুবাবু ডেকেছিলেন। ছোটবেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অ্যাপয়েন্টমেন্ট করার দরকার হয় না।
”না করা নেই। ডাক্তারবাবুর বন্ধু আমাদের পাঠিয়েছেন।”
”এতে আপনার নাম আর যিনি পাঠিয়েছেন তার নাম লিখে দিন।” স্লিপের ছোট্ট প্যাডটা আর কলম মেয়েটি এগিয়ে দিল।
নিজের নাম লিখে নারান তার দলায় ”টোলুবাবু পাঠাইয়াছেন” লিখে দিল। স্লিপটা নিয়ে পরদা সরিয়ে মেয়েটি ভিতরে গেল। পর্দার দিকে তাকিয়ে নারানের মনে হল, এটা তো আগে ছিল না! বেঞ্চে মহামায়ার পাশে বসা মাত্রই মেয়েটি পরদা সরিয়ে বলল, ”নারানবাবু আসুন।”
মহামায়ার কানের কাছে মুখ এনে নারান ফিসফিস করে বলল, ”টোলুবাবুর নাম লিখে দিয়েছিলাম, তাই সঙ্গে কল এল।”
মহামায়ার সামনে পরদার দিকে তাকিয়েই ছিলেন। তারা দু’জন ঘরে ঢোকা মাত্র বললেন, ”টোল কবে বলেছিল আপনাকে?”
ডাক্তারবাবুর চাহনিতে ও স্বরে এমন কিছু ছিল যেজন্য নারান নমস্কার করতেও ভুলে গেল।
”গত সোমবার, অফিসে কথা হয়েছিল। আমরা একই অফিসে কাজ করি। উনি বলেছিলেন, পাঁচটার সময় হাসপাতালের সামনে অপেক্ষা করবেন। আমাকে নিয়ে উনি আপনার কাছে এসেছিলেন একবার, চোদ্দো বছর আগে। সেদিনও তিনি ওইখানে আমার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবে এবার আর আমার জন্য নয়, আমার স্ত্রীর…”
”বসুন। টোলুর পাঠানো আপনিই বোধহয় শেষ রোগী।”
কথাটা বুঝতে না পেরে নারান হাসল, টোলুবাবু তা হলে এখানে রোগী সাপ্লাই দেন! কিন্তু শেষ রোগী কেন? আর কি কাউকে পাঠাবেন না?
তার চোখে জিজ্ঞাসা ফুটে উঠতে দেখে ডাক্তারবাবু চোখ নামিয়ে ধীর স্বরে বললেন, ”কী জন্য এসেছেন বলুন।”
উঁচু বেঞ্চে শুইয়ে এবং হাঁটিয়ে মহামায়ার হাঁটু পরীক্ষা করে ডাক্তারবাবু কোনও ওষুধপত্র দিলেন না। শুধু প্রতিদিন কয়েকটা ব্যায়ামের আর টানা আধঘণ্টা হাঁটার নির্দেশ দিয়ে, কী ভাবে হাঁটতে হবে সেটাও দেখিয়ে দিলেন।
”আমরা ছ’টা পর্যন্ত ওঁর জন্য অপেক্ষা করেছি। যদি উনি এসে পড়েন তা হলে ওঁকে বললেন যে”…নারান থেমে গেল ডাক্তারবাবুর তোলা হাত দেখে।
”টোলু আর আসবে না। এতক্ষণে ওর দাহ হয়ে গেছে।”
নারানের মাথার মধ্যে কথাগুলো অর্থবহ একটা পরিষ্কার আকার নিয়ে ফুটে ওঠা মাত্র সে টেবলের কোনা আঁকড়ে ধরে ঝুঁকে, মুখ থেকে একটা শব্দ বার করল।
”ভোররাতে ঘুমের মধ্যেই…আমিই ওর ডেথ সার্টিফিকেট লিখলাম।”
নারান থরথর কাঁপছে। মহামায়া ওর একটা হাত চেপে ধরল। ডাক্তারবাবু বেল বাজালেন। পরদা সরিয়ে মেয়েটির মুখ উঁকি দিল।
”পাঠিয়ে দাও।”
নারান সম্বিৎ ফিরে পাবার আগেই দু’জন পুরুষ ও মহিলা ঘরে ঢুকল।
”বসুন…বলুন।”
মহামায়াই হাত ধরে টেনে নারানকে বাইরে আনল। বেরিয়ে এসেই সে বলল, ”এভাবে অবাক করে দেবেন ভাবিনি।”
এর পর আর সে একটিও কথা বলেনি। মহামায়া কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করে চুপ করে গেছে।
ট্রেনে বসে নারান জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিল। বাইরে ঘোর অন্ধকার, সিগন্যালের লাল—সবুজ, মাঝে মাঝে বাড়ির আলো, রাস্তার আলো, স্টেশনে থামা, যাত্রীদের ওঠা—নামা, মোটরের হেডলাইট, ব্রিজের উপর ট্রেনের ঝম ঝম শব্দ…তার মনের মধ্যেও চলেছে রেলগাড়ি। …তাতে যাত্রী শুধু টোলুবাবু আর সে। টুকরো—টুকরো কথা, হাসি, রাগ, জল—খাওয়া, শোওয়া, নানানভাবে টোলুবাবুকে তার মনে পড়ছে। এক—একটা বছর যেন এক—একটা স্টেশনের মতো। নারানের মনের রেলগাড়িও থামছে আর ছাড়ছে।
সোমবার শেষবারের মতো দেখা হল। ”আমার জীবনে জ্যাটোপেককে না দেখতে পাওয়ার মতো এত বড় দুঃখ আর কখনও পাইনি।” কথাটা কি সত্যি? নারান মনে মনে প্রশ্ন করল টোলুবাবুকেই।
‘নারান সারপ্রাইজগুলো ঘাপটি মেরে থাকে। কখন, কোথায় যে লাফ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে…।’
