”নামাচ্ছি, কিন্তু কিছু হয়ে গেলে আপনি দায়ী হবেন।” মাণ্টাবাবু ব্যাজারমুখে আবার মাঠের ভিতর চলে গেলেন।
”কী রে নারান, তোর জ্যাটোপেক হবার শখটা এবার মিটিয়ে নে। পারবি তো?”
”রবিবাবু, আমি সাত জীবনেও জ্যাটোপেক হতে পারব না। উনি যে কাণ্ড করেছেন, পৃথিবীর সব থেকে বড় জায়গা ওলিম্পিকে করেছেন! কত বড় বড় পাল্লার কম্পিটিশন ছিল সেগুলো! আর তালতলা মাঠে আমি? তুলনা হয়?” নারান হেসে ফেলল। ”তবে একটা মিল ওঁর সঙ্গে আমার আছে, আমাদের জন্ম একই তারিখে।”
”তা হলেই হবে।” রবিবাবু ঠাট্টার সুরে বললেন। ”কাগজ বিলি আর নাইটি ডিউটি করে তুই যা পরিশ্রম করেছিস আমার তো মনে হয় না জ্যাটোপেক প্র্যাকটিসে অত পরিশ্রম করেছে। ঘাবড়াসনি, দুগ্গা বলে নেমে পড়।”
নারান নেমে পড়ল, হাঁটু পর্যন্ত ধুতিটা তুলে কোমরে গুঁজে নিয়ে। প্রথমে চারশো মিটার দৌড়। দুশো মিটারের ট্র্যাক। দু’পাক দৌড়তে হবে। তাকে নিয়ে ছ’জন প্রতিযোগী। স্টাটিং লাইনে মেশিন বিভাগের একজন আর সার্কুলেশন বিভাগের একজনকে দেখে নারানের মনে হল ওরা তার অর্ধেক বয়সি। এই দুজনকেই নজরে রাখতে হবে। এরা একেবারেই তার অজানা। বাকি তিনজনের মধ্যে রয়েছে দরোয়ান রামভরণ, পিওন রাধেশ্যাম আর রিপোর্টার মণিবাবু। এরাও তার থেকে কমপক্ষে দশ বছরের ছোট। এরা যে তার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, এটা সে আন্দাজ করে নিল তাদের পেটের পরিধি থেকে।
স্টার্টার টোলুবাবু। নারানকে দেখে তো তিনি অবাক। ”এত বছর অফিসে স্পোর্টস হচ্ছে, অথচ স্পোর্টস ডিপার্টমেন্ট থেকে এই প্রথম তুই চারশো মিটারে নামলি।”
”আমি তো বেয়ারা ডিপার্টমেন্ট থেকে নেমেছি!”
”রাখ তোর বেয়ারা ডিপার্টমেন্ট। তুই আমাদের ডিপার্টমেন্টের লোক। যদি জিততে পারিস, তা হলে…” টোলুবাবু তিন সেকেন্ডের জন্য থমকালেন আর সেই ফাঁকে নারান বলল, ”ডুরান্ড ফাইনালে উঠে মোহনবাগান হারাবে ইস্টবেঙ্গলকে, তাই তো?”
”তোর ওই এক কথা, আগে ওরা উঠুক তো! তুই জিতলেই মোহনবাগান যেন জিতবে! আর তাই ভেবে নিয়ে নিজের টিমকে জেতাতে এখনই যেন হেরে বসিসনি। মনে রাখিস, ডুরান্ডের থেকেও বড় আমাদের ডিপার্টমেন্টের ইজ্জত। দু’ পাক শেষ করতে হবে কিন্তু সবার আগে।”
সবার আগেই সে শেষ করল। তার অর্ধেক বয়সিদের একজন, মেশিন বিভাগের ছেলেটি দ্বিতীয় হল তার পঁচিশ গজ পিছনে থেকে। সার্কুলেশনের ছেলেটি দেড়পাকের পর পেটে হাত দিয়ে বসে পড়ে। মণিবাবু তৃতীয় হলেন রামভরণ আর রাধেশ্যামের সঙ্গে, পরদিন কাগজে বেরিয়েছিল, ‘তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়া’।
সার্কুলেশনের ছেলেটি শুরু করেছিল যেভাবে তাতে নারান একটু ভয়ই পায়। পঞ্চাশ মিটার রেসে দৌড়ের মতো গতিতে সবাইকে পিছনে ফেলে ছেলেটি অন্তত কুড়ি মিটার এগিয়ে যায়। মেশিনের ছেলেটি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গতি বাড়িয়ে দেয় ওর সঙ্গে থাকার জন্য। নারান একই গতিতে বাকি তিনজনের পাঁচ মিটার সামনে থেকে দৌড়ে চলে। প্রথম পাক শেষ হতেই সে গতি বাড়িয়ে দেয়। দেড় পাকের আগেই দুজনকে পাশ কাটিয়ে সামনে চলে আসে। তখন তার মনে হল, এতক্ষণ সে হেঁটেছে এইবার দৌড়টা শুরু করা যাক। এবং তাই সে করল।
পশমের সুতো বুক দিয়ে ছিঁড়ে ফেলেই সে ধাক্কা খেল টোলুবাবুর বুকে। নারানকে দু’ হাতে জড়িয়ে, দশ মাইল দৌড় শেষ করার মতো হাঁফাতে হাঁফাতে টোলুবাবু বললেন, ”আমার দমবন্ধ হয়ে আসছিল নারান তোর ছোটা দেখে। চারশো মিটারে এই প্রথম আমরা জিতলাম। আমার মনে হচ্ছে…”
”ডুরান্ড আপনারাই পাচ্ছেন।”
”না না, ওসব ভাবছি না…মনে হচ্ছে, দুশোটাও তুই জিতবি।”
নারান জিতল।
তাকে নিয়ে প্রতিযোগী আটজন। সবাই তার থেকে কমবয়সি। কিন্তু সে চিন্তিত নয়। চারশো মিটার তাকে গরম করে দিয়েছে। এখন সে দৌড়বার মজাটা পেয়ে গেছে। দূরত্বটা ছোট, তাই শুরু থেকেই সে এগিয়ে রইল আর একই গতি বজায় রেখে শেষ করতে তার অসুবিধা হল না। তার মনে হল, জ্যাটোপেককে দেখবে বলে ট্রেন ধরার জন্য যে গতিতে সে দশ বছর আগে দৌড়েছিল তার থেকে অনেক কম জোরেই দৌড়েছে।
”বড্ড ছোট মাপের দৌড়। বুঝলেন টোলুবাবু, খুব একটা আরাম হল না। আটশোটা চার পাকের, ওটা দৌড়লে বোধ হয় সুখ পাব, কী বলেন?”
”জিতলে তো তুই জ্যাটোপেক হয়ে যাবি রে…মানে, অফিসের জ্যাটোপেক!”
”আপনিও ওই নামটা করলেন! আমাকে লজ্জায় ফেলার জন্য দেখছি আপনারা সবাই ষড় করেছেন। নাহ, আটশো মিটার হেরে গিয়ে আমাকে এখন লজ্জা থেকে বাঁচতে হবে।” ক্ষুব্ধ স্বরে নারান বলল।
”প্লিজ, নারান, প্লিজ, তুই হারিসনি, তা হলে ডুরান্ডে সব্বোনাশ হয়ে যাবে।” টোলুবাবু আঁকড়ে ধরলেন নারানের দুই মুঠো।
”তা হলে ওঁর সঙ্গে কখনও আমার নাম একসঙ্গে উচ্চচারণ করবেন না বলুন? …হিমালয়ের সঙ্গে উইঢিপির কোনও তুলনা সম্ভব?”
টোলুবাবু জানালেন তিনি জ্যাটোপেক নাম আর উচ্চচারণ করবেন না। এখন বাচ্চচাদের আর মেয়েদের কয়েকটা ইভেন্ট, তারপর আটশো মিটার। বিশ্রাম দেবার জন্যই এইভাবে ইভেন্ট সাজানো। নারানকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেন রবিবাবু।
”এই আটশো মিটারটা জিতলে তুই…”
”দোহাই রবিবাবু, আর আমাকে জ্যাটোপেক বলবেন না।” নারান জোড় হাতে অনুরোধ জানাল।
রবিবাবু বিস্মিত হয়ে বললেন, ”তিনটে ইভেন্ট জিতলেই জ্যাটোপেক হওয়া যায় নাকি? মাথা খারাপ না হলে কেউ তা বলতে পারে? আরে, আমি বলছিলাম কী, এটা জিতলে তুই প্রমাণ করবি, মানুষের যৌবন শুরু হয় চল্লিশ বছর বয়স থেকে…অবশ্য যদি সে অন্য ধাতুতে গড়া হয়!”
