গর্তের মধ্যে মাটির ছ’টা নাদা। প্রতিটিতে তিরিশ কলসি জল ধরে। ভাপানো, একসেদ্ধ হওয়া ছ’মণ ধান কড়াই থেকে তুলে জলে ডুবিয়ে রাখার জন্য, সে আর নয়ন নাদায় ফেলে।
অবুর স্কুল প্রায় এক মাইল দূরে জোড়ানিমতলায়। সে খেয়ে বেরিয়ে যায় দশটায়। নবু, রাজু যায় প্রাথমিক স্কুলে। গৌতম হামা ছেড়ে হাঁটতে শিখেছে মাত্র।
নাদা থেকে সেদ্ধ ধান তুলে উঠোনে পাতা চটের ওপর শুকোতে দেওয়ার কাজ মহামায়া একাই করে। ধন ছড়িয়ে দিয়ে আধঘণ্টার মতো বিশ্রাম। তারপর চট করে নাড়া দিয়ে ধানগুলোকে ওলটপালট করা, যাতে রোদের তাপ সমানভাবে পায়। এই সময় সারা দুপুর ধানের সঙ্গে লেগে থেকে অন্তত চার—পাঁচ বার সেই ছ’মণ ধান তাকে চট ধরে উলটাতে হয়। তখন লক্ষ রাখতে হয়, বেশি শুকিয়ে ধানের ওজন যাতে কমে না যায়, তা হলে চালের রং খারাপ হবে, ভাঙাবার সময়ও আস্ত থাকবে না। চালের দাম তাতে নেমে যাবে। আবার কম শুকোলেও চাল ভাঙবে। তাই তীক্ষ্ন নজর রেখে ধানের কাছে মহামায়াকে সারা দুপুর বসে থাকতে হয় ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে। মাঝে মাঝে গোড়ালির চাপে ধান ভেঙে সে দাঁতে কেটে বুঝে নেয় ঠিকমতো শুকোল কি না। ধান বস্তায় ভরার আগে, ঘণ্টা চারেক ছায়ায় ঠাণ্ডা জায়গায় ছড়িয়ে রাখতে হয়।
ততক্ষণে নারান অফিস থেকে ফিরে আসে। কিন্তু এই চার ঘণ্টাও বিশ্রাম পায় না মহামায়া। সকালে ধানভাঙা যে কুঁড়ো, তুষ মিল থেকে বাড়িতে আনা হয়েছিল, এই সময়টায় কুলো দিয়ে ঝেড়ে সে তাই থেকে খুদ বার করার কাজে ব্যস্ত থাকে। কাজ শেষ হতে হতে রাত আটটা বেজে যায়। তারপর আবার রাত দুটোয় ঘুম থেকে উঠে উঠোনে উনুনের ধারে গিয়ে স্বামীর সঙ্গে বসা। এইভাবে তার রাত আর দিন কেটেছে গত ছ’বছর। খাটুনি থেকে তার রেহাই নেই। কিন্তু সে কখনও মুখভার করেনি। শরীর আর বইছে না বলে অনুযোগ জানায়নি। সংসারের সুখদুঃখ ঘিরে আবর্তিত হয়ে চলেছে তার দিন আর রাত।
নাদার জল দুদিন পর পর পালটাতে হয়। ছ’টা নাদায় লাগে একশো আশি কলসি জল। নারান বাড়িতে টিউবওয়েল বসিয়েছে। রাত্রে সে পাম্প করে, মহামায়া কলসিতে জল ভরে, কুড়ি গজ বয়ে নিয়ে গিয়ে নাদায় ঢেলে দিয়ে আসে।
মায়ের কষ্ট দেখে নয়ন এগিয়ে এসেছিল। মহামায়া ধমক দিয়ে বলেছিল, ”গা—হাত পুরুষ মানুষের মতো শক্ত হয়ে যাবে। এসব কাজে তোকে করতে হবে না।” নয়নের বিয়ের সম্বন্ধ হচ্ছে।
অবুও টিউবওয়েলের হাতল ধরেছিল। নারান তাকে টেনে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, ”এখন পড়ার সময়, মন দিয়ে পড়া কর।”
সেদিন ছিল নাদার জল পালটাবার দিন। কলসিতে জল নিয়ে যাবার সময় ছলকে উঠোনের মাটিতে জল পড়ে। ক্রমশ উঠোনটা ভিজে ওঠে, কাদা হয়। তখন পিছল মাটিতে একটু হুঁশ রেখে হাঁটতে হয়।
মহামায়া অন্ধকার উঠোনে টিউবওয়েল থেকে নাদা, যাতায়াত করছিল। সে জানত মাটি পিছল হয়ে উঠেছে। বহুবার এমন পিছল উঠোনে সে জল বয়েছে সাবধানেই পা ফেলছিল। তবু, শ্রান্তিতে কীরকম যেন আলগা হয়ে তার দেহের পেশি কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছিল। সে টাল রাখতে না পেরে পিছলে পড়ে গেল। কলসিটা উঠোনে চৌচির হল আর তার মুখ থেকে ”আহহ”—র মতো একটা শব্দ বেরোল।
ছুটে এল সবাই। ধরাধরি করে তাকে বসানো হল। লজ্জা পেয়ে মহামায়া উঠে দাঁড়াতে গিয়ে, ”উহ” বলে কাতরে উঠেই আবার বসে পড়ল।
”কোথায়?” উদ্বিগ্ন নারান জানতে চাইল ব্যথার জায়গাটা।
”এই ডান হাঁটুতে।”
”ভেঙেছে নাকি?” অবু বলল।
”তুই থাম তো! এরকম অনেকবার পড়েছি…চুন—হলুদ দিলেই সেরে যাবে।” মহামায়া ব্যাপারটাকে সহজ করে তোলার জন্য বলল, ”নয়ন, কলসিটা তো ভাঙল, তুই এবার বালতি করে…”
”না না, যা পিছল হয়ে রয়েছে, আমিই নাদায় জল ঢালছি। তার আগে, নয়ন তুই চুন—হলুদ গরম কর।”
পরদিন সকালেও মহামায়া বিছানা ছেড়ে উঠতে পারল না। ধান সেদ্ধর কাজ বন্ধ রইল, কিন্তু শুধু সে দিনের মতোই নয়, বরাবরের জন্যই।
দিন দশেক পর মহামায়া উঠোনে এসে একটা টুলে বসল নয়নের কাঁধে ভর দিয়ে। নারানকে সে ডাক্তার এনে টাকা খরচ করতে দেয়নি। ”এই সামান্য একটা ব্যাপারে আবার ডাক্তার দেখাব কী? ক’দিন গরম তেল মালিশ করলেই দেখবে দৌড়তে পারব।”
দৌড় তো দূরের কথা, একমাস পরও সে ডান হাঁটু পুরোপুরি মুড়তে ব্যথা বোধ করল। উবু হয়ে বা বাবু হয়ে কোনওক্রমে বসতে পারলেও, উঠতে গেলেই তীক্ষ্ন যন্ত্রণা হয়। উঠোনে টুলে বসে সে করুণ চোখে নেভা উনুন আর বিরাট কড়াটার দিকে তাকিয়ে থাকে। একটু সাচ্ছল্য এসেছিল সংসারে, তাও চলে গেল। নয়নের বিয়ে দিলেই জমানো টাকা আর থাকবে না। আবার সেই টানাটানির সংসার। এজন্য মহামায়া নিজেকেই দোষ দেয়। কেন সে আছাড় খেল! এটা কি কপালের লিখন! তাকে কি চিরকালই কষ্ট করে যেতে হবে, সুদিনের মুখ কি কখনও দেখতে পাবে না?
ধানের ব্যবসাটা উঠে গেল। মহামায়া হাঁটতে পারছে তবে ধীরে ধীরে। হাঁটু মুড়তে পারছে কিন্তু খচখচ করে। ব্যথাটা ক্রমশ মিলিয়ে গেলেও মাঝে মাঝে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। নারান এই নিয়ে চিন্তিত। ভাল একজন ডাক্তার দিয়ে একবার হাঁটুটা দেখানো উচিত। রেললাইনের ওপারে বিজয় ডাক্তারের কাছে সে মহামায়াকে নিয়ে গেছল। হাঁটু পরীক্ষা করে ডাক্তার এক্স—রে করাতে বলে।
