”বেশ সাত হাজারই দোব। কিন্তু…”
বিষ্টু ধরের কথা শেষ হবার আগেই চাকর ঘরে ঢুকে জানাল, একজন মাইজি’ দেখা করতে এসেছে।
এরপর ক্ষিতীশকে অবাক করে ঘরে ঢুকল লীলাবতী। ক্ষিতীশকে এখানে দেখে সেও অবাক। তবে কোন কথা বলল না।
”টাকাটা এনেছি।” লীলাবতী তার স্বাভাবিক গাম্ভীর্যে বিষ্টু ধরকে বলল।
ব্যস্ত হয়ে বিষ্টু বলল, ”পাশের ঘরে আসুন, আপনার রসিদ—টসিদ সব রেডি করা আছে।”
ওরা দুজন ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং মিনিট পাঁচেক পরই বিষ্টু একা ঘরে ফিরে এল। ক্ষিতীশ তখন কৌতূহলে ফেটে পড়ার মতো অবস্থায়।
”কি ব্যাপার, কিসের টাকা?”
”ওই একটা ঘর নেওয়ার ব্যাপারে। হাতিবাগানে আমার একটা বাড়িতে, এরা দোকান করবে টেলারিং শপ। তাই কিছু টাকা দিয়ে গেল।”
”পাঁচ হাজার টাকা!”
বিষ্টু ধর চমকে উঠল। ”কি করে জানলেন!”
”টাকাটা যার কাছ থেকে নিলেন সে আমার স্ত্রী। ওর কাছ থেকে সেলামি নেওয়া মানে আমার কাছ থেকেই নেওয়া।”
বিষ্টু ধর ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল ক্ষিতীশের গম্ভীর মুখ দেখে। তোতলা স্বরে বলল, ”আমি তো তা জানতাম না।”
”আমিও জানতাম না আপনিই বাড়িওলা। যাই হোক, এবার আমরা দুজনেই জানলাম। জানার পর, আপনি কি টাকাটা এখন নেবেন?”
বিষ্টু আরো তোতলা হয় গেল। ”ইয়ে এটা তো ব্যবসার ব্যাপার…আমাকে তো খেয়ে পরে বাঁচতে হবে।”
ক্ষিতীশ উঠে দাঁড়াল। ”চলি। বিনোদ ভড় কোর্টে বেরিয়ে গেছে। তা রাত্তিরেই দেখা করব ওর সঙ্গে।”
”না না প্লিজ যাবেন না।”
”হাজার দুয়েক টাকা ডোনেশন আর একটা নাইলনের কি বেলনের কস্ট্যুম কেনার জন্য একশো টাকা যদি দিতে পারেন তা হলে গ্যারান্টি দিচ্ছি অ্যাপোলোর প্রেসিডেন্ট করে দেবই। তবে এই সেলামির টাকটা ফেরত দিতে হবে। তাছাড়া বক্তৃতাও আমি আর লিখে দিতে পারব না।”
বিষ্টু ধর চূর্ণ বিচূর্ণ। কথা বলার আর ক্ষমতা নেই। দুই চোখ ছলছলিয়ে উঠছে। শুধু মাথাটি নেড়ে বলল, ”গাছে অনেক দূর উঠে গেছি। মই কেড়ে নিলে নামতে পারব না।”
বিষ্টু ধর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল এবং একশো টাকার নোটের বান্ডিল নিয়ে ফিরে, সেটা ক্ষিতীশের হাতে দিয়ে বলল, ”উনি আপনার স্ত্রী হন তো?”
”আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি!”
বিষ্টু জিভ কেটে কান মুলল। ক্ষিতীশ আর অপেক্ষা করল না। বেরিয়ে আসছে, তখন শুনল বিষ্টু কাতর কণ্ঠে বলছে, ”আমার বক্তৃতাটার কি হবে!”
”দোব দোব, লিখে দোব।”
বাড়ি ফিরে ক্ষিতীশ নোটের বাণ্ডিলটা নিজের বাক্সে রেখে দিয়ে ভাবতে শুরু করল, এবার কি করবে! টাকাগুলো লীলাবতীকে ফেরত দিতেই হবে, কিন্তু তার বিনিময়ে কিছু আদায়ও করে নিতে হবে। এবং তা করতে হবে কোনিরই জন্য।
লীলাবতী বাড়িতে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করল, ”ওখানে তুমি কি করছিলে?”
”মাঝে মাঝে যাই বুদ্ধি পরামর্শ দিতে। তুমি কেন গেছলে?”
”ওর কাছ থেকেই তো ঘর নিয়েছি। সেলামির টাকাটা দিতে গেছলুম।”
ক্ষিতীশ হাই তুলে, আড়মোড়া ভেঙ্গে বলল, ”আগে যদি আমায় বলতে তাহলে টাকাটা দিতে হতো না। আমি বারণ করলে বিষ্টু ধরের সাধ্যি নেই টাকা নেবার, তবে বললে টাকাটা ফেরত দিয়ে দেবে।”
”দ্যাখো না একবার বলে, অনেকগুলো টাকা। দেবার সময় গা করকর করছিল।” লীলাবতী ব্যগ্র হয়ে বলল।
”কিন্তু কোনিকে যে ওর বাড়িতেই খাওয়ার ব্যবস্থা করব ভাবছিলাম। এরপর কি অতগুলো টাকা ফেরত দেবার কথা বলা যায়! মেয়েটাকে যে খাটাব, তার জন্য কিছু তো করতে হবে! দাও গামছাটা, চান করে আসি।”
বিকেলে লীলাবতী অন্য মূর্তি ধরে বলল, ”পরের মেয়ের জন্য তো খুব মাথা—ব্যথা। আর আমি যে এত কষ্ট করে দোকানটা দাঁড় করালাম, তিল—তিল করে টাকা জমিয়ে ব্যবসাটা বড় করার চেষ্টা করছি, তাতে একটু সাহায্যও কি করবে না!”
ক্ষিতীশ বাড়ি থেকে দ্রুত বেরিয়ে যাবার আগে শুধু বলে গেল, ”আচ্ছা দেখছি।”
”অ্যাপোলোয় সারা বিকেল অপেক্ষা করল ক্ষিতীশ, কোনি এল না। নকুল মুখুজ্জের সঙ্গে দেখা হল।
”প্রেসিডেন্ট পেয়েছি, কত টাকা ডোনেশান চাও, নকুলদা?”
নকুল একটু হকচকিয়ে বলল, ”কত টাকা মানে? এখন বটুবাবু পাঁচশো দিচ্ছে, তাও টিপে টিপে দেয়।”
”ঠিক আছে। আমি দু’হাজারী ধরেছি।”
ক্ষিতীশ তারিয়ে তারিয়ে নকুল মুখুজ্জের অবস্থাটা লক্ষ করার পর বিষ্টু ধর সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জানিয়ে বলল, ”কিছু ভেব না তুমি, টাকা এসে যাবে। তবে আমার ওই মেয়েটার পুরো ট্রেনিং ফেসিলিটি দিতে হবে কিন্তু।”
নকুল মুখুজ্জে একগাল হেসে মাথাটা হেলিয়ে বলল, ”নিশ্চয়।”
অ্যাপোলো থেকে বেরিয়ে ক্ষিতীশ ভাবল, মেয়েটা কেন আজ এল না, একবার খোঁজ নেওয়া দরকার। বড্ড ফাঁকিবাজ। কিছুর একটা লোভ না দেখালে খাটতেই চায় না। তবে একটা দুর্বলতা আছে, সেটা ওর অপমানবোধ। ক্ষিতীশের প্রায়ই মনে পড়ে, প্রাইজ না নিয়ে লেক থেকে কোনির চলে আসা আর ঘুরে দাঁড়িয়ে তার বিজয়ীর নামটি শোনার সেই ভঙ্গিটি। দাদার কাছ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে অপরাধীর মতো মুখ নিচু করে থাকা মেয়েটি হঠাৎ যেন দপ করে জ্বলে উঠেছিল।
বস্তির মধ্যে আলো নেই। ক্ষিতীশ একটু অসুবিধায় পড়ল ঘরটা খুঁজে বার করতে। অবশেষে একটা বাচ্চচা ছেলে তাকে দেখিয়ে দিল। ঘরের মধ্যে কুপি জ্বলছে। কোনির ছোট ভাই দুটো মেঝেয় ঘুমিয়ে। তক্তপোশে সম্ভবত ওর মা শুয়ে। ক্ষিতীশ ডাকল, ”কোনি।”
