চার পাকের দৌড়। দেড় পাকের পরই গজুর মুখ লাল। হাঁপাচ্ছে।
”গজুবাবু চলুন, চলুন।” নারান পিছিয়ে ওর পাশে দৌড়তে দৌড়তে বলল, ”আদ্দেক তো প্রায় হয়ে গেছে, বাকিটাও হয়ে যাবে। আস্তে চলুন, আস্তে।”
টোলুবাবু ঠিক দু’পাকের মাথায় হাঁটতে শুরু করলেন। ”নারান আমি ফিনিশ করবই…একটু মোটা হয়ে গেছি এই যা। বুঝলি, আমি ফিটই আছি…যা যা তুই এগিয়ে যা, বুঝলি, সেই বায়ান্ন সালের মোহনবাগানের মতোই আমার অবস্থা! …জোরে ছোট।”
তৃতীয় পাক শেষ হবার আগেই গজু আর বলাই মিত্তির দাঁড়িয়ে গেলেন। নারান দৌড় শেষ করল রীতিমতো জোরে ছুটেই। টোলুবাবু তখন আড়াই পাকে। গম্ভীর মুখে তিনি, বাজার করে ফেরার গতিতে, ফিনিশিং লাইনের উদ্দেশে হেঁটে চলেছেন।
পরের ইভেন্ট শুরু হবার আগে শ্যামল কুণ্ডু অনুযোগের সুরে টোলুবাবুকে বলল, ”এভাবে হেঁটে হেঁটে ফিনিশ না করলেই পারতেন। আমাদের ডিপার্টমেন্ট নিয়ে সবাই এবার হাসাহাসি করবে।”
”করুক। চ্যাম্পিয়ান হতে পারব না, সেজন্য লিগের বাকি ম্যাচগুলো তাই বলে খেলব না? …তেমন হলে আমি হামাগুড়ি দিয়েও ফিনিশ করতুম। বুঝলে শ্যামল, এককালে কুস্তি শিখেছি গোবরবাবুর আখড়ায়, আমরা হলুম ওল্ড স্কুলের লোক।”
”টোলুবাবু তা হলে কী হল?” নারান প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্য তাড়াতাড়ি কথা পাড়ল। সে জানে গোবর গুহ আর গোষ্ঠ পালের কথা শুরু করলে টোলুবাবু থামতে পারেন না।
”কীসের কী হল?”
”ডুরান্ডের?”
”তোর ওই এক চিন্তা, কই আমার তো হচ্ছে না? আমি তো ধরেই রেখেছি, তুই তিনটেতে জিতলে ডুরান্ড নেবে…।” টোলুবাবু কথা শেষ না করে কাঁধ ঝাঁকিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন।
বয়স্ক মহিলাদের মিউজিক্যাল চেয়ারের পর গো অ্যাজ ইউ লাইক। তারপর পুরস্কার বিতরণ। নারান পেল কেরোসিন স্টোভ, টেবলল্যাম্প, হাওয়া—বালিশ আর তিরিশ পয়েন্ট পেয়ে চ্যাম্পিয়ান হবার জন্য একটা ছোট কাপ। টোলুবাবু দ্বিতীয় হয়ে পেলেন একটা জলের ফ্লাস্ক। সেটা তিনি নারানকে দিয়ে দিলেন।
রবিবাবু পাঁচ টাকার একটা নোট নারানের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, ”বাড়ি যাবার সময় রসগোল্লা কিনে নিয়ে যাস।…আজ আমার খুব আনন্দ হল।”
.
ধান্যকুড়িয়ায় নারান ট্রেন থেকে নামল রাত ন’টায়। স্টেশন থেকে বেরিয়েই বাজার। রাস্তার দুধারে নতুন কয়েকটা পাকা দোকান ঘর। ওষুধের দোকান, ডাক্তারখানা, শর্টহ্যান্ড টাইপ শেখার স্কুল, বাড়ি তৈরির মালমশলার দোকানের পর, আশুতোষ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। দোকানের সামনে মুখোমুখি বেঞ্চে বসে পাড়ার কয়েক জন বয়স্ক লোক। ওদের মধ্যে রয়েছে তার জ্ঞাতিদাদা শচীন হালদার, চারু রায়, নন্দ ঘটক, শঙ্কর গারু এবং অপরিচিত একজন।
হাতের প্রাইজগুলো বেঞ্চে নামিয়ে রেখে নারান বলল, ”আশু পাঁচ টাকার রসগোল্লা দাও তো।”
সবাই তাকাল নারানের দিকে। শঙ্কর গারু বলল, ”বাড়িতে কুটুম টুটুম আসবে না কি?”
”না।”
”তবে, একেবারে পাঁচ টাকার রসগোল্লা?”
”পাঁচ টাকার না হলে বাড়ির অতগুলো লোকের মুখে কি আধখানা করে দেব?”
”ব্যাপার কী নারান, বাড়ির লোককে হঠাৎ যে রসগোল্লা খাওয়াচ্ছ?” চারু রায় কৌতূহল দেখাল।
নন্দ ঘটক বলল, ”নারান তোর সঙ্গের ওগুলো কী? কিনলি নাকি?”
ওদের কথার সুরে নারান হালকা ব্যঙ্গের ছোঁয়া পেল। আর মাথাটাও গরম হয়ে উঠল। সে কি এতই গরিব যে রসগোল্লা কিনলে বা হাতে কিছু জিনিস থাকলেই লোকে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা শুরু করবে?
”অফিসে স্পোর্টস ছিল…নেমেছিলাম। জিতে এগুলো পেয়েছি।” তার স্বর ঈষৎ রুক্ষ।
”বাঃ বাঃ, কিন্তু স্পোর্টসে তো কাপ মেডেল দেয়, তুমি তা পাওনি?” চারু রায়ের প্রশ্ন।
”পেয়েছি।” নারান মুখ ফিরিয়ে কথাটা বলেই আশুর দিকে তাকাল। ”চার আনাওলার দেবে। খানিকটা রসও দিয়ো। ….তোমার ওই ভাঁড়ে কুলোবে না। একটা ছোট হাঁড়িতে করে দাও।”
”পেয়েছিস তো একবারটি দেখা। আমাদের এ তল্লাটে তো এখনও পর্যন্ত কলকাতা থেকে কেউ কাপ—মেডেল আনতে পারেনি। এই বয়সে তুই…দেখা দেখা।”
”দেখে চক্ষু সার্থক করি।” নারানের মনে হল, এটা শচীনদার গলা। সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলে না, কিন্তু চিমটি কেটে টিপ্পুনীটা ঠিকই দিয়ে যায়।
”আমার অত সময় নেই দেখাবার।…আশু ওইটুকু রস দিলে? একটা ফাউ দেবে না?”
”ওরে আশু, একটা নয় দুটো দে, আমরা বরং চাঁদা তুলে তোকে দামটা দিয়ে দোব। নারান ধান্যকুড়িয়ার মান বৃদ্ধি করেছে, সোজা ব্যাপার।…কাপ—মেডেল পেয়েছে, তা সেটা নয় নাই দেখাল…মুখে বলেছে তাই যথেষ্ট!”
স্টোভের বাক্সের মধ্যে কাপটা সে রেখেছে। শঙ্কর গারুর কথা শুনে বাক্সর দড়ি খুলে কাপটা নিয়ে এগিয়ে গেল।
”এই দ্যাখো। বিশ্বাস হল?”
সবাই একটু থতমত হল। চারু রায় কাপটা হাতে নিয়ে তালুতে নাচিয়ে ওজন পরীক্ষা করতে করতে বলল, ”ছটাকখানেক হবে, রুপোর না কি রে?”
”ধ্যেত, রুপো না হাতি! কাঁসার ওপর রুপোর জল করা।”
”দাম কত হবে বল তো শচীন?”
”টাকাদেড়েক…সেকেন্ড হ্যান্ড হলে আরও কম।”
”আরে রুপো, কাঁসা, পেতল যাই হোক, একটা কাপ তো বটে! কচ্ছপের সঙ্গে দৌড়ে হোক আর শুঁয়োপোকার সঙ্গে দৌড়েই হোক, নারান জিতে এনেছে তো বটে। …একটা ফ্লাস্কও তো দেখেছি, ওরে বাবা টেবিলল্যাম্পও যে! হাতে ওটা কী রে নারান?”
