”মল্লবীর কে ডি যাদবের কৃতিত্ব
ব্যগ্র দৃষ্টিতে সে বিড় বিড় করে পড়ে গেল খবরটা : ”ভারতীয় ব্যান্টমওয়েট মল্লবীর কে ডি যাদব ফ্রিস্টাইল কুস্তি যুদ্ধে তৃতীয় স্থান অধিকার করিয়া বিশ্ব ওলিম্পিকের ব্রোঞ্জ পদক লাভ করিয়াছেন। কে ডি যাদব সর্বপ্রথম ভারতীয় যিনি বিশ্ব অনুষ্ঠানে পুরস্কৃত হইলেন। যাদব শেষ লড়াইতে পরাজিত হইয়াছেন সত্য, কিন্তু সারা সপ্তাহব্যাপী বিভিন্ন রাউন্ডের লড়াইতে তিনি ত্রুটিহীন মল্লযুদ্ধের অবতারণা করায় পদক লাভ করিয়াছেন।—পি টি আই”
”এই নারান, রবিবাবু ডাকছেন তোকে।” সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে অনিল বলে গেল।
রিডিং বিভাগে প্রুফটা দিয়ে সে রবিবাবুর কাছে হাজির হল।
”মোহনবাগান—ইস্টবেঙ্গল চ্যারিটি ম্যাচটা দেখতে যাবি? আমার কাছে একটা টিকিট আছে। আমি তো সব খেলা দেখি না।”
”আমি বিকেলে সময় পাব না।” নারান লক্ষ করল টোলুবাবু আসছেন। ”আপনি বরং টোলুবাবুকে দিতে পরেন।
নারানের কথাটা টোলুবাবুর কানে গেল। তিনি হাত নেড়ে বললেন, ”না না না, টিকিটে আমার দরকার নেই।”
মাণ্টাবাবু ফোড়ন কাটলেন, ”রবিদার দেওয়া টিকিট নিয়ে প্রেসের কম্পোজিটার রতন এবারের প্রথম ম্যাচটা দেখেছিল। মোহনবাগান সেজন্যই এক গোলে হেরেছিল। তাই রবিদা ইস্টবেঙ্গলের পয়া লোক। টোলু ও টিকিট নেবে না।”
”দ্যাখো মণ্টা, তুমি বড্ড বাজে কথা বলো। রবিদা মোহনবাগানের অপয়া, এমন কথা কোনওদিন আমি বলিনি। গত তিন বছর ইস্টবেঙ্গল শিল্ড ঘরে তুলল, দু’বার মোহনবাগানকে হারিয়ে। সে তো, ভাল খেলেছে বলেই! তিনবারই রবিদার কাছ থেকে টিকিট নিয়ে ভাগনেকে দিয়েছিলাম। কিন্তু সেজন্যই যে ইস্টবেঙ্গল জিতেছে…এমন কুসংস্কার আমার নেই। এবার লিগে পাঁচটা ম্যাচে মোহনবাগান এখন পর্যন্ত হেরেছে, তার মধ্যে লাস্ট ছ’টা ম্যাচে তিনটেতে। এই ছ’টা ম্যাচে একটা গোলও করতে পারেনি। ভাবতে পারো মণ্টা?…আরও হারবে, আমি বলছি দেখে নিয়ো ক্যালকাটা গ্যারিসনের কাছেও হারবে, শেষকালে রেলিগেশন ফাইট করতে হবে…তুমি এর পর আর আমাকে বিদ্রূপ কোরো না।”
গলা ধরে এল টোলুবাবুর। ঝপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। চোখ ছল ছল করছে। মাণ্টাবাবু মুচকি হেসে বললেন, ”কপি ধরো টোলুদা, অনেক খবর জমে রয়েছে। এই দ্যাখো, ইন্ডিয়ান ওয়াটারপোলো টিম ষোলো—এক গোলে ইতালির কাছে হেরেছে। ধরো, ধরো।”
”ধরছি। কিন্তু তুমি রবিদা সম্পর্কে আমার যে মিথ্যে ধারণা…রবিদা, রবিদা। দিন আপনার টিকিটটা। আমার যে কুসংস্কার নেই এটা অন্তত প্রমাণ হোক। ওই ভাগনেকেই টিকিটটা দেব।”
রবিবাবু মুখ নামিয়ে কপি লিখছিলেন। মুখ না তুলেই পকেট থেকে টিকিট বার করে এগিয়ে দিলেন। টোলুবাবু সেটা একবার দেখে নিয়ে পকেটে রাখতে রাখতে বললেন, ”টাকাটা কাল দিয়ে দেব।”
”তা দিয়ো। কিন্তু আজ বোধহয় হকি ফাইনালের রেজাল্ট আসবে। টেলিপ্রিণ্টারের দিকে নজর রেখো।…আর হাঁড়ি থেকে দুটো রসগোল্লা তুলে নাও। যদি বেশি থাকে তা হলে তিনটেও খেতে পারো।”
টোলুবাবু নারানের দিকে তাকালেন। নারান বলল, ”কুস্তিতে ভারত মেডেল জেতার জন্য রসগোল্লা খাওয়াচ্ছেন।”
”রবিদা, হকি ফাইনাল আজ নয় তরশু, ওইদিন জ্যাটোপেকেরও পাঁচ হাজার মিটার আছে।” অনাদি অভিধান সরিয়ে রেখে খবরটা দিয়ে বলল, ”নারান রসগোল্লা একস্ট্রা থাকলে বলো।”
ফাইনাল আজ হচ্ছে না শুনে টোলুবাবুর মুখে স্বস্তি ফুটে উঠল। রাত্রে প্যাঁচালো ইংরেজি নিয়ে কুস্তি করার ধকল, আজ আর অন্তত নিতে হবে না।
”নারান, একটা রসগোল্লাও আর অনাদিকে দেবে না।” মাণ্টাবাবু নির্দেশ দিয়ে চেয়ার থেকে উঠে পড়লেন। থাকেন ব্যান্ডেল, ট্রেন ধরতে হবে। ”কালীঘাট—রাজস্থান ম্যাচ লিখতে দশবার অভিধান কেন যে খুলতে হয়, এটা বুঝিয়ে না বললে ওকে আর রসগোল্লা নয়।”
বিব্রত এবং লজ্জিত মুখে অনাদি বলল, ”গ্রাস কাটিং শট—এর বাংলাটা ঠিকমতো করতে পারছিলুম না বলে একটু খুলে দেখছিলুম।”
”তা ওটার মধ্যে ঘাস টাস কিছু পেলে?” রবিবাবু প্রশ্ন করলেন।
”না।”
”তা হলে বইটা মুড়ে রাখো। এটা ইংরেজদের খেলা। তার রিপোর্টে দু—চারটে ইংরিজি থাকলে লোকের বুঝতে অসুবিধে হবে না। গোলপোস্টের কি কোনও বাংলা তুমি করবে? তেমনি ঘাস ছাঁটাই শট লিখলে জিনিসটা হাস্যকর হবে।”
নারান, দাঁড়িয়ে শুনছিল। ভাবল, ঘাস নিড়নো শট বললেই তো হয়! কিন্তু সাহস করে সে বলতে পারল না। এখানকার বাবুরা লেখাপড়া জানা লোক, যদি চটে যান?
”নারান এবার অনাদিবাবুকে রসগোল্লা, যদি একস্ট্রা থাকে তো দাও।” বলতে বলতে মাণ্টাবাবু রওনা দিলেন।
রাত্রে পাতা সাজিয়ে দিয়ে প্রেস থেকে উপরে উঠে এসে টোলুবাবু পাঞ্জাবির পকেটে হাত ঢোকালেন ওষুধের বড়ির জন্য। হাতে উঠে এল চ্যারিটি ম্যাচের টিকিটটা। সেটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে তিনি এক টানে মাঝখান থেকে ছিঁড়ে ফেললেন। তারপর কুচি কুচি করে টেবলের নীচে ছুড়ে ফেলে পিছন দিকে তাকাতেই দেখলেন নারান ব্যাপারটা আবাক চোখে দেখছে।
”ছিঁড়ে ফেলে দিলেন?”
”দিলুম। রবিদার দেওয়া টিকিট নিয়ে মঠে যেই যাক, মোহনবাগান হারবেই। …এবার আর কেউ যেতে পারবে না। সে পথ মেরে দিলুম। তিনটে টাকা গচ্চচা গেল তো বয়ে গেল! তুই যেন বলে দিসনি। জল দে, ওষুধ খাব।”
