নারান ধীরে ধীরে হাঁটতে পারে না। তাই কুড়ি মিনিটেই অফিসে পৌঁছে গেল। দোতলায় উঠে আসতেই বার্তা বিভাগের বেয়ারা অনিল বলল, ”নারান তাড়াতাড়ি যা, ফুরিয়ে গেল বোধ হয়।”
”কী ফুরোবে?”
”রসগোল্লা! ভারত কুস্তিতে একটা ব্রোঞ্জ মেডেল পেয়েছে, রবিবাবু কুড়ি টাকার রসগোল্লা আনিয়ে সারা অফিসকে খাওয়াচ্ছেন। দ্যাখ গিয়ে কিছু আর আছে কি না।”
খেলার বিভাগের টেবলের মাঝে দুটো হাঁড়ি বসানো। রবিবাবু চেয়ারে হেলান দিয়ে। আর বসে আছেন, অনাদিবাবু, মাণ্টাবাবু, শৈলেনবাবু। টোলুবাবুর নাইট ডিউটি, এখনও এসে পৌঁছননি। নারানকে দেখে মাণ্টাবাবু হাঁড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ”দুটো তুলে নে।”
নারান ইতস্তত করে বলল, ”ভারত নাকি কুস্তিতে মেডেল পেয়েছে?”
”পেয়েছে…কম্পোজেও চলে গেছে। প্রথম পাতায় বেরোবে।” মাণ্টাবাবু ঘাড় বেঁকিয়ে কপি অনুবাদ করতে করতে বললেন। ”সিঙ্গল কলাম ছবিও সঙ্গে যাবে।”
নারান তাকাল রবিবাবুর দিকে। টাকে হাত বুলোচ্ছেন, মুখে সাফল্যের চাপা হাসি। যেন ব্রোঞ্জটা উনিই জিতেছেন।
”কী বলেছিলুম রে নারান? গরিব দেশের এটাই হল আসল খেলা! ফুটবল, ক্রিকেট তো কত ঝুড়ি ঝুড়ি সম্মান এনে গর্বে বুক ফুলিয়ে দিচ্ছে, আর দ্যাখ গরিবের খেলাই কিনা শেষ পর্যন্ত মেডেল এনে দিল।”
”সোনারটা যদি হত।”
”রাখ তোর সোনা। মেডেল ইজ মেডেল। যাদব এখন পৃথিবীতে তিন নম্বর লোক। পৃথিবীর জনসংখ্যা কত জানিস?”
”না। কত এখন?”
রবিবাবু অপ্রতিভ হয়ে মাণ্টাবাবুর দিকে তাকালেন, ”মাণ্টা, এখন কত?”
মাণ্টাবাবু মাথা নাড়লেন। আঙুল দিয়ে অনাদিবাবুকে দেখালেন।
”অনাদি, পৃথিবীর জনসংখ্যা কত এখন?”
অনাদি মাস দুয়েক আগে চাকরিতে যোগ দিয়েছে। ইংরেজি থেকে বাংলা অভিধান খুলে গাল চুলকোচ্ছিল। প্রশ্ন শুনে বলল, ”পৃথিবীর জনসংখ্যা?…এখন?…তা ধরুন গিয়ে, আড়াইশো কোটির একটু বেশিই হবে।”
”বোঝ তা হলে? যাদবের পজিশানটা কী!”
”রবিদা, আড়াইশো কোটির মধ্যে মেয়েরা আছে, বাচ্চচারা আছে, ওরা কুস্তি করে না, ওদের বাদ দেওয়া উচিত।” মাণ্টাবাবু কপিতে হেডিংয়ের পাশে কত কলমে আর কত পয়েন্টের টাইপে হবে সেটা লিখে পেপারওয়েট চাপা দিয়ে টেবলে রাখলেন। তা ছাড়া যাদব ব্যান্টমওয়েট, মানে একশো সাড়ে পঁচিশ পাউন্ডের ক্যাটাগরিতে লড়েছে। আপনি শুধু ব্যান্টামদের সংখ্যাটাই ধরে বলুন ওদের মধ্যে তৃতীয়।”
রবিবাবু হঠৎ উত্তেজিত হয়ে টেবলে কিল মেরে বলে উঠলেন, ”এই তোমাদের এক দোষ। কলোনিয়াল শ্লেভারির হ্যাংওভারটা এখনও কাটল না। সবসময় নিজেদের ছোট করে দ্যাখে! আড়াইশো কোটিতে তোমার আপত্তি কেন?”
”না না, আপত্তি করব কেন?” মাণ্টাবাবু কুণ্ঠিত স্বরে কাঁচুমাচু মুখে বললেন। ”কোটি কোটি লোক কুস্তি করে, তার মধ্যে লক্ষ লক্ষ ব্যান্টম…”
”থামো, বাজে কথা বলো না। কোটি কোটি লোক কুস্তি করলে পৃথিবীর স্বাস্থ্য অন্যরকম হত। গ্যাসট্রিক, ব্লাডপ্রেসার, হার্টের ব্যামো—ট্যামো বলে কিছু থাকতে না। …নারান দুটো তুলে নে।”
”এখন নয়, রাতে রুটির সঙ্গে খাব।”
হাঁড়িতে এখনও কয়েকটা রসগোল্লা ডুবে আছে রসের নীচে। বেশ বড় সাইজই, বোধ হয় দু’আনাওলা। টোলুবাবুর জন্য রেখে দিতে হবে। দুটো হাঁড়িতেও রয়েছে প্রচুর রস।
”এত রস কী হবে, আমি বাড়ি নিয়ে যাব?” নারান কিন্তু কিন্তু করে বলল রবিবাবুকে।
”নিয়ে যা। চিনির রস, খাবি আর ডায়াবিটিসের খপ্পরে পড়বি। তবে তোর হবে না। যারা খাটাখাটনি করে না, গাড়ি চড়ে বেড়ায় এ রোগ তাদের হয়। বুঝলি নারান, পরিশ্রম করবি। এই দ্যাখ, যাদবের বিভাগে সোনা জিতেছে যে জাপানিটা, শোহাচি ইশি তার নাম। এ জুডো লড়ত,…জুডোকা বলে এদের। যুদ্ধে জাপান হেরে গেল।
আমেরিকানরা দখল করল দেশটা আর বন্ধ করে দিল জুডো। ইশি তখন জুডো ছেড়ে শুরু করল কুস্তি। ভাবতে পারিস, একটা খেলা থেকে আর একটা খেলায় যাওয়া কি সোজা ব্যাপার? কী পরিশ্রম, কী মনের জোর থাকলে তবেই এভাবে বদল করে যাওয়া সম্ভব। আর শুধুই কি যাওয়া!…রাশিয়া, ইরান, টার্কি, হাঙ্গারি, জার্মানি, এইরকম কুড়িটা দেশের কুড়িজন ওয়ালর্ড ক্লাস কম্পিটিটরের মধ্যে একেবারে সোনা জিতে নেবার মতো যাওয়া! যুদ্ধের পর জাপানের এটাই প্রথম ওলিম্পিক সোনা…কী নিষ্ঠা, কী চেষ্টা…কপিতে অবশ্য আমি এসবও জুড়ে দিয়েছি।”
”তা হলে যাদবের থার্ড হওয়াটাও খুব বড় ব্যাপার!” নারান অন্তরের গভীর থেকে বলল। শিবপোতার জীবন থেকে ধান্যকুড়িয়ার জীবনে আসার মতোই তার মনে হল, ইশির জুডো থেকে কুস্তিতে আসাটা। এক জমি থেকে গাছ তুলে অন্য ধরনের জমিতে পুঁতে ফল ধরানোর জন্য গাছকেও তো কম চেষ্টা করতে হয় না! শরীরে কষ্ট, মনের কষ্ট ইশিকে যে কতটা সইতে হয়েছে মর্মে মর্মে সে তা অনুভব করতে পারছে।
”নারান কপি জমে গেছে, প্রেসে দিয়ে এসো।” ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মাণ্টাবাবু বললেন। ”টোলুদা এখনও এলেন না, এ দিকে এত কপি জমি গেছে! …ও অনাদি, একটু হাত চালাও।”
নারান এসে প্রেসে কপি দিয়ে ফিরে আসার সময় সুপারভাইজার সরল ঘোষ বললেন, ”ওপরে যাচ্ছ তো, রিডিংয়ে এই প্রুফটা দিয়ে দিয়ো। আর বলো তাড়াতাড়ি দেখে যেন প্রেসে পাঠিয়ে দেয়।”
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় নারান প্রুফটা একবার চোখের সামনে ধরেই থমকে গেল।
