”নয়ন সাঁতরাদের পুকুর থেকে ধরেছে।” মহামায়ার স্বরে চাপা গর্ব।
”নয়ন! ওইটুকু মেয়ে ধরতে পারল?”
”ওইটুকু কী? এই শ্রাবণেই তো সাত পেরোল। টিউকল থেকে কত কলসি জল আনে জানো? উঠোনের ওদিকে জঙ্গলটা তো ওই পরিষ্কার করেছে।”
শুনে ভাল লাগল নারনের। মেয়েটা কাজের হয়েছে। নামতাটা চটপট মুখস্থ করতে পারে। হাতের লেখাটা খুব পরিষ্কার নয়, তবে হয়ে যাবে।
”গরমেন নাকি রেশন দোকান পনেরো টাকা মণে চাল দেবে?” মহামায়া জিজ্ঞেস করল।
”অফিসের তাই তো শুনলাম, কিন্তু এই গ্রামে রেশন দোকান কোথায় যে চাল দেবে?”
”দোকান হলে বাঁচা যায়, চালের যা দাম বাড়ছে দিন দিন।”
”বাড়বে, আরও বাড়বে। লোক বাড়ছে আর চালের দাম বাড়বে না?” শেয়ালদা স্টেশনের অবস্থাটা যদি দেখতে। রোজ রিফিউজি আসছে। প্ল্যাটফর্মে, স্টেশনের ভিতরে, বাইরে আর হাঁটা যায় না। কী দুর্গন্ধ! দু’হাজার, আড়াই হাজার লোক। আমরা তো সেই তুলনায় স্বর্গে বাস করছি।”
খাওয়ার পর সে চাটাইয়ে শরীর এলিয়ে দিল। তারপরই কথাটা হঠাৎ মনে পড়ায় মুখটা পাশে ফিরিয়ে বলল, ”তোমায় সেদিন লোকটার কথা যে বললাম না, সেই জ্যাটোপেক গো!”
মহামায়া খেতে বসছে। ভাতের গ্রাস মুখে ঢুকিয়ে বলল, ”হুঁ, ওর বউ বর্শা ছোড়ে।”
”জ্যাটোপেক ম্যারাথনেও জিতেছে।” নারান কনুইয়ে ভর রেখে শরীরটা তুলল।
”অ।…গরম জলে পা ধোবে কখন, বেরোবার আগে? ….জিতেছে তো কী হয়েছে…রাতে খাবার ওষুধটা রুটির সঙ্গেই রেখে দোব না পকেটে আলাদা নেবে?”
জবাব না দিয়ে নারান শুয়ে পড়ল। চোখ বুজে অপেক্ষা করতে লাগল অ্যালার্ম কখন বাজবে।
।। ৩।।
নারানের দিন কাটাতে লাগল একই ভাবে। অফিসে নাইট ডিউটি দিয়েই চলেছে। সকালেও কাগজ বিলি করে বাড়ি ফেরে আঠাশ মাইল সাইকেল চালিয়ে। এই কাজে তার ছুটি নেই। হরিহর ভট্টাচার্য তার মাইনে তিরিশ টাকা থেকে পরের বছরই ষাট টাকা করে দিয়েছে। দুটো গোরু মরে গেছে। সে আর নতুন গোরু কেনেনি। দুধের ব্যবসা আর করবে না, এতে লোকসানই হচ্ছে। নতুন একটা ঘর তোলার জন্য মাটি কোপানো হচ্ছে। আর তাদের একটি ছেলে হয়েছে। এখন তার বয়স তিন। নাম রেখেছে অবনী। মহামায়া আবার সন্তানসম্ভবা।
টোলুবাবুকে নারান বলেছিল, ‘সামনের বছর মোহনবাগান লিগ পাবে।’ কিন্তু পায়নি। তিপান্ন সালে লিগ পরিত্যক্ত হয়। তারপরের বছর লিগ—গোল্ড জিতে মোহনবাগান প্রথম ‘ডাবল’ লাভ করে। নারান গভীর শান্তি পেয়েছিল।
হেলসিঙ্কি ওলিম্পিকসের পর ইতিমধ্যে প্রায় চার বছর কেটে গেছে। ১৯৫৬, জানুয়ারি মাঝামাঝি, খেলার বিভাগে রবিবাবু, মাণ্টাবাবুর মধ্যে কথা হচ্ছিল। হঠাৎ তার কানে এল জ্যাটাপেক নামটা। টেলিপ্রিন্টার রোল থেকে ছিঁড়ে রাখা খেলার খবরগুলো চিফ সাব—এডিটরের টেবলে আলাদা একটা স্পাইকে গাঁথা থাকে। স্পাইক থেকে কপিগুলো তুলে নিয়ে সে খেলার টেবলে এনে রাখল।
”অ্যালেনবরা কোর্সে দৌড়বে কি না বলতে পারব না, তবে মোহনবাগান স্পোর্টসে যে নামবে, এটা পাক্কা।”
”মান্টা খোঁজ নাও তা হলে! আর কোথাও দৌড়বে কি না, সেটা তো পাবলিককে জানানো উচিত! খবরের জন্য একটু হাঁটাহাটি করো।”
নারান আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, ”রবিবাবু, কে দৌড়বে?”
”জ্যাটোপেক। …এমিল জ্যাটোপেক। সেই যে হেলসিঙ্কি ওলিম্পিকে।…”
”তা জানি, কিন্তু কলকাতায়?” নারান অবিশ্বাসীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
”হ্যাঁ কলকাতায়,” মাণ্টাবাবু গম্ভীর হয়ে গেলেন। ”কেন কলকাতা কি দৌড়বার মতো একটা জায়গা নয়?”
”তা নয়, তবে কিনা অতবড় একটা মানুষ,…কার সঙ্গে দৌড়বে?”
”হাতি, ঘোড়া, উটের সঙ্গে…আবার কার সঙ্গে!” বিরক্ত মাণ্টাবাবু কপি টেনে নিলেন। হাঁটাহাটি করতে বলায় উনি চটেছে।
”হেলথ মিনিস্টার রাজকুমারী অমৃত কাউর খেলাধুলোর উন্নতির জন্য যে স্কিম করেছেন, তাতে পৃথিবীর নামী নামী অ্যাথলিটদের আনা হবে। ভারতের নানান জায়গায় গিয়ে তারা, দৌড় দেখাবে, বক্তৃতা দেবে, ট্রেনিং দেবে। জাটোপেক এসেছে সেইজন্যই। ওর বউও এসেছে।” রবিবাবু অল্পকথায় নারানকে বুঝিয়ে দিলেন।
”আমি ওকে দেখব।” তার মুখ থেকে প্রথমেই এই কথাটা বেরিয়ে এল। তারপর বলল, ”কবে, কোথায় দৌড়বে আমাকে একদিন আগে বলে দেবেন? আমাকে বাড়ি থেকে আসতে হবে তো, সেইমতো ট্রেনে উঠব। আমাদের সিঙ্গেল লাইন, ট্রেন বড় লেট করে। কখন দৌড়বে জানা থাকলে সুবিধে হয়।”
”বলে দেব। তা ছাড়া কাগজেও তো খবর থাকবে।”
শনিবার ২১ জানুয়ারি সারা পশ্চিম বাংলায় হরতাল ডাকা হয়েছে। ভাষার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্গঠনের দাবি উঠেছে। কেন্দ্রীয় সরকার সেই দাবি মানছে না। তাই ভোর ছ’টা থেকে বিকলে চারটে পর্যন্ত হরতাল। নারানের ভয় হল। ওইদিনই তো জব্বলপুর থেকে ট্রেনে জ্যাটোপেকদের কলকাতায় আসার কথা!
”অনাদিবাবু, ট্রেন তো বন্ধ থাকবে, তা হলে ওরা তো পথেই আটকে থাকবে!”
”শনিবার সেইজন্যই ওরা কলকাতায় আসছে না, রবিবার আসবে। এই তো মাণ্টাদা খবর লিখে রেখে গেছেন। কপিটা প্রেসে দিয়ে এসো।”
প্রেসে দিতে যাবার সময় নারান সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে লেখাটা পড়ে নিল। মোহনবাগান স্পোর্টসের খবরের মাঝখানে রয়েছে : আগামী ২৩ জানুয়ারি দ্বিতীয় ও শেষ দিবসে বিশ্ববিখ্যাত দূরপাল্লার দৌড়বীর এমিল জ্যাটোপেক ও মহিলা স্পোর্টসে ডানা জ্যাটোপেক অংশ গ্রহণ করিবেন।
