নারানের মাথার মধ্যে তখন দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। রাগে তার গলা দিয়ে স্বর বেরোল না। সেই সময়ই আশু ডাকল, ”দড়ি বেঁধে দিয়েছি, নিয়ে যাও হাতে ঝুলিয়ে।”
কাপটা চারু রায়ের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে সে স্টোভের বাক্সের মধ্যে রেখে দড়ি বাঁধল, ফ্লাস্কটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাওয়া—বালিশ বাঁধা ল্যাম্প আর স্টোভের বাক্স একহাতে আর অন্য হাতে রসগোল্লার হাঁড়ি ঝুলিয়ে সে পা বাড়াল।
ইতিমধ্যে আরও নানা রকম ফুট কাটা চলছিল।
”নারানকে তো একটা সম্বর্ধনা দিতে হয়!”
”অবশ্যই। এতগুলো প্রাইজ জিতে আনল! কত টাকার মাল হবে বল তো?”
”ওকেই জিজ্ঞেস করো না। শেয়ালদা বাজার থেকে গাঁটের পয়সা খরচ করে ওই তো কিনেছে।”
শেষের কথাটা নারানের কানে গেল। সে আর ধৈর্য রাখতে পারল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রায় ছুটে এসেই, হাতে ঝোলানো রসগোল্লার হাঁড়িটা আধাপাক ঘুরিয়ে, শচীন হালদারের মাথা লক্ষ্য করে বসাল। কিন্তু তার আগেই হাঁড়িটাকে দোলাতে দেখে বিপদের গন্ধ পেয়ে শচীন ”অ্যাই অ্যাই” বলে সামনে বসা শঙ্কর গারুর উপর লাফ দিয়ে পড়েছিল। হাঁড়িটা বেঞ্চের ওপর পড়ে চৌচির হল, ছিটকে গেল রসগোল্লা আর রস।
”মেরেই ফেলব, আজ মেরেই ফেলব।” শচীনের চুলের মুঠি ধরে নারান ঝাঁকাচ্ছে আর চিৎকার করে যাচ্ছে, ”অনেক সহ্য করেছি, এবার শেষ করব।”
আশুতোষ দোকান থেকে বেরিয়ে এসেছে। চারু, নন্দ এবং আরও কয়েকজন নারানকে ধরে টেনে সরিয়ে নিল। দেখতে দেখতে সারা বাজার ভেঙে পড়ল। সবারই মুখে এক কথা, ”কী ব্যাপার? …কী হল নারান হালদারের? …খেপে গেল কেন?”
ডাক্তারখানার সিঁড়ির ধাপে নারানকে বসানো হয়েছে। ছড়ানো ছেটানো প্রাইজগুলো কুড়িয়ে এনে একজন তার পাশে রাখল। একটু দূরে একটা ভিড়ের মধ্য থেকে নন্দ ঘটকের চিৎকার শোনা যাচ্ছে।
”পুলিশে দেওয়া দরকার, আমি এক্ষুনি থানায় যাব। খুন তো প্রায় করেই ফেলেছিল। ভাবো তো, অতবড় একটা হাঁড়ি যদি মাথায় পড়ত! আমি টেনে না নিলে শচীনদা তো মরেই যেত।”
নারানের সামনেও একটা ভিড়। মুখ নামিয়ে মাটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বসে। একজন হাত ধরে বলল, ”চলো নারানদা, বাড়ি চলো।…মাথা গরম আর কোরো না!”
”সরে যা সামনে থেকে, একটা হেস্ত না করে…।” বলতে বলতে নারান মুখ তুলেই ঢোঁক গিলল।
”তার আগে আমার মাথা ফাটিয়ে তোমায় হেস্তনেস্ত করার কাজে নামতে হবে।” মহামায়া। খবর পেয়ে ছুটে এসেছে।
”বাড়ি চলো।”
ক্লান্ত, অবসন্ন পায়ে নারান বাড়ি ফিরল। সঙ্গে মহামায়া, নয়ন আর অবু। অন্ধকার উঠোনে গোঁজ হয়ে নারান বসে রইল। সারাদিনের কথা, টুকরো টুকরো ভাবে তার মনের মধ্যে আলোড়ন তুলে যাচ্ছে। আশুর দোকানের সামনে যা ঘটে গেল, সেটা ঘটতই না যদি সে স্পোর্টসে না নামত, যদি সে প্রাইজগুলো না পেত, যদি সে রবিবাবুর দেওয়া টাকায় রসগোল্লা কিনতে না যেত।
কেন যে মাঠে গিয়ে তার শরীর—মন আনচান করে উঠল এই চল্লিশ বছর বয়সেও? নারান খুঁজে পেল না এর উত্তর। প্রাইজ জেতার আনন্দ কষ্ট করে দিল তার চণ্ডালের মতো এই রাগ। নিজেকে সে বশে রাখতে পারে না কেন? তারও উত্তর সে পেল না। মহামায়া গিয়ে যদি তাকে টেনে না আনত, তা হলে সে রক্তারক্তি কাণ্ড বাধাতই। কৃতজ্ঞতায় তার মন আচ্ছন্ন হতে শুরু করল। মহামায়া না থাকলে তার পরিশ্রম কোনও কাজেই লাগত না, এই সংসার গড়ে তোলা, সন্তান পালন করা, এমন শৃঙ্খলার সঙ্গে কিছুই সম্ভব হত না, যদি…
”কে?” নারান উঠে দাঁড়াল। কে যেন অন্ধকার উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে।
”আমি আশু।”
”কী ব্যাপার?”
”এইটে ধরো।” আশু তার হাতের হাঁড়িটা এগিয়ে দিল। হারিকেন নিয়ে মহামায়া ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
”কেন?” নারান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
”ফেলে এসেছিলে তাই দিয়ে গেলাম।”
”কোথায় ফেলে এসেছি? আমি তো হাঁড়ি ভেঙে রসগোল্লা নষ্ট করে দিয়েছি!”
”তা দিয়েছ। এটা হল আমার দেওয়া প্রাইজ। তুমি কলকাতা থেকে কাপ জিতে এনেছ, এতে আমার আনন্দ হচ্ছে। এখানে কেউই তো কখনও কিছু জেতেনি, তুমিই প্রথম, নাও ধরো।”
আশু হাঁড়িটা এমনভাবে বাড়িয়ে ধরল যে, নারান হাতে না নিয়ে পারল না। কুণ্ঠিত স্বরে সে বলল, ”কিন্তু এমন কিছু তো বড় স্পোর্টস এটা নয়…অফিসের, সামান্যই ব্যাপার।”
”হোক সামান্য। সব জিনিসই সামান্য থেকে শুরু হয়, তারপর ধাপে ধাপে বড় হয়।”
”আরে, আমি চল্লিশ বছর বয়সে এখন আর কী বড় হব? এটা দৌড়োদৌড়ির কাজ বুঝলে আশু, বসে বসে সন্দেশ—রসগোল্লা বানানো নয়। ধাপে ধাপে বয়স বাড়বে যেমন, তেমনই ধাপে ধাপে দৌড়ের ক্ষমতাও কমে আসবে। জ্যাটোপেক বায়ান্নর ওলিম্পিক ম্যারথন জিতল, চার বছর পরের ওলিম্পিকে সিক্সথ… ”বলেই সে চুপ করে গেল।
আশু একগাল হেসে মহামায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ”বউঠাকরুন, নারানের সঙ্গে তো কথায় পারব না, খবরের কাগজের অপিসে চাকরি করে, অনেক খবর রাখে। মিষ্টিগুলো খেয়ে বলবেন কেমন লাগল। আচ্ছা, এখন চলি।”
রাতে ছেলে মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়ার পর, মহামায়া বলল, ”ধানের ব্যবসা করব।”
”কীসের?…ধানের ব্যবসা? তুমি?”
”আমি একা কী করে করব? সবাই মিলে করব। উলটোডিঙেতে কাজে যাবার সময় ট্রেনে একটা মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, নাম রমা, গুমার দিকে ওর বাড়ি। আজ সকালে বাজারে দেখি ও চালের দোকানে বসে। কথায় কথায় রমা বলল, ধান কিনে এনে, সেদ্দ করে, ধানমিলে ভাঙিয়ে এখন চাল বিক্রি করে। দিনে ছ’সাত মণ চাল তৈরি করে। বাড়িতে চার—পাঁচ জন লোক, সবাই হাত লাগায়। আমার আর কাজ করার মতো লোক কোথায়। অল্প করেই শুরু করে একবার দেখি না।”
