”মুখে মুখে ধানের ব্যবসা করা খুব সোজা। ধান কিনে আনা নয় হল; তারপর সেদ্দ করা, শুকোনো, নাড়া দেওয়া, দেশের বাড়িতে দেখেছি তো, মাঝ রাত থেকে উনুনের কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে তুষের জ্বাল দেওয়া, তারপর সারাদিন ধানের কাছে বসে থাকা, নাড়া দেওয়া। কম খাটুনি? সে তুমি পারবে না।”
”পারি কি না পারি সেটা পরে দেখা যাবে, আগে কাজে নামি তো। রাম বলেছে, যদি রাজি থাকি তা হলে ও আমায় সব জানিয়ে বুঝিয়ে দেবে।”
মহামায়ার কথা শুনে নারানের মনে পড়ল, বউ সোনা জেতার পর জ্যাটোপেকের কথাটা : বাড়িতে বোধহয় খাতিরটা কমেই যাবে। ওটা আর একটু উঁচুতে তোলার জন্য এখন তো ম্যারাথন রেসে আমাকে চেষ্টা করতেই হবে!
রসিকতা করে বলল, কিন্তু সংসারে এই ধরণের রেষারেষি তো হয়ই। বাবা—ছেলে স্বামী—স্ত্রী সবার সঙ্গে সবার…সংসার গড়ে তুলতে, প্রতিপালনের আর বাড়বাড়ন্তের জন্য কে কতটা সাহায্য দিতে পারে, তাই নিয়ে কম্পিটিশন চলে। মহামায়া কি তাকে পিছনে ফেলে এগোতে চাইছে?
নারানের আর একটা কথা মনে এল। আশুকে সে জ্যাটোপেকের কথা তুলে তখন বলল, বায়ান্নয় ম্যারাথন জিতে কিনা চার বছর পর সিক্সথ! তারপরেই সে চুপ করে গেছল। কথাটা বলেই তখন তার হুঁশ হয়েছিল, আশুর কাছে জ্যাটোপেকও যা আর জিবেগজাও তাই। বলে কোনও লাভ নেই, ওর মাথায় জ্যাটোপেক ঢুকবে না। যদি ঢুকবে বুঝত, তা হলে সে বলত—ছাপান্নর ওলিম্পিক শুরুর দেড় মাস আগে এমিল ট্রেনিং করছিল ডানাকে কাঁধের উপর তুলে। তখনই হার্ণিয়া শুরু হয়। অপারেশন হল। ডাক্তার বলল, দু’ মাস দৌড় বন্ধ রাখতে হবে। রবিবার গল্পটা বলতে বলতে থেমে গিয়ে বলেছিলেন, ”নারান, ওই মানুষটা আলাদা ধরনের। ওকে দমানো যায় না। দু’ মাস বন্ধ রাখার বদলে, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে পরদিনই আবার ট্রেনিং শুরু করে দিল। ওর সিক্সথ হওয়াটাই তো একটা অলৌকিক ব্যাপার।’
এসব কথা মিষ্টিগুলো আশুকে বলে কোনও লাভ হত না। সংসারটা ঘাড়ে নিয়ে সে এখনও শুধু হাঁটছে, দৌড় দিতে পারছে না। মহামায়া নিজের ঘাড়ে কিছুটা বোঝা তুলে নিতে চাইছে।
”কী হল, চুপ করে রইলে কেন? রমাকে বলেছি তাড়াতাড়িই ওকে জানাব। ও যদি পারে তা হলে আমিও পারব।”
”একটু ভেবে দেখি। পরে তোমায় বলব।”
সাতদিন পর ডুরান্ড ফাইনালে, খেলা দু’দিন ড্র রেখে যুগ্মবিজয়ী হল মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গল। নারানের বিস্মিত মুখের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে টোলুবাবু বলেছিলেন, ”তুই এবার থেকে প্রত্যেক বছর স্পোর্টসে নামবি…উফফ, যা ঝামেলার মধ্যে থাকতে হয়? আমি অবশ্য ধরেই নিয়েছিলুম তুই তিনটেতে জিতলে একটা নতুন কিছু ডুরান্ডে এবার হবে। এরা আগে কখনও তো জয়েন্ট উইনার হয়নি।”
রাতে বাড়ি ফিরে নারান বলল, ”তুমি একা করবে কেন, দু’জনে জয়েন্টলিই কাজ করব, তাতে অনেক ঝামেলা কমে যাবে।”
।। ৫।।
অফিসের স্পোর্টসে নারানের প্রথম নামা আর ধান কিনে এনে চাল তৈরির ব্যবসা একই বছরে শুরু হয়েছিল। তারপর ছ’টা বছর কেটে গেছে অর্থাৎ জ্যাটোপেককে দেখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে তার ব্যর্থ হওয়ার পর দশ বছর! এর মধ্যে মহামায়া বছর তিনেক উলটোডাঙায় এক কাঠের খেলনা তৈরির কারখানায় কাজ করেছে, বাড়িতে ঠোঙা তৈরি করেছে তারপর চাল তৈরির ব্যবসা, যেটা এখনও তারা চালাচ্ছে।
নারানের প্রতিদিনের জীবনযাপন ধারা এখন একটু অন্য রকম। তার অফিসের ডিউটি এখন স্টোর বিভাগে, দিনে দশটা—পাঁচটা। অফিস বাড়ির একদিকে এই স্টোর বিভাগ, খেলার বিভাগ অন্যদিকে, দোতলায়। টোলুবাবু বা মাণ্টাবাবুদের কারও সঙ্গেই আর তার দেখা হয় না। তবে প্রতি বছর স্পোর্টসে মাঠে দেখা হয়।
নারান একশো, দুশো বা চারশো মিটারে এখন প্রথম হতে পারে না। অফিসে অনেক অল্পবয়সি ছেলে এসে গেছে, তাদের সঙ্গে গতিতে তাকে হার মানতেই হয় কিন্তু আটশো মিটারে এবং হাজার মিটার ওয়াকিংয়ে সে অফিসে অপরাজেয়। কিন্তু বুঝতে পারছে আটশো মিটারের চুড়ো থেকে এবার তাকে নেমে আসতে হবে। বয়স এখন ছেচল্লিশ। আর পারা যাচ্ছে না। তবে ওয়াকিংয়ে হাঁটায় অনভ্যস্ত কলকাতার বাবুরা যে আগামী দশ বছর পর্যন্ত তার কাছা ধরতে পারবে না, এটা সে জানে।
রাত দুটোয় সে বিছানা থেকে ওঠে। ধানের কুঁড়ো আর তুষ নিয়ে উঠোনে উনুনটা ধরায়। ধান সেদ্ধ করার লোহার কড়াইটা বিরাট। ব্যাসই প্রায় তিন হাত, গভীরতা দু’হাত। কড়াইয়ে ভাপা হবে চার বস্তা ধান, প্রতি বস্তায় থাকে দেড় মণ।
উনুন ধরানো হলে নারানের সঙ্গে এসে বসে মহামায়া। উনুনে আঁচ দেওয়ার মুখ দুটি। ওরা দু’জন দু’ধারে দুই মুখে বসে প্রথমে সরু কুঁড়ো গর্ত দিয়ে আগুনে ছুড়ে ছুড়ে দিতে থাকে, তারপর মোটা তুষ। অন্ধকার নিস্তব্ধ মাঝ রাতে দু’জনে উনুনের আঁচের দিকে তাকিয়ে অবিরত তুষ ছুড়ে যায়। আগুনের চাপা আভায়, অন্ধকারের সঙ্গে মিলিয়ে থাকা দুটো মুখের মধ্যে শুধু দু’ জোড়া চোখ মাঝে মাঝে ঝকঝক করে ওঠে যখন তারা মুখ তুলে পরস্পরের দিতে তাকায়। দু—চারটে মাত্র কথা তারা বলে। কাজের কথা।
সাড়ে পাঁচটা নাগাদ মহামায়া একবার ওঠে। অবু আর নয়নকে তুলে দেয় ঘুম থেকে। নয়ন সংসারের কাজ শুরু করে, অবু পড়তে বসে। পড়াশুনোয় ওর মাথা ভালই। নারান ওকে গ্র্যাজুয়েট করবেই। রাত দুটো থেকে সাতটা, পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলে ভাপের কাজ, উনুনে তুষ ছুড়ে যাওয়া। নারান অফিসে যাওয়ার জন্য আটটার ট্রেন ধরে। এরপর মহামায়া একলা।
