২৩ জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন। নারান ক্যালেন্ডারে দেখল দিনটা সোমবার। শনিবার হরতালের দিন কাগজ ছেপে বেরোবে বটে, কিন্তু ট্রেন বন্ধ থাকায় সে কাগজ নিয়ে যেতে পারবে না। কাগজের ভ্যান দমদম পর্যন্ত যাবে। কিন্তু তাতে তার কোনও সুবিধে নেই। ওখান থেকে ধান্যকুড়িয়া ৩০ মাইল। শুক্রবার রাতে ডিউটি করে অফিসেই থেকে গিয়ে একদম শনিবার রাতের ডিউটি সেরে সে বাড়ি ফিরবে।
”সোমবার বিকেল চারটেয়, তাই তো?” এই নিয়ে নারান শনিবার অন্তত চারবার জিজ্ঞেস করল, অনাদি আর টোলুবাবুকে।
”হ্যাঁ, বাবা হ্যাঁ, চারটেয় মোহনবাগান মাঠে। মাঠটা চিনিস তো?” টোলুবাবু পিটপিট করে তাকালেন।
”তা চিনি, একবার ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখতে গেছলাম। দু’জনের একই মাঠ তো?”
”হুঁ।” টোলুবাবু বিরক্ত ভক্তিতে বললেন, ”জ্যাটোপেক মোহনবাগান মাঠে দৌড়বে।”
সোমবার সকালে কাগজ বিলি করে নারান, অন্যদিনের থেকে আজ বেশি ব্যস্ত হয়ে বাড়ির পথ ধরেছে। ধান্যকুড়িয়া থেকে যখন মাইল চারেক দূরে তখন একটা গোরুর গাড়িতে পাশ কাটিয়ে এগোতে গিয়ে সাইকেলের চাকা গর্তে পড়ে গেল। সাইকেলটা টালমাটাল হয়ে গোরুর গাড়িতে ধাক্কা মারল, আর নারান ছিটকে রাস্তার ধারে পড়ল। চটপট সে উঠে দাঁড়াল আর শিউরে উঠে দেখল, সাইকেলের পিছনের চাকার উপর গোরুর গাড়ির চাকা উঠে গেছে।
নারান চোখ বুজল। একটা চল্লিশের ট্রেন ধরে শেয়ালদায়, তারপর মোহনবাগান মাঠে যাওয়া। এটাই সে ঠিক করে রেখেছে। সব ভেস্তে গেল! এই দুর্ঘটনার জন্য গোরুর গাড়ির কোনও দোষ নেই। গর্তটা গাড়োয়ান তৈরি করে রাখেনি যে ঝগড়া করবে।
”সাইকেলের চাকার যা অবস্থা, তাতে তো আর চালাতে পারবেন না! যাবেন কোথায়?” মাঝবয়সী গাড়োয়ান সহানুভূতি ভরে জানতে চাইল।
”ধান্যকুড়িয়া…তুমি যাবে কোথায়?”
”জবরগঞ্জ। ধান্যকুড়িয়া পথেই পড়বে, উঠে পড়েন।”
সাইকেলের চাকা আর মাডগার্ড দুমড়ে গেছে। কয়েকটা স্পোক ভেঙেছে। সেটাকে গোরুর গাড়িতে চাপিয়ে দিয়ে নারানও উঠে বসল। গাড়িতে আটটা চালের বস্তা।
”আমার কিন্তু কোনও দোষ নেই। আপনিই পড়লেন চাকার সামনে।”
”আরে আমি কি বলছি তুমি দোষী? বরাতে ছিল তাই ঘটে গেল। ….একটু জোরে চালাও, ট্রেন ধরতে হবে।”
রুগণ দুটো বলদ, পাচনের বাড়ি খেয়ে আর গাড়োয়ানের গালি শুনে দৌড়বার চেষ্টা করল। আধমাইল দৌড় দিয়েই হাঁফিয়ে আবার মন্থর হয়ে গেল, গাড়োয়ান আবার নির্দয়ভাবে পাচনটা দিয়ে এমন পেটাতে শুরু করল যে দেখে নারানের মায়া হল।
”থাক আর মেরো না। তুমি হরিহর ভটচাযের বইয়ের দোকান চেনো?”
”না।”
”যাকে বলবে দেখিয়ে দেবে। সেখানে এই সাইকেলটা নামিয়ে দিয়ে। বোলো নারান হালদার এটা পাঠিয়ে দিয়েছে, আজই যেন সরিয়ে রাখা হয়। কী করে এমনটা হল সেটা তুমিই বলে দিয়ো…গাড়ি এভাবে চললে ট্রেনটা পাব না। আমি এই মাঠের মধ্য দিয়ে হিজলতলা হয়ে শটকাটে স্টেশনে যাব।”
চলন্ত গোরুর গাড়ি থেকে নারান লাফ দিয়ে রাস্তায়, তারপর রাস্তা থেকে মাঠে নামল।
”যা বললাম পারবে তো?” ছুটতে শুরু করে নারান চেঁচিয়ে বলল, ”হরিহর ভটচাযের দোকান…সারিয়ে রাখতে বলো…আমার নাম নারান।”
এর পরই তার মনপ্রাণ নিবদ্ধ হল একটা চল্লিশের ট্রেনে। এখন ক’টা বাজে? ঠিক সময়ে স্টেশনে সে পৌঁছতে পারবে তো! একটা, না পৌনে একটা? এখান থেকে কতক্ষণ লাগবে স্টেশনে পৌঁছতে? সময় সম্পর্কে কোনও ধারণা করতে না পেরে নারান, নিরাপদ হবার জন্য সেরা পন্থাটিই বেছে নিল। সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করল।
মসৃণ ঘাসের ট্র্যাকে জ্যাটোপেকের পাঁচ হাজার মিটার দৌড় দেখার জন্য নারান আলের উপর দিয়ে, চষা জমি মাড়িয়ে, ভাঙাচোরা রাস্তায় ঠোক্কর খেয়ে প্রায় হাজার মিটার পথ অতিক্রম করে যখন স্টেশনে পৌঁছল শেয়ালদা লোকালের গার্ড তখন হুইসল বাজিয়ে সবুজ পতাকা নাড়ছে।
ট্রেনে উঠে নারান বিজয়ীর মতো হাসল বেঞ্চে বসে থাকা একটি বাচ্চচা ছেলের দিকে তাকিয়ে। ছেলেটিও হাসল কিছু না বুঝেই। পাশের লোকের হাতে ঘড়ি দেখে নারান জানতে চাইল, ”ক’টা বাজে?”
”পৌনে দুটো।”
”ট্রেন পাঁচ মিনিট লেট!”
মনে মনে সে হিসেব করতে শুরু করল, তিনটে পনেরোয় যদি শেয়ালদা পৌঁছয় তা হলে ট্রামে উঠে ধর্মতলা যেতে দশ মিনিট। আচ্ছা ধরা যাক, বারো মিনিট। তা হলে তিনটে সাতাশ…ধরা যাক, সাড়ে তিনটে! ওখান থেকে হেঁটে মাঠে পৌঁছতে পনেরো মিনিট…ধরা যাক বিশ মিনিটই। তা হলেও হাতে থাকবে দশ মিনিট।
নিশ্চিন্ত হয়ে নারান পিছনের কাঠের দেয়ালে হেলান দিল। এতক্ষণ যে উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠা তাকে টানটান করে রেখেছিল সেটা ঝপ করে আলগা হয়ে গেল। সে ক্লান্ত বোধ করতে লাগল। এইবার সে বুঝতে পারল তার খিদে পেয়েছে। পেটটা কেমন যেন গুলিয়ে উঠছে, আর সেই সঙ্গে বমির ইচ্ছে গলার দিকে উঠে আসছে।
সে ঢোঁক গিলল। গলা শুকিয়ে কাঠ। ঠোঁট চাটল। একদম শুকনো। জলতেষ্টা পাচ্ছে। কিন্তু ট্রেনে জল কোথায়? লোকাল ট্রেনে এসব থাকে না। কারও কাছে কি একটু জল পাওয়া যাবে? সে এধার—ওধার তাকাল। দূরপাল্লার ট্রেনে যাত্রীরা জল নিয়ে ওঠে, লোকালে কে জল বয়ে নিয়ে যাবে!
এখন তার মনে হচ্ছে, বোধ হয় সে মরে যাবে। চোখের উপর ভেসে উঠল মোহনবাগান মাঠ। গ্যালারি উপচে পড়া ভিড়। ”জ্যাটোপেক….জ্যাটোপেক…জ্যাটোপেক” চিৎকার গ্যালারি থেকে গড়িয়ে নামছে। আর জ্যাটোপেক দৌড়ে চলেছে, হাত তুলে মাঝে মাঝে দর্শকদের উদ্দেশে নাড়ছে। …মরে গেলে সে আর ওকে দেখতে পাবে না।
