কম্পাউন্ডার বলল, ”আপনি পাশের ঘরে আসুন।”
মিনিট—কুড়ি পর ডাক্তারের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এল ওরা। নারান গোড়ালি তুলে হাঁটছে। ইঞ্জেকশন কেনার টাকা আর কম্পাউন্ডারের ফি টোলুবাবুই দিয়েছেন, তাই সে কৃতজ্ঞতার ভারে বিব্রত।
”ওভাবে হাঁটছিস কেন, পায়ের পাতা ফেলে হাঁট।”
”একটু লাগছে…ব্যান্ডেজটাও নোংরা হবে না।”
”দাঁড়া এখানে।”
টোলুবাবু ওষুধের দোকানটায় ঢুকে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন হাতে ওষুধ, ব্যান্ডেজ আর তুলো নিয়ে।
”ধর এগুলো। ডাক্তারবাবু যেভাবে খেতে, লাগাতে বলে দিলেন, ঠিক ঠিক সেগুলো করবি।”
নারান শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
”দাঁড়িয়ে রইলি কেন, ট্রেন ধরবি তো?”
ওরা আবার হাঁটতে শুরু করল। বউবাজার স্ট্রিট যেখানে শেয়ালদায় পড়েছে সেখানে পৌঁছে টোলুবাবু বললেন, ”বাঁ দিকে চল, দরকার আছে।”
কোলেবাজারের পরই একটা জুতোর দোকান। নারানকে ইশারায় দোকানে ঢুকতে বলে টোলুবাবু ভিতরে ঢুকে গেলেন।
”কেডস দিন তো, আমার নয় ওর পায়ের।”
নতুন সাদা কেডস পায়ে নারান যখন দোকান থেকে বেরিয়ে এল তখন তার আর গুছিয়ে কথা বলার মতো অবস্থা নয়। টোলুবাবুর দুটো হাত ধরে সে কী বলবে ভেবে না পেয়ে বলে ফেলল, ”আমি মন থেকে বলছি মোহনবাগান সামনের বছর লিগ পাবে, আপনি দেখবেন আমার কথা মিথ্যে হবে না।”
”আরে পাগল ছাড় ওসব কথা, এখন পায়ের কথা ভাব। এই দুটো পায়ের ওপর ভর দিয়ে তুই দাঁড়িয়ে তোর সংসার, বউ—মেয়ে দাঁঢ়িয়ে। এখন কি লিগ—শিল্ডের মতো সামান্য ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানো যায়? …তুই এত পরিশ্রমী, তোকে দেখেও যে আনন্দ হয়! …এখন আমি লিগ জেতার মতোই সুখ পাচ্ছি রে। এবার যা, টুক টুক করে হেঁটে স্টেশনে চলে যা।”
বিভ্রান্ত নারানকে দাঁড় করিয়ে রেখে টোলুবাবু চলে গেলেন। ট্রেনে কয়েকবার সে ভাবল, পরিশ্রম কী এমন জিনিস যে দেখে আনন্দ হয়? তার মাথায় ব্যাপারটা পরিষ্কার হচ্ছে না। তবে মহামায়াকে সে সবসময় সংসারের কাজ করতে দেখে, দেখে কেমন যেন এক ধরনের তৃপ্তি সে পায়। টোলুবাবু কি এটার কথাই বললেন? নিজেকে অপচয় না করে ব্যবহার করা এটা তো একটা গুণই! সবারই ইচ্ছে হয় নিজের গুণপনা দেখাতে। নারানের মনে হল, সে যা করে সেটা লোককে দেখাবার মতো কিছু নয়। এমন কিছু একটা করা দরকার যা দেখে সবাই বলবে—হ্যাঁ নারান হালদার একটা লোক বটে!
কিন্তু তার মতো গরিব মানুষ কী আর দেখাতে পারে? নারান নিজেকে প্রশ্নটা করে কোনও উত্তর পেল না।
পরদিন সকালে সে ধান্যকুড়িয়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া কাগজের বান্ডিলটা নিল। কৌতূহল ভরে খেলার পাতাটা খুলে তিন কলাম হেডিংয়ের দিকে তাকিয়েই তার হৃৎপিণ্ড মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে গেল।
এমিল জ্যাটোপেকের ওলিম্পিক ইতিহাস নতুন অধ্যায় রচনা ৫০০০ মিটার, ১০,০০০ মিটার ও ম্যারাথন দৌড়ে বিজয়ীর সম্মান লাভ।
তার হাতের কাগজটা থরথর কেঁপে উঠল। গোগ্রাসে খবরের বাকিটা তার চোখ গিলতে শুরু করল। একবার, দুবার, তিনবার সে পড়ল। তারপর সে কাগজের বান্ডিল নিয়ে হরিহর ভট্টাচার্যের দোকানের দিকে ব্যস্ত পায়ে এগোল। পায়ের ব্যথাটা এখন সে একদম টেরই পাচ্ছে না।
ম্যারাথন যে ছাব্বিশ মাইল তিনশো পঁচিশ গজ এটা সে জানে। মাণ্টাবাবুই তাকে বলেছিলেন। সে রোজ সাইকেল চালায় আটাশ মাইল। থেমে থেমে, কিন্তু নাইট ডিউটি দিয়ে রাত জাগার পর, খালি পেটে। তা হলেও, নারানের মনে হল, কষ্টটা যে কী ধরনের সেটা সে বোঝে, তবে দুজনের পরিশ্রমের মধ্যে তুলনা করাটা ঠিক হবে না।
বত্রিশটা দেশের ছেষট্টি জন দৌড়েছে। সোজা কথা! এতগুলো লোকের সঙ্গে লড়ে প্রথম হওয়ার জন্য জ্যাটোপেকের একটা লক্ষ্য ছিল। তার কী লক্ষ্য? সাইকেলে প্যাডেল করতে করতে নারান দু—তিনবার ভাবল—বড় কোনও লক্ষ্য নিয়ে কি সে সাইকেলটা চালাচ্ছে? কাগজ বিলি করাটাকে বড় ধরনের একটা লক্ষ্য হিসাবে কি ধরা যায়?
সাত দিনের মধ্যে তিনটে দূরপাল্লার কম্পিটিশন জেতা, তিনটেতেই ওলিম্পিক রেকর্ড করে! নারানের মনে হল, লোকটা অসুর। একাজ করাটা কোনও দেবতার কর্ম নয়। ভবিষ্যতে আর কেউ সাত দিনের মধ্যে এই তিনটে সোনা জিততে যে পারবে না, নারান এটা সম্পর্কে নিশ্চিত। মানুষের শরীরের ক্ষমতার সীমা যে কত দূর পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, তার তো কোনও ঠিক—ঠিকানাই আর রইল না! তবুও তার মনে হচ্ছে, জ্যাটোপেক যে সীমায় নিজেকে টেনে নিয়ে গেছে, সেটাই বোধ হয় শেষ সীমা। লোকটা ম্যারাথন দৌড়ল কিনা এই প্রথমবার! কেউ বিশ্বাস করবে? নারান অবাক থেকেই রঘুরামপুর, তুবুড়িয়া হয়ে ঝাউডাঙায় পৌঁছল।
ছেলেটা প্রতিদিনের মতোই রাস্তায় অপেক্ষা করছে।
”কে জ্যাটোপেক বলেছিলে না? …রোজই তো কত রেকর্ড হচ্ছে? …দ্যাখো, পড়ো!”
ছেলেটির হাতে কাগজটা দিয়ে নারান দাঁড়িয়ে রইল। লক্ষ করতে লাগল ওর মুখভাব। মনে কোনওরকম দাগ কাটছে কি না সে বুঝতে পারছে না।
”এসব রেকর্ড ভেঙে যাবে।” ছেলেটি সাদামাটা স্বরে বলল।
”ভাঙবেই তো। ভাঙার জন্যই তো রেকর্ড! কিন্তু সাত দিনের মধ্যে এই রকম তিনটে কম্পিটিশন জেতা?…এ রেকর্ড কি ভাঙতে পারবে কেউ?”
ছেলেটির উত্তর শোনার জন্য সে আর অপেক্ষা করল না। বাড়িতে ফিরে প্রতিদিনের কাজ, ঘাস কাটা, গোরুদের খেতে দেওয়া ইত্যাদি সেরে সে ভাত খেতে বসল। ল্যাঠা মাছের ঝোল পাতে পড়তেই সে অবাক হয়ে মহামায়ার দিকে তাকাল।
