অফিসে তার কাজের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। তবে রবিবাবু রিটায়ার করেছেন। নতুন দুজন খেলার বিভাগে এসেছেন, শ্যামল কুণ্ডু আর শৈলেন রায়। ওরা অল্পবয়সি, তাকে নারানদা বলে ডাকে। মাণ্টাবাবু টোলুবাবু, অনাদিবাবু একই রকম আছেন, শুধু চুল পাতলা হয়েছে, মুখের চামড়া আলগা হয়েছে, আর প্রত্যেকেই সামান্য মোটা হয়েছেন।
গত দশ বছরে নারানের জীবনে শুধু একটিই ঘটনা ঘটেছে, যেটা তার জীবনে একটা বড় ব্যাপার। ছয় বছর আগে, অফিসের বাৎসরিক স্পোর্টস দেখতে যাওয়া।
ময়দানে তালতলা মাঠে হত অফিসের স্পোর্টস। নারান শুনেছে, নানান বিভাগের নানান বয়সিরা এতে অংশ নেয়। বেয়ারাদের মধ্যে শুধু অনিল আর দিকপতি এতে নামে—তিনপায়ের দৌড়ে আর আধ মাইল ভ্রমণে। কর্মচারীদের ছেলেমেয়ে, বউদের জন্যও ইভেন্ট আছে।
তখন সবে নৈশ ভাতা চালু হয়ে নারানের নাইট ডিউটি বন্ধ হয়েছে। সেদিন রবিবার, ডিউটি ছিল সকাল দশটা—পাঁচটা। নারান স্পোর্টস দেখতে অফিস থেকে মাঠে চলে যায় দুপুরে। মাণ্টাবাবু স্পোর্টস সংগঠনের দায়িত্বে। এন্ট্রি নেওয়া থেকে শুরু করে, ইভেন্টের সূচী তৈরি করা, সভাপতি নির্বাচন থেকে প্রাইজ কেনাকাটার দায়িত্বটাও তাঁর।
শামিয়ানার নীচে বড় একটা টেবলে প্রাইজগুলো সাজানো। দেখেই নারানের মনে পড়ে গেল তার স্কুলের স্পোর্টসের কথা। ছোট ছোট কাপ আর মেডেলে সাজানো টেবলটা যেন দোকানের মতো হয়ে উঠত। দেখলেই লোভ হত, বাড়িতে এসে আলমারিতে সাজাবার। প্রতি বছর দু—তিনটে কাপ বা মেডেল সে জিতত। ক্লাস টেনে পড়ার সময় গো—অ্যাজ—ইউ—লাইকে জেতা কাপটাই ছিল তার জীবনের সব থেকে বড় কাপ। প্রায় এক হাত লম্বা। প্রথম প্রথম সে কাপ—মেডেলগুলো নিয়মিত ঝেড়েমুছে ঝকঝকে করে রাখত। তারপর আর যত্ন করত না। এক সময় রং চটে গিয়ে হলুদ হয়ে গেল। দেশভাগের পর, চলে আসার সময় ওগুলো ফেলে রেখে আসে।
এখন তালতলা মাঠে দাঁড়িয়ে প্রাইজগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনের মধ্যে ছাত্রজীবনের চাঞ্চল্য জাগল। প্রাইজ জেতার ইচ্ছেটা আবার নতুন করে তাকে পেয়ে বসল। তবে অফিসের স্পোর্টসে কাপ—মেডেলের থেকে নিত্য ব্যবহারের জিনিসই বেশি। তা হোক, কাপ—মেডেল সাজাবার মতো কাচের আলমারি তার ঘরে নেই, বরং সংসারের প্রয়োজনে লাগার জিনিসই দরকার।
রিটায়ার করে গেলেও রবিবাবু স্পোর্টসের দিন মাঠে আসেন। শামিয়ানার ছায়ায় একটা চেয়ারে বসে অফিসের অ্যাকাউন্টস বিভাগের দুজন প্রবীণ লোকের সঙ্গে তিনি কথা বলেছিলেন। নারান তাঁর কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
”কী রে নারান, আছিস কেমন? তুই তো একটুও বদলাসনি দেখছি। …পরিশ্রম করাটা তা হলে চালিয়ে যাচ্ছিস?”
”কাগজ তো আর বেচি না, তাই খাটুনিটা কমে গেছে।” নারান চিন্তিত স্বরে বলল, ”তাই ভাবলাম একটু দৌড়োদৌড়ি করা দরকার। আপনি একটু মাণ্টাবাবুকে বলে দেবেন?”
”কেন, কী জন্য?”
”ভাবছিলাম স্পোর্টসে নামব।”
”ভাল কথা। নাম। কোন ইভেন্টে, নামছিস?”
”এখন আর কী করে নামি। পরশু দিনই তো এন্ট্রি নেওয়ার লাস্ট ডে ছিল।”
”আরে এটা ওলিম্পিক না এশিয়ান গেমস যে দেরিতে নাম দেওয়া যাবে না? ডাক মাণ্টাকে…এই যে অ্যাই, মাণ্টা, এদিকে আয়।”
হাতে কাগজপত্র নিয়ে মাণ্টাবাবু তখন মাঠের মাঝ থেকে ফিরছিলেন, রবিবাবুর ডাক শুনে এগিয়ে এলেন।
”আর কী কী ইভেন্ট বাকি রয়েছে?”
”অনেক বাকি আছে। ছোটদের স্পুন রেস, সেলাই রেস, জিলিপি রেস, মহিলাদের ব্যালান্স রেস, ফিফটি মিটার, মিউজিক্যাল…”
”থাক থাক, তুই তো ধ্যারারারা রেকারিং ডেসিমিল চালিয়ে দিলি দেখছি। বড়দের কী কী বাকি?”
”এইট হানড্রেড, ফোর হান্ড্রেড, টু হান্ড্রেড, স্যাক রেস, ওয়াকিং, থ্রিলেগেড রেস, টাগ অব ওয়ার।”
”নারানের নামটা নিয়ে নে। ও নামবে।”
”সে কী! এই লাস্ট মোমেন্টে। আচ্ছা নারান, তুই তো কালকেও আমাকে বলতে পারতিস!” মাণ্টাবাবু বিরক্ত হয়ে হাতের কাগজ উলটে—পালটে দেখলেন। ”একশো মিটার তো এইমাত্র হয়ে গেল, আচ্ছা তা হলে স্যাক রেস আর ওয়াকিংয়ে দিয়ে দিচ্ছি।”
”না না না।” নারান প্রায় আঁতকে উঠল। ”থলের মধ্যে ঢুকে ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে আমি যেতে পারব না। ওসব বাচ্চচাদেরই সাজে।”
”তা হলে ওয়াকিংয়ে নাম।”
”না মাণ্টাবাবু, হাঁটাহাঁটি বুড়োদের মানায়।”
”তুই কি ছোকরা নাকি যে, হাঁটবি না শুধু দৌড়বি?” মাণ্টাবাবু তির্যক স্বরে বলেন।
”আমাকে বরং দৌড়ের ইভেন্টগুলোতে দিন।”
”দৌড়ের।” হাতের কাগজ দেখে চিন্তিতভাবে মাণ্টাবাবু বললেন, ”তা হলে দুশো মিটারে…পারবি তো?”
”আমাকে তিনটেতেই দিন…আটশো, চারশো আর দুশো মিটারে।”
”কী বললি! তিনটেতে? তুই কি জ্যাটোপেক হয়ে গেছিস ভাবছিস?”
নারান মাথা চুলকে বলল, ”একবার চেষ্টা করে দেখিই না।”
”তোর বয়স কত সেটা একবার ভেবে দেখেছিস? পর পর তিনটে রেস!”
”তিনটে রেস জুড়লে কত হবে?” নারান মনে মনে যোগ দিয়ে বলল, ”চোদ্দো শো মিটার। এক মাইলটাক হবে, না তারও বেশি?”
”এক মাইলের একটু কম। না না, অত তুই পারবি না। দৌড়বার অভ্যেস নেই, শেষকালে…”
”মাণ্টা ওকে নামতে দাও।” রবিবাবু এতক্ষণ ওদের কথা শুনে যাচ্ছিলেন, এইবার মুখ খুললেন। ”নারান এক সময় রোজ পঁচিশ—তিরিশ মাইল সাইকেল চালাত। ওর কলজে আর মাসল তৈরি আছে। নামিয়ে দ্যাখোই না!”
