নারানের চোখে জল এসে গেল। আর তখনই কর্কশ শব্দ করে ট্রেনটা, দু’—তিনটে ঝাঁকুনি দিল।
”কী ব্যাপার?” সামনের লোকটিকে সে প্রশ্ন করল ভীত চোখে তাকিয়ে।
”কী জানি! এর আগেও একবার ওরকম করেছিল।”
লোকটার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গেই ট্রেনও দাঁড়িয়ে পড়ল। সবাই কারণ জানার জন্য জানলা আর দরজা থেকে মুখ বাড়াল। হঠাৎ মাঝপথে থেমে যাওয়ায় কেউ কেউ ভয় পেল। ডাকাত পড়বে না তো?
”দিনের বেলায় ডাকাত কোথায়?” একজন বলল। ”দেখুন এঞ্জিনের হয়তো কয়লা ফুরিয়ে গেছে!”
অনেকে ট্রেন থেকে নেমে কারণ জানতে গেল ড্রাইভারের কাছে। নারান পাশের লোকের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল, ”সাত মিনিট গেল।”
হাতুড়ি মারার শব্দ হচ্ছে। বাইরে থেকে একটা গলা ভেসে এল, ”ব্রক আটকে গেছে। হাতুড়ি মেরে খোলার চেষ্টা করছে।”
এত দিন ধরে সে ট্রেনে যাতায়াত করছে, এক দিনও ব্রেক আটকাবার ঘটনা ঘটেনি। আর ঠিক আজকেই! নারান ঘড়ির দিকে তাকাল। এগারো মিনিট নষ্ট হল এখানে দাঁড়িয়ে, সে চোখ বন্ধ করল। খিদে আর তেষ্টা ধীরে ধীরে মরে আসছে। শরীরটা অসাড় লাগছে।
ট্রেনের সিটি দেবার শব্দে সে চোখ খুলল। যারা ট্রেন থেকে নেমেছিল, তাড়াহুড়ো করে তারা উঠছে। একটু পরেই ট্রেন চলতে শুরু করল। মন্থর গতিতে, এমন সাবধানে চলেছে যেন সামনেই কোথাও লাইনের ফিশপ্লেট খোলা রয়েছে! এভাবে চললে কতক্ষণে শেয়ালদায় পৌঁছবে? কতক্ষণে সে মাঠের গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে চিৎকার করবে—”জ্যাটোপেক…জ্যাটোপেক…।”
শেয়ালদা পর্যন্ত ট্রেনটা ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে এল। নারান প্ল্যাটফর্মের ঘড়িতে দেখল, পৌনে চারটে। আর পনেরো মিনিট পর শুরু হবে দৌড়। ভিড় ঠেলে, ধাক্কা দিয়ে লোক সরিয়ে সে ছুটল ট্রাম স্টপের দিকে।
নেতাজির জন্মদিন। রাস্তায় আজ লোক বেশি। জাতীয় পতাকা, নেতাজির ছবি আর ব্যান্ড বাজিয়ে শোভাযাত্রা বেরিয়েছে, গন্তব্য বোধ হয় শ্রদ্ধানন্দ পার্ক। দু’দিকেই সার সার সবুজ রঙের ট্রাম দাঁড়িয়ে পড়েছে, সেই সঙ্গে বাসও। ট্রামে বসে নারান স্টেশনের মাথায় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, বাঁ হাতের তালুতে ডান হাতের কিল বসিয়ে হতাশ স্বরে নিজেকেই বলল, ”ভাগ্য!…কেন যে ভূতে তাড়া করল!”
থেমে থেমে ট্রাম মৌলালি পৌঁছল, ধর্মতলা স্ট্রিট দিয়ে যদিও বা জোরে চলল, আবার আটকে গেল ওয়েলিংটন পার্কের মোড়ে। সভা হবে, তাই শোভাযাত্রা আসছে। হঠাৎ নারানের রোখ চেপে গেল। জ্যাটোপেকের দৌড় সে দেখবেই। এখন থেকে মোহনবাগান মাঠটা কতদূরই বা, সে ছুটেই যাবে।
ট্রাম থেকে নেমে সে ভিড়ের মধ্যে কখনও হনহনিয়ে হেঁটে, কখনও রাস্তায় নেমে দৌড়ে ছুটে যেতে লাগল। মাঝে মাঝে থমকে দোকানের ঘড়িতে সময় দেখে নিচ্ছে।
….চারটে…চারটে তিন…চারটে সাত…চারটে দশ। এসপ্লানেড, কার্জন পার্ক, তারপর ভবানীপুর মাঠ। নারানের ফুসফুস আর বাতাস টানতে পারছে না। রেড রোড পার হয়ে মহামেডান তাঁবুর কাছে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁ করে শ্বাস নিতে নিতে চোখে অন্ধকার দেখল। শরীর টলছে। সেই সময় সে শুনল প্রবল এক সমবেত হর্ষধ্বনি আর হাততালি।
নারান ধীরে ধীরে বসে পড়ল, নিশ্চয় দৌড় শেষ হয়ে গেল। দেখা হল না…দেখা হল না…। মাথা নাড়তে নাড়তে সে ঘাসে শুয়ে পড়ল।
”বিশ্ববিখ্যাত অ্যাথলিট, ওলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন এমিল জ্যাটোপক, আপনারা দেখলেন, তিনি প্রথম হলেন। তাঁর সময় হয়েছে পনেরো মিনিট আঠারো সেকেন্ড। দ্বিতীয় হয়েছেন ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের সুনীল বসু। তাঁর সময় হয়েছে : সতেরো মিনিট সতেরো দশমিক…” লাউডস্পিকারে ভেসে আসছে ঘোষকের গলা। নারানের চোখের পাতা বুজে এল।
তার চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে নামল।
।। ৪।।
তারপর দশটা বছর কেটে গেছে।
নারানের এখন আর পাকাপোক্ত নাইটি ডিউটি নেই। নাইট ডিউটি করলে একটাকা পাওয়া যাবে, এই নৈশ ভাতা চালু হতেই দাবি ওঠে, নারান একাই কেন ডিউটি করবে? সবাই যাতে ভাতার টাকা পায় সেজন্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অন্য বেয়ারাদেরও এই সুযোগ দিতে হবে। এর ফলে নারানকে টানা আট বছর নাইট ডিউটি করার পর সকালের বা বিকেলের ডিউটি শুরু করতে হল, আর সেই জন্য কাগজ বিলি করার কাজটা তাকে ছাড়তে হয়।
ইতিমধ্যে সংসারে মানুষও বেড়েছে। এখন তার এক মেয়ে নয়ন আর চার ছেলে—অবনী, নবনী, রজনী এবং গৌতম। নয়নের বয়স একুশ, অবুর, তেরো, নবুর নয়, রাজুর সাত আর গৌতমের এক বছর। ঘরও একটা বাড়িয়েছে। মাটির দেয়ালে টালির ছাদ। গোরু বিক্রি করে গোয়ালটা ভেঙে দিয়েছে। নয়ন ক্লাস সেভেন পর্যন্ত স্কুলে পড়ার পর, সংসারের আর ভাইদের দেখাশোনার জন্য স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কেননা মহামায়া তখন উলটোডাঙায় একটা কাঠের খেলনা তৈরির কারখানায় কাজ পেয়েছিল। হপ্তায় আঠারো টাকা মাইনে। মেয়ের বিয়ে দেবার জন্য মহামায়া টাকা জমাতে শুরু করেছে। সকাল আটটায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাত আটটায় ফিরত। অবুর টাইফয়েড হওয়ায় সে কাজটা ছেড়ে দিয়ে ঠোঙা তৈরিতে সময়টা দেয়।
এই দশ বছরে নারানের শারীরিক কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। একই রকম ছিপছিপে রয়েছে, চোদ্দো বছর আগে চাকরিতে ঢোকার সময় যেমনটি ছিল, শরীরে বাড়তি মেদ নেই, চুল একটিও পাকেনি, বয়স ছেচল্লিশ। রাতে স্বামী—স্ত্রী, নয়ন আর অবু, পুরো পরিবারই, ঠোঙা তৈরি করতে বসত। রাত দেড়টা পর্যন্ত তারা প্রায় পাঁচ ঘণ্টা কাজ করত। ঠোঙা বিক্রি করত একটাকায় বারো দিস্তা।
