”আপনার রসগোল্লা আগে খেয়ে নিন।”
”না না, রবিদার দেওয়া কোনও জিনিস শনিবারের আগে নেওয়া যাবে না। আমার ভাগেরটা তুই খেয়ে নে।…ব্যাপারটা কী জানিস, পয়া—অপয়া বলে একটা কথা আছে। খুব খাঁটি কথা। আমি এটা মানি।…জল দে।”
নারান জলের গ্লাস এনে দিয়ে বলল, ”ইন্ডিয়া দশ গোলে হেরেছে, আপনি সেটা কাল নিজের হাতেই লিখেছেন। অথচ আমায় বললেন, কী যে হবে, যুগোশ্লাভিয়ার সঙ্গে খেলা! রেজাল্টটা জেনেও কিন্তু আপনি না—জানার ভান করলেন।”
”আহ নারান, তোকে কী করে যে বোঝাই। টেন টু ওয়ান,…ওয়ানটা হল আমেদের গোল, তার মানে ইস্টবেঙ্গলের গোল, তোর টিমের লোকের দেওয়া গোল!…আমার কী এমন মাথাব্যথা তোকে ওই খেলার রেজাল্ট জানাবার? দশ গোল একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার, ওলিম্পিক রেকর্ডও হতে পারে। কেন জানি মনে হল, মোহনবাগানও যদি গোল খাওয়ার রেকর্ড শনিবার করে ফেলে! …আর এক গ্লাস দে।”
নারান জল নিয়ে ফিরতেই টোলুবাবু উৎকণ্ঠিত গলায় বললেন, ”পায়ে কী হয়েছে? খোঁড়াচ্ছিস কেন?”
”কাল ছুটতে ছুটতে শেয়ালদা যাবার সময় একটা পেরেক ফুটেছিল। ব্যথা হয়ে এখন টাটাচ্ছে।”
”গরম জলে কম্প্রেস কর আর বোরিক পাউডার লাগা। অবহেলা করিসনি।”
টোলুবাবু শুয়ে পড়লেন। নারান ঘড়ি দেখল। আর দেড় ঘণ্টা পর অফিস থেকে ভ্যান রওনা হবে কাগজ নিয়ে। আটটা রসগোল্লা রয়ে গেছে। হাঁড়ি থেকে তুলে খেতে গিয়ে নয়ন আর মহামায়ার মুখ তার চোখে ভেসে উঠেছিল। নয়ন কোনওদিনই রসগোল্লা খায়নি। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সবাই মিলে খাবে ঠিক করে সে আবার রেখে দেয়।
চোখে মুখে জল দিয়ে হাঁড়ি হাতে যখন সে নেমে এল তখন ভ্যানে কাগজ তোলা হচ্ছে। গোবিন্দবাবু তাকে দেখে বললেন, ”একটু দাঁড়াও, আগে কাগজ তোলা হোক।”
নারান অপেক্ষা করতে লাগল। তার জীবনের চব্বিশ ঘণ্টার একটা পরিচ্ছেদ এইভাবেই শেষ হল। এরমধ্যে সে উদ্বেগ, ভয়, খিদে, ক্লান্তি, যন্ত্রণা, রাগ সবকিছুই আস্বাদন করেছে। কিন্তু কোনওটিই তাকে হতাশ করেনি। দমিয়ে দেয়নি। হাঁসের গায়ে লাগা জলের মতো সবই ঝরে গেছে তার মন থেকে, দেহ থেকে। জোলো দুধের থেকে হাঁস যেমন জলটুকু বাদ দিয়ে দুধটুকুই খায়, সেও তেমনই দুঃখ বাদ দিয়ে সুখের কথাটুকুই মনে রাখে। যাদবের কথা, জ্যাটোপেকের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে এখন তার মনে পড়ছে। জাপানি ইশি তাকে বিস্মিত করেছে। টোলুবাবু, রবিবাবুকে তার আরও ভাল লাগছে।
ভ্যানে চড়ে শেয়ালদার দিকে যেতে যেতে খুব যত্নে কোলের উপর রাখা হাঁড়িটা সে মমতা ভরে আঁকড়ে ধরল।
।। ২।।
”ভারত উপর্যুপরি পঞ্চমবার বিশ্ব হকি চ্যাম্পিয়ান
দীর্ঘ চব্বিশ বছর একাদিক্রমে গৌরব অক্ষুণ্ণ
হল্যান্ড ৬—১ গোলে শোচনীয়ভাবে পরাজিত”
নারান প্রথম পাতায় চার কলাম হেডিংয়ের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। হালকা গর্ব ছুঁয়ে যাচ্ছে মনকে। কাগজ উলটে খেলার পাতায় খুঁজল আর একটা খবর।
”চেকোশ্লাভাকিয়ার জ্যাটোপেক—দম্পতির রেকর্ড প্রতিষ্ঠা”
সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে নারান হাসল। ওরা তার থেকে মাত্র দু’বছরের ছোট কিন্তু একই দিনে তাদের তিনজনের জন্ম! একই দিনে দু’জনের দুটো সোনার মেডেল! কী অদ্ভুত ভাগ্য ওদের।
সাইকেলে উঠেই সে কাতর একটা শব্দ করল। পেরেক ফোটা গোড়ালি পেকে পুঁজ জমেছে। টোলুবাবু সেদিন বলেছিলেন বটে গরম জলের সেঁক দিয়ে বোরিক পাউডার দিতে। কিন্তু বোরিক আর কেনা হয়নি। মহামায়া গরম জল দিয়ে ধুয়ে, টিপে টিপে পুঁজ বার করে গাঁদাপাতার রস লাগিয়ে, শাড়ির পাড় বেঁধে দিয়েছে।
চাপ পড়লেই যন্ত্রণা হচ্ছে, তাই পায়ের পুরো পাতা প্যাডেলে রাখতে পারছে না। ওই ভাবেই সাইকেল চালিয়ে কাগজ বিলি করতে করতে সে ঝাউডাঙার বাদল নস্করের বাড়ি পৌঁছল।
ছেলেটি অপেক্ষা করছে রাস্তায় কাগজের জন্য। সাইকেল থেকে নেমে শেষ কাগজটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে নারান বলল, ”আজ খুব ভাল খবর আছে।”
”জানি, ভারত হকিতে সোনা পেয়েছে। কাল রেডিয়োতেই শুনেছি।”
নারান একটু অপ্রতিভ হয়ে গেল। খবরটা প্রথম তার কাছ থেকে শুনে, ছেলেটির মুখে ফুটে—ওঠা খুশির আলো সে দেখবে ভেবেছিল। কিন্তু সে দমল না। হকি ছাড়া অন্য খবরও তো আছে।
”জ্যাটোপেক আর তার বউ, দু’জনেই সোনা জিতেছে!”
ছেলেটি হকির খবরের মধ্যে ডুবে গেছে। নারানের কথা তার কানে ঢুকল না।
”ভারত হকির সোনার মেডেল জিতবে এটা তো জানা কথাই। কিন্তু স্বামী—স্ত্রীর জেতাটার মতো ঘটনা ক’টা ঘটেছে?”
ছেলেটি মুখ তুলে বলল, ”কে জ্যাটোপেক?”
নারান এবার হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইল। ছেলেটা বলে কী।
”এই তো চার দিন আগেই কাগজে নাম বেরোল, দশ হাজার মিটার রেকর্ড করে আবার ওলিম্পিকের মতোই সোনা জিতেছে! তুমি লক্ষ করোনি?”
”রেকর্ড তো রোজ কতই হচ্ছে, কে মনে করে রাখে।”
ছেলেটি বাড়ির ভিতরে চলে গেল। নারান আবার সাইকেলে উঠল। আবার চোদ্দো মাইল চালিয়ে তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। গোড়ালির এই যন্ত্রণাটা…একজোড়া চটি কিনতেই হবে। তিন—চার টাকার ধাক্কা। নারান ঠিক করল, সামনের মাসে মাইনে পেলেই কিনে নেবে।
শনিবার শেয়ালদা স্টেশনে নেমেই নারান কয়েকটি ছেলের কথা থেকে বুঝে গেল ইস্টবেঙ্গল জিতেছে।
”কয় গোলে?”
”এক…ফকরি…।”
