”ধাতুটাতু তো বুঝি না…লোহা, অ্যালমুনি ছাড়া আর কোনও ধাতুই আমার ঘরে নেই। …আমি কখনও দিতে হবে, দিতে হবে’ বলে ভিক্ষে করিনি। যতটুকু করেছি নিজের ক্ষমতায় করেছি। সেজন্য পরিশ্রম করেছি…টুকে কি মানে বই মুখস্থ করে পাশ করা হয়তো যায়, কিন্তু রবিবাবু শিক্ষিত হওয়া যায় না।” বলতে বলতে নারান উত্তেজিত হয়ে উঠছিল। গলার স্বর থর থর কেঁপে উঠল যখন সে বলল, ”দশ বছর আগে জ্যাটোপেককে দেখার জন্য আমি দৌড়েছিলাম ট্রেন ধরতে, দৌড়েছিলাম ট্রেন থেকে নেমেও…দেখা হয়নি। তাইতে কিন্তু আমি ভেঙে পড়িনি! …জ্যাটোপেক আমাকে দৌড় শেখায়নি, আমাকে দৌড়বার জন্য বলেওনি। আমি নিজেই নিজের জন্য দৌড়চ্ছি।”
”বোস, বোস, এখন একটু ঠাণ্ডা হ।” রবিবাবু তাঁর পাশের খালি চেয়ারটা দেখালেন। নারান মাথা নেড়ে ঘাসের উপর বসল।
”একই তারিখে তোদের দুজনের জন্ম, এইটুকুই তো মিল।”
নারান সলজ্জ ভাবে ঘাড় নাড়ল।
”কিন্তু একই রকম বউও কি? জানিস, ওরা দুজন, এমিল আর ডানা, পরস্পরকে প্রেরণা দিত! তা হলে সেই গল্পটা বলি, হেলসিঙ্কিরই ঘটনা। এমিল তাঁর দ্বিতীয় রেস, পাঁচ হাজার মিটারে সোনা জিতলেন। তার কিছু পরেই ডানারও ফাইনাল—জ্যাভোলিনে। স্বামী দ্বিতীয় সোনা জিতেছে শুনে বউ ছুটে এসে মেডেলটা দেখতে চাইল। এমিল ওর হাতে দিলেন। ডানা বলল, ‘দারুণ ব্যাপার। এটা আমি সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি’ ডানা মেডেল নিয়ে চলে গেল। এর আগের লন্ডন ওলিম্পিকে, তখনও ওদের বিয়ে হয়নি, ডানার পদবি তখন ইনগ্রোভা, জ্যাভেলিনে সেভেন্থ হয়েছিল। ডানা প্রথমবারই যে থ্রো—টা করল তাতেই সোনা, আর ওলিম্পিক রেকর্ড! লন্ডনে যতটা দূরে ছুড়েছিল এখানে তার থেকে সাড়ে পঁয়ত্রিশ ফুট দূরে ছোড়ে।”
”বলেন কী! চার বছরে এত উন্নতি? সা—ড়ে—পঁ—য়—ত্রি—শ ফুট! …খুব প্র্যাকটিস করেছিল।”
”শুধুই কি প্র্যাকটিস? স্বামীর ওই সোনা জেতাও কি শরীরে, মনে প্রেরণা জোগায়নি? মজার ব্যাপার হল, এমিল এটারই ইঙ্গিত দিয়ে ঠাট্টা করে বলল, বউয়ের সোনা জেতায় তারও হাত আছে। ব্যস, শুনেই তো ডানা রেগে উঠল। বলল, প্রেরণা জোগালেই বুঝি অতদূর পর্যন্ত জ্যাভেলিন ছোড়া যায়? কত তো মেয়ে রয়েছে, তাদের প্রেরণা জুগিয়ে দ্যাখো তো একবার, অতদূর পর্যন্ত ছুড়তে পারে কি না?’ নারান বোঝ তা হলে, দু’জনের মধ্যে কতটা মনের মিল থাকলে তবেই এমন ঝগড়া করা যায়। …একজন এমিলকে বলল, ‘দুটো সোনা তো জিতলেন, এবার ম্যারাথনটাও কি জিততে চান?’ এমিল বলল, ‘জ্যাটোপেক পরিবারে স্কোর এখন দুই—এক। ব্যবধানটা এত কাছাকাছি যে, বাড়িতে বোধ হয় খাতিরটা কমেই যাবে। ওটা আর একটু উঁচুতে তোলার জন্য এখন তো ম্যারাথন রেসে আমাকে চেষ্টা করতেই হবে!’ বোঝ নারান!” বলেই রবিবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন।
আর তখনই আটশো মিটারের প্রতিযোগীদের স্টাটিং লাইনে আসার জন্য লাউস্পিকারে অনুরোধ জানানো হল। নারান উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ”বাড়িতে আমার খাতির নেই রবিবাবু। আমার বউ এক একরাতে ঠোঙা বানায় হাজারেরও বেশি আর আমার হয় বড়জোর সাতশো!”
স্টার্টিং লাইনে টোলুবাবু একা দাঁড়িয়ে। নারান বিস্মিত হয়ে বলল, ”আর সব কই?”
”আমিও তো খুঁজছি, গেল কোথায় সবাই?”
ঘোষণা হচ্ছে বার বার : ”আটশো মিটার দৌড়ের প্রতিযোগীরা, আপনারা এক্ষুনি আরম্ভ—সীমায় চলে যান…দেরি করবেন না। পরের ইভেন্টগুলো শুরু করতে তা হলে দেরি হয়ে যাবে। …দিস ইজ লাস্ট কল ফর দ্য…”
মাণ্টাবাবু এলেন হন্তদন্ত হয়ে।
”কেউ নামতে চাইছে না। মণিবাবু বললেন, ওঁকে এখনই একটা প্রেস কনফারেন্সে যেতে হবে, পল্টু বলল, ‘পেট ব্যথা করছে’, সুজয় বলল, ‘মাথা ধরেছে,’ রামভরণ আর বাসুদেবকে খুঁজে পেলুম না, বলাই মিত্তির আর গজুকে হাতে পায়ে ধরে রাজি করিয়েছি তবে ওরা এক পাকের বেশি দৌড়বে না বলেছে…এখন কী করি? ইভেন্টটা ক্যানসেল করে দেব?”
”না, না, করবেন না।” নারান প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, ”কেউ না দৌড়লে আমি একাই দৌড়ব।”
”ব্যাপার কী, নামতে চাইছে না কেন?” টোলুবাবু জানতে চাইলেন। নারানের দিকে আঙুল দেখালেন মাণ্টাবাবু।
”আগের দুটো রেসে যেভাবে এগিয়ে থেকে নারান সবাইকে হারাল, তাইতে সবাই মনে করছে তারা বেইজ্জত হয়েছে। একজন বয়স্ক লোকের কাছে এত পিছিয়ে থেকে হার…অফিসে আওয়াজ খাওয়ার কথা ভেবেই ওরা…”
”মাণ্টাবাবু তা হলে আমি নামব না। আপনি ওদের বলুন যে নারান…”
”চঅঅপ।” টোলুবাবুর ধমকে নারান থতমত হল। ”ওদের জন্য তোর হ্যাটট্রিক বন্ধ হবে আমি থাকতে? ফাঁকা মাঠে গোল দিলে সম্মান থাকে না,…অসম্মান নিয়ে জিতবি কেন?…চল, আমি তোর সঙ্গে নামব। স্পোর্টস রিপোর্টিং করি, বুঝলি, স্পোর্টসম্যানশিপ দেখাতে জানি।”
টোলুবাবুকে অনেক বুঝিয়েও নিরস্ত করা গেল না। হার্ট, গ্যাস্ট্রিক, ব্লাডপ্রেশার, স্পন্ডলাইসিসের ভয় দেখানো হল, কিন্তু কিছুই কানে নিলেন না। সাব—এডিটর বলাই মিত্তির আর টেলিফোন অপারেটর গজুর সঙ্গে তিনিও হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে দাঁড়ালেন স্টার্ট নিতে। মাণ্টাবাবু হুইসল দিয়ে শুরু করালেন। সবাই ধীর গতিতে একসঙ্গে ছুটতে লাগল। নারান হুঁশিয়ার হয়ে রয়েছে, বাকি তিনজনের থেকে যেন সে একহাতও এগিয়ে নিয়ে যায়।
