বাড়ি ফেরার সময় মহামায়া আপত্তি জানাল।
”আবার গুচ্ছের টাকা খরচ। ষোলোটা টাকা কম নাকি? ছবি তোলাবার দরকার নেই। ব্যথাটা আগের থেকে অনেক কমে গেছে, আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাবে। অত ব্যস্ত হবার কী আছে!”
”এসব জয়েন্টের ব্যথা অত সহজে যায় না। একটা এক্স—রে করাতে এত আপত্তি কীসের? ট্রেনে বনগাঁ গিয়ে…” নারান তার স্ত্রীকে বোঝাবার চেষ্টা করল।
”ট্রেনে চেপে কেন, আমি হেঁটেই এখন বনগাঁ যেতে পারি। কথাটা তা নয়, …অযথা কেন খরচ করব?”
”এটা অযথা নয়, খুব দরকারি। অফিসে শুনেছি তো, হাঁটুতে, অ্যাঙ্কেলে চোট পেয়ে কত ভাল ফুটবলারের খেলা শেষ হয়ে গেছে।”
”আমি কি ফুটবল খেলতে মাঠে নামব?”
”কেপ্পনি করে চিকিৎসা না করালে হাঁটুতে জল জমবে, বাত হবে, অথর্ব হয়ে যাবে।” শেষের কথাটায় মহামায়া ভয় পেল। বাতের যন্ত্রণা ঠিক আছে, সহ্য করতে পারবে, কিন্তু অথর্ব হওয়াকে সে ঘেন্না করে, তাই ভয়ও পায়।
”ঠিক আছে, কবে যাব?”
বনগাঁ থেকে এক্স—রে করিয়ে এনে নারান খাম হাতেই স্টেশন থেকে বিজয় ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে দেখল তালা ঝুলছে। কী ব্যাপার! পাশের ওষুধের দোকানে শুনল, পাটনায় ডাক্তারবাবুর বড়দার হঠাৎ হার্ট—স্ট্রোক হয়েছে। খবর পেয়েই কাল পাটনা চলে গেছেন। অন্তত সাত দিনের আগে ফিরবেন না।
সোমবার ছিল অফিসের মাইনের তারিখ। সে দিন দুপুরে ক্যাশঘর থেকে মাইনে নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় সে টোলুবাবুর মুখোমুখি হল।
”আরে নারান, খবর কী তোর? দেখে তো মনে হচ্ছে ভালই আছিস।”
”আপনি কেমন আছেন? একটু শুকনো শুকনো….”
”ভাল আছি, ভাল আছি।” টোলুবাবু মাঝপথে নারানকে থামিয়ে দিলেন। ”শরীর টরির নিয়ে কথা বলে মন খারাপ করে দিসনি। হার্ট, লিভার, কিডনি, প্রেশার, এগুলোকে ভুলে থাকতে দে। আর ক’বছর পরই রিটায়ার করছি…মাঠে যাওয়া বন্ধ করব। খাব—দাব, ঘুমোব আর ছাদে ফুলের বাগান করব। দুটো ছেলে চাকরি করছে…তোর কয় ছেলে?”
”বড় ছেলে তেরো বছরের, বাকি তিনটে ছোট।”
”ওহ, তা হলে তো তোকে এখন অনেকদিন চাকরি করতে হবে। করে যা, করে যা। মাইনেটা নিয়ে আসি।” টোলুবাবু ক্যাশঘরে ঢুকে গেলেন।
মোহনবাগন—ইস্টবেঙ্গল নিয়ে টোলুবাবু একটা কথাও বললেন না। এমনটা তো কখনও হয় না! নারানের অবাক লাগল। অনিলকে দেখে নারান বলল, ”টোলুবাবু কেমন যেন বদলে গেছেন মনে হচ্ছে!”
”তুই জানিস না? ওনার তো দুটো স্ট্রোক হয়ে গেছে। নাইটডিউটি আর করেন না। দুপুরে ডাকের কপি করে বাড়ি চলে যান।”
শুনে নারন আবাক হয়ে গেল। একই অফিসে তারা কাজ করে, অথচ এক তলা আর দোতলার মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই! তিন তলার মানুষদের তো সে চেনেই না! খেলার বিভাগে অনেক দিন যায়নি, নারানের ইচ্ছে হল, আগের মতো টোলুবাবুর সঙ্গে মোহনবাগান—ইস্টবেঙ্গল নিয়ে কথা বলতে।
”কী রে, এখানে কী মনে করে?” টোলুবাবু চোখ থেকে চশমা নামালেন।
”আপনি চশমা নিলেন কবে?”
”মাস ছয়। বয়স হলে উপসর্গ দেখা দেয়। কিন্তু তুই তো একটুও বদলালি না? চোখের দৃষ্টি কেমন?”
”ভালই, তিন হাত দূরের খবরের কাগজ পড়তে পারি।” কথাটা বলেই নারানের মনে হল, এখন এই লোকটির কাছে দৈহিক সুস্থতার কথা না বলাই ভাল। তাই সে তাড়াতাড়ি যোগ করল, ”আমি ভাল থাকলে কী হবে, বাড়িতে তো অসুখবিসুখ, নিশ্চিন্তে আর আছি কই…বউয়ের হাঁটুতে…”
”কী হল হাঁটুতে?” টোলুবাবু চশমাটা চোখে দিলেন। নারান তখন আদ্যোপান্ত ব্যাপারটা বলল।
”তা ওকে নিয়ে আয়, আমি ভাল ডাক্তার দেখিয়ে দিচ্ছি। না না, দেরি করিসনি, কালকেই আন। …মনে আছে তোর, চোদ্দো—পনেরো বছর আগে…”
”চোদ্দো বছর আগে। আপনি দাঁড়িয়েছিলেন ক্যাম্বেল হাসপাতালের…ইয়ে নীলরতন হাসপাতালের সামনে। বলেছিলেন, পাঁচ মিনিটের মধ্যে যদি আমি এসে যাই, তা হলে ধরে নিয়েছিলেন আপনারাই লিগ পাবেন। আমি চার মিনিট আটাশ সেকেন্ডের মধ্যে এসে গেছলাম।”
”আর লিগটা কিনা পেলি তোরা।” টোলুবাবু চোখ পিটপিট করে বললেন। ”পরের বছর হল অ্যাবানডন্ড।”
”কিন্তু তার পরের বছর তো আপনারা ডাবল করলেন।”
”তার দু’বছর পর জ্যাটোপেক এল কলকাতায়, কিন্তু তুই তাকে দেখতে পেলি না।”
”আমার জীবনে, টোলুবাবু, এতবড় একটা দুঃখ আর কখনও পাইনি। ওঁকে দেখার ওই প্রথম আর শেষ সুযোগ আমি হারিয়েছি।”
”তা হলে তুই কাল…না ন কাল নয়, তোর অফ—ডে কবে? রবিবার?”
”হ্যাঁ।”
”তা হলে রবিবার বিকেলে ঠিক পাঁচটায় ওই জায়গায় বউকে সঙ্গে নিয়ে দাঁড়াবি। এক্স—রে প্লেটটাও আনবি। ওই ডাক্তারের কাছেই নিয়ে যাব। বেশিক্ষণ কিন্তু আমায় দাঁড় করিয়ে রাখিসনি। শরীরটা ক’দিন ধরে ভাল যাচ্ছে না, হার্টটা কেমন যেন ট্রাবল দিচ্ছে।”
নারান চলে আসছিল, টোলুবাবু ডাকলেন।
”নারান শোন, জীবনে কোনটে বড় দুঃখ আর কোনটে ছোট দুঃখ, সে সবের হিসেব কষা ছেড়ে দে। ওতে শুধু সময় নষ্ট আর মন খারাপ করা। দুটো স্ট্রোক হয়ে গেছে, ডাক্তার বলেছে থার্ডটাই আমার ফুলটাইমের হুইসল হবে। আমি এখন আর লিগ, শিল্ড, রোভার্স, ডুরান্ড নিয়ে একদম ভাবি না। এসব এখন তুচ্ছ ব্যাপার বলে মনে হয়। তোরও জীবনে এমন একদিন আসবে যখন জ্যাটোপেককে তোর আনইম্পর্ট্যান্ট বলে মনে হবে।”
” না না না, এ আপনি কী বলছেন টোলুবাবু।” নারান প্রায় শিউরে উঠল। ”ওঁকে আনইম্পর্ট্যান্ট ভাবব? এমন অধঃপতন আমার যেন না হয়।”
