”বউ!” মহামারা হাঁ করে তাকিয়ে রইল স্বামীর দিকে। ”বউ বর্শা ছুড়বে কী গো? বয়স কত? লজ্জা করবে না?”
”এতে লজ্জা করার কী আছে? কলকাতাতেও তো কত মেয়ে হাফ প্যান্ট পরে দৌড়চ্ছে! জ্যাটোপেক স্বামী—স্ত্রীর জন্ম একই বছরে, একই দিনে। অদ্ভুত না? আরও অদ্ভুত হল, ওরা আমার থেকে ঠিক দু বছরের ছোট, ঠিক দু বছরের…আমাদের তিনজনেরই জন্ম একই তারিখে, উনিশে সেপ্টেম্বর!”
‘আমাদের তিনজন’ বলে নিজেকে ওঁদের সঙ্গে জড়াতে পেরে নারানের চোখে—মুখে চাপা গর্ব যেন ফুটে উঠল। ঠাট্টার সুরেই সে বলল, ”তোমার জন্ম তারিখটাও যদি উনিশে সেপ্টেম্বর হত!”
”তা হলে কী হত? আমি কি তাহলে বর্শা ছুড়তাম ওই বউটার মতো?”
”যদি এ দেশের না হয়ে ও দেশের বউ হতে, আর দুধ দোয়া, ঘুঁটে দেয়ার কাজ যদি না করতে হত তা হলে হয়তো বর্শা ছুড়তে কি হাইজাম্প, লংজাম্প দিতে!”
”সে আবার কী?”
”দেখবে?” বলেই নারান লুঙ্গিটা গুটিয়ে তুলে মালকোচার মতো কোমরের পিছনে গুঁজে, উঠোনের বাইরে রাস্তার কাছাকাছি চলে গেল। তারপর ছুটে এসে একটা লাফ দিয়ে শূন্যে উঠে প্রায় পনেরো ফুট দূরে উঠোনের উপর জোড় পায়ে নামল।
মাটির উঠোন হলেও জমি সানের মতো শক্ত। নারান কোনওরকমে ‘উইহ’ শব্দটা মুখে চেপে রেখে উঠে দাঁড়াল। পেরেক ফোটার জায়গাটা ঝন ঝন করে উঠেছে তীক্ষ্ন একটা যন্ত্রণায়। কিন্তু সে মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল, ”দেখলে তো? এটা হল লংজাম্প। হনুমান এই লাফ দিয়েই লঙ্কায় গেছল।”
”হাফ প্যান্ট পরে মেয়েমানুষ এইভাবে লাফায়?”
”নিশ্চয়। তুমিও রোজ প্র্যাকটিস করো, পারবে। কত আর বয়স তোমার, পঁচিশ? আর জ্যাটোপেকের বউয়ের বয়স এখন দু মাস কম তিরিশ, তোমার থেকে পাঁচ বছরের বড়! সন্ধের পর, অন্ধকারে তুমি যদি…”
”থামো তো।” মহামায়া ধমক দিয়ে উঠল। ”লোকের সামনে হনুমান হওয়ার জন্য আমি এখন অন্ধকারে লাফ দেওয়া শিখব? ওই সময়টায় ঠোঙা বানালে আমার অনেক লাভ হবে।”
”ঠোঙা?” নারান কৌতূহলী চোখে তাকাল। ”কে ঠোঙা বানাবে?”
”ঘোষেদের বাড়িতে মেয়েরা রাত্তিরে রান্নাবান্না সেরে ঠোঙা বানায়। গোবরডাঙা থেকে পুরনো কাগজ কিনে আনে। একসেরি ঠোঙা বিক্রি করে এক টাকায় পনেরো দিস্তে।”
”দিস্তে মানে কত?”
”বাইশটা।”
নারান মনে মনে অঙ্ক কষে বলল, ”তার মানে এক টাকায় তিনশো তিরিশটা। তা এক টাকার ঠোঙা বানাতে একজনের কত সময় লাগবে জানো? তিনশো তিরিশটা বানাতেই তো সারাদিন লেগে যাবে!”
”তোমার মাথা! কাল রাত্রিরে গিয়ে কিছুক্ষণ তো দেখলাম। কাগজ কেটে, আঠা বানিয়ে, তৈরি হয়ে বসে এক ঘণ্টাতেই একজন প্রায় আট—দশ দিস্তে তৈরি করে ফেলল। হাত চলছিল যেন যন্ত্রের মতো।”
”প্র্যাকটিস করে করে হয়েছে।” নারান অন্যমনস্কের মতো বলল। তার চিন্তা এখন গোড়ালিটা নিয়ে। কম্পাউন্ডার যা বলল তাতে তো এখন তার ভয় ধরে যাচ্ছে। পা ফেললেই খোঁচা লাগার মতো একটা ব্যথা হচ্ছে।
”তা তুমি এবার লাফানোর প্র্যাকটিস করো না! ভালই তো লাফালে। ওই জ্যাটো…কী যেন…পেক না কেক, ওর মতো সোনার মেডেল পেলে তা কোঠাবাড়ি তোলা যাবে।”
কথাগুলো বলেই মহামায়া দুমদুমিয়ে পা ফেলে দুধ দুইতে চলে গেল। ও ফিরে এলে নারান অফিসে যাবে সাড়ে ছ’টার ট্রেন ধরে। মহামায়া যে কথাটা রাগ করে বলে গেল সেটা কিন্তু নারানের মনের কোণে আটক রইল। ”তুমি এবার প্র্যাকটিস করো না!”
দিন—রাত মিলিয়ে মাত্র চার ঘণ্টার জন্য বাড়িতে থাকা। রবিবার তার ছুটির দিন। এই দিনটাতেই সে রাত্রে ঘুমোবার সুযোগ পায়। নয়তো যাতায়াতে ট্রেনেই মোট ঘণ্টা দুই—আড়াই শুধু সে ঘুমোয়।
সাড়ে ছ’টার ট্রেনে, ধান্যকুড়িয়া থেকে উঠেই সে বাঙ্কে শুয়ে পড়ে। শোয়া মাত্রই ঘুম এসে যায়। কিন্তু আজ সে চিত হয়ে শুয়ে জ্যাটোপেকের কথাটা প্রথমে মনে করল। সোনার মেডেল আনার চিন্তা সে কোনওদিনই করবে না। ওসব পনেরো—ষোলো বছর বয়সের ব্যাপার। ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে লাখ টাকার স্বপ্ন দেখার মতো বোকা সে নয়।
বিভূতি মুখুজ্জের কথা—’মূলধনটা সামলে খরচ কোরো’—তাকে খোঁচা দিয়ে যাচ্ছে গোড়ালির ব্যথাটার মতো। কিন্তু বিভূতিবাবু ঠিকই তো বলেছেন, শরীরটাকে সে বেশিই খাটাচ্ছে। তবে সংসার চালানো যে কী শক্ত ব্যাপার, এক আনা রোজগার করতে কতটা রক্ত যে জল করতে হয় এটা কি বিভূতিবাবু বোঝেন? মহামায়া বোঝে, এমনকী আট বছরের নয়নও বুঝতে শিখছে। ওরা দু’জনও যথাসাধ্য খাটে। ওরা তার কষ্টটা অনুভব করে। নারান ভরসা পায় তার সংসারের মানুষদের কথা ভেবে।
ট্রেনের দুলুনিতে ধীরে ধীরে ঘুম নেমে আসে নারানের চোখে। বড় আরাম লাগছে তার। এই ঘণ্টা দেড়েকের ঘুমটুকুই তার বিলাসিতা। সকালে ট্রেনের ঘুমটা ঠিক এমন জুতসই হয় না। ঘুমের মধ্যেও চিন্তা থাকে, স্টেশন ফেলে যেন চলে না যায়। কিন্তু এখন সে চিন্তাটা নেই। শেয়ালদায় পৌঁছেও ঘুমিয়ে থাকলে কেউ না কেউ তাকে তুলে দেবে।
আজও একজন তাকে ঠেলে তুলে দিল। ”আরে মশাই, আর কত ঘুমোবেন, শ্যালদা থেকে ট্রেন যে ছাড়ার সময় হয়ে গেল!”
ধড়মড়িয়ে উঠে নারান দেখল ট্রেন ভরে গেছে যাত্রীতে। ভিড় ঠেলে সে নামল। প্ল্যাটফর্মের ঘড়িতে দেখল, আটটা—কুড়ি। অনেক সময় আছে এখনও। ডিউটি তো ন’টায় শুরু।
