নারান প্রশ্ন করেনি। অফিসে খেলার বিভাগে থমথমে ভাব। মাণ্টাবাবু একমনে ম্যাচ লিখে যাচ্ছেন। রবিবাবু ওলিম্পিক নিয়ে ব্যস্ত। অনাদি অভিধান আর কপির মধ্যে অবিরত যাতায়াত করছে। রাত ন’টায় এলেন টোলুবাবু। এসেই বললেন, ”মাণ্টা, এটা লিখেছ কি সিজনে এটা সিক্সথ ডিফিট, লাস্ট সাতটা খেলায় একটাও গোল করতে পারেনি।”
”লিখব?”
”অবশ্যই। আর এটাও লিখো, সামনের বছর সেকেন্ড ডিভিশনে খেলতে হবে।”
রবিবাবু মুখ তুলে বললেন, ”টোলু তোমার ব্লাড প্রেসার আছে, একটু ঠাণ্ডা হও।”
”আমি মোটেই গরম হইনি। থার্মোমিটার থাকলে দেখিয়ে দিতাম, টোলু কখনও উত্তেজিত হয় না…নারান জল।”
নারান দ্রুত জল এনে দিল। এক চুমুকে শেষ করে টোলুবাবু বললেন, ”রবিদা যদি সন্দেশ খাওয়ান তাও খেয়ে নেব।”
”নারান, যা তো…” পকেটে হাত ঢোকালেন রবিবাবু।
”আমায় ভয় দেখাচ্ছেন?” টোলুবাবু বেপরোয়া ভাব দেখালেন। ”আমি সাংবাদিক…নিরপেক্ষ। আমার কোনও পক্ষপাতিত্ব নেই। অ্যাই নারান, আমি সন্দেশ আনাব। আমি সবাইকে খাওয়াব…ইস্টবেঙ্গল জিতেছে, লিগ চ্যাম্পিয়ান হয়েই গেছে ধরে নাও।”
”টোলু, আমার পেটটা আজ সুবিধের নয়।” মাণ্টাবাবু বললেন। ”আমি উপোস দিয়েছি।”
”আমি তো মিষ্টি খাই—ই না।” রবিবাবু বললেন।
অনাদি আমতা আমতা করে বলল, ”টোলুদা, মাঠ থেকে ফেরার সময় আমার শ্যালক এগারোটা রাজভোগ খাইয়েছে, আমি আর…।” ঢোঁক গিলে কথা শেষ করল, ”খেলে বমি করে ফেলব।”
”নারান তুই?…নিশ্চয় তোরও পেট খারাপ।”
”আজ্ঞে,” মাথা চুলকে নারান বলল, ”আমারই তো খাওয়াবার কথা…তাই, আমি আর কোন মুখে খাব বলুন?”
টোলুবাবু গুম হয়ে বসে রইলেন। কিছুক্ষণ পর রবিবাবু বললেন, ”টোলু, আজ আর তুমি কোনও কপি ধরো না। ভুলটুল হয়ে যেতে পারে।”
শোনামাত্র টেবলের উপর হামলে পড়ে, মাণ্টাবাবুর সামনে রাখা কপিগুলো টেনে আনতে আনতে টোলুবাবু বললেন, ”অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি যান…দয়া করে।”
”যাচ্ছি। কাল ম্যারাথন, আমার অফ ডে…জ্যাটোপেক নামবে। যদি জেতে তা হলে একটা হিস্টরিকাল অ্যাচিভমেন্ট হবে। …মোহনবাগানের টানা সাতটা ম্যাচে গোল না করতে পারার মতোই। একটু ভাল করে লিখো।” কথাগুলো মাণ্টাবাবু বলে আর উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করলেন না।
মাঝ রাতে টোলুবাবু যখন প্রেস থেকে উঠে এলেন তখন নারান জিজ্ঞেস করল, ”রবিবাবুর দেওয়া টিকিটটা ছিঁড়ে ফেলে কিছুই তো হল না।”
”কে বলল হল না? মাঠে একটা লোক তো কম হল! হাজার পনেরোর বেশি আজ লোক হয়নি।…এ কী তোর পায়ে ছেঁড়া ন্যাকড়া বাঁধা কেন?”
‘পুঁজ বেরোচ্ছে।”
”সেপটিক হয়ে গেছে তা হলে। কাল অবশ্যই ডাক্তার দেখাবি।”
নারানের মুখ শুকিয়ে গেল। ডাক্তার দেখানো মানে তো চারটে টাকা, তারপর ওষুধের দাম। অন্য কেউ হলে নারান বলত, নিশ্চয় কাল দেখাব। কিন্তু টোলুবাবুকে সে যত দূর বুঝেছে তাতে আসল কথা ওঁকে খুলে বলা যায়। তাই সে বলল, ”ডাক্তার দেখাবার পয়সা কোথায় যে দেখাব? একজোড়া চটিও আমার কাছে বিলাসিতা।”
টোলুবাবু কয়েক সেকেন্ড নারানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ধীরে—ধীরে তাঁর চোখ থেকে হতাশা, ক্ষোভ, বিরক্তি সরে গিয়ে ফুটে উঠল মমতা। নরম গলায় বললেন, ”কাল তো তোর ছুটি, তা হলেও বিকেলবেলা চলে আয়। আমি ক্যাম্বেল হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকব। আমার এক বন্ধুর চেম্বার ওর সামনেই।…না না, পয়সা টয়সার কথা তোকে ভাবতে হবে না।”
পরদিন তিনটে পঞ্চাশের ট্রেনে নারান শেয়ালদায় নেমে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাসপাতলের সামনে এসে দেখল টোলুবাবু দাঁড়িয়ে। তাকে দেখেই ঘড়িবাঁধা হাত চোখের সামনে থেকে নামিয়ে একগাল হেসে বললেন, ”এসেছিস! বাঁচালি।”
”কী বাঁচালাম?”
”মনে মনে ধরে নিয়েছিলাম, আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে যদি এসে যাস তা হলে সামনের বছর লিগটা পাব। তুই চার মিনিট আঠাশ সেকেন্ডের মাথায় এসেছিস। চল।”
ডাক্তারের ঘরের বাইরে নেমপ্লেটে ডিগ্রির বহর দেখে নারান একটু অস্বস্তিতে পড়ল। এত বড় ডাক্তারের কাছে সামান্য একটা পেরেক—ফোটা দেখাতে আসা, তার মনে হল যেন একশো কাগজের একটা বান্ডিল নিয়ে যাওয়ার জন্য গোটা বনগাঁ লোকাল ভাড়া নেওয়ার মতোই।
সাত—আটজন রোগী অপেক্ষা করছে। তাকে বসিয়ে রেখে টোলুদা ডাক্তারের ঘরে ঢুকে গেলেন। মিনিট—তিনেক পর বেরিয়ে এসে বললেন, ”আয়।”
ডাক্তার টোলুবাবুর বয়সিই। গৌরবর্ণ, সৌম্যকান্তি, লম্বা চওড়া। কাগজে কিছু লিখছেন, পাশে কম্পাউন্ডার দাঁড়িয়ে।
”হাঁদু, এই হচ্ছে আমার কলিগ নারান হালদার। চট করে ওর গোড়ালিটা একটু দেখে দে।”
ডাক্তার দু—তিনটে প্রশ্ন করলেন, গোড়ালির ক্ষতটা ভ্রূ কুঁচকে কুড়ি—পঁচিশ সেকেন্ড দেখলেন। একটা স্লিপে ঘস ঘস করে লিখে সেটা নারানের হাতে দিয়ে বললেন, ”ইঞ্জেকশনটা আনুন, এক্ষুনি দিতে হবে।” তারপর কম্পাউন্ডারকে বললেন, ”ইঞ্জেকশনটা দিয়ে, ড্রেস করে দাও।”
”সিরিয়াস কিছু কি?” টোলুবাবু উৎকণ্ঠিত স্বরে বললেন। ডাক্তারবাবু উত্তর না দিয়ে তাঁর নাম ছাপা প্যাডে লিখতে শুরু করলেন।
”নাম? বয়স?”
নারান বলল।
”আর একদিন দেরি করলে, ব্যাপারটা সিরিয়াসই হয়ে পড়ত। খাবার জন্য আর লাগাবার জন্য ওষুধ দিচ্ছি।”
টোলুবাবু নারানের হাত থেকে স্লিপটা প্রায় ছোঁ মেরে নিয়ে বললেন, ”আমি কিনে আনছি।”
