”আসুন। একটু আগেই কোনি বলছিল আপনি একদিন আসবেন। কি আর দেখবেন আমায়!” কমল চট করে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বলল, ‘দেখার আর কিছু নেই। আমি ফিনিশ হয়েই গেছি।”
ক্ষিতিশ তক্তপোশের ধার ঘেঁষে বসল।
”কি হয়েছে, ইনফ্লুয়েঞ্জা?”
মজা পাওয়ার ভঙ্গিতে হেসে কমল মাথা হেলিয়ে বলল, ”হ্যাঁ। আপনি কিন্তু বেশিক্ষণ বসবেন না। ছোঁয়াচে রোগটা।”
”ওষুধ খাচ্ছ?”
কমল প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, ”কোনির দ্বারা কিছু হবে কি? ও আমাকে রোজ বলে কি কি শিখল। খুব রোখা মেয়ে। যদি বলে করব, তাহলে করবেই। ওকে দিয়ে যদি করাতে পারেন, ওর একটা ভবিষ্যৎ যদি গড়ে দিতে পারেন—”
”হবে। প্রথম প্রথম একটু চঞ্চল ছটফটে থাকে, মন বসলে আমার মনে হয় ও কিছু একটা পারবে।”
”একটা ভাইকে চায়ের দোকানের কাজে দিয়েছি, পনেরো টাকা মাইনে। কোনিকে একটা সুতোর কারখানায় লাগিয়ে দেব ভাবছি। কথাবার্তা বলেছি, ষাট টাকা দেবে। কিন্তু ওর সাঁতার তাহলে আর হবে না।”
কোনি ঘরে ঢুকল। ক্ষিতীশকে দেখে অবাকই হল। দাদার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে সে কমলের মাথায় হাত রাখল।
”আমি চাই না কোনি সাঁতার বন্ধ করুক। আমার নিজের খুব ইচ্ছে হতো বড় সাঁতারু হব, অলিম্পিকে যাব। আমার দ্বারা কিছুই হল না, এখন যদি কোনি পারে। আপনি বলছেন, ওর হবে?”
ক্ষিতীশ গম্ভীর স্বরে বলল, ”যদি খাটে, যদি ইচ্ছে থাকে।”
”কি রে, শুনলি তো।” কমল মুখ উঁচু করে তাকাল। ”ইচ্ছে থাকলে মানুষের অসাধ্য কিছু নেই। ইন্ডিয়া রেকর্ড ভাঙ্গতে হবে তোকে। তারপর এশিয়ান, তারপর অলিম্পিক। পারবি না?”
কমলের স্বর অদ্ভুত করুণ একটা আবেদনের মতো শোনাল। কোনির মুখে ধীরে ধীরে অস্বস্তি, তারপর চাপা ভয় ফুটে উঠল। ঘরের মধ্যে তখন কেউ কথা বলছে না। হাঁড়িতে ভাত ফোটার শব্দটা শুধু সেই মুহূর্তে একমাত্র জীবন্ত ব্যাপার।
কমল আবার বলল, ”পারবি না?”
কোনি আস্তে আস্তে মাথা হেলিয়ে দিল।
।। ৮ ।।
ক্ষিতীশ সারা সকাল অ্যাপেলোয় অপেক্ষা করেছে, কোনি আজও আসেনি। গত দু’সপ্তাহে একবেলাও সে কামাই করেনি। ক্ষিতীশ ভয়ে রয়েছে, এই বুঝি কস্ট্যুম দাবী করে বসে। এখনো সে সমানে বলে যাচ্ছে, ”হয়নি হয়নি, ইঞ্চি খানেকের বেশি জল হাত থেকে উঠবে না। … অতটা পাশের দিকে হাত যাচ্ছে কেন—ওকি, দুটো হাত ঠিকমতো সমানে চলছে না কেন?”
বলার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষিতীশ মাথা নাড়ে। আর ভাবে কস্ট্যুম আজই কিনতে হবে দেখছি। কখনো কখনো সে জলে নেমে সাঁতার কেটে স্ট্রোক দেখিয়ে দেয়। ওদের পাশ দিয়েই অন্যরা সাঁতার কেটে যায়, বেলা গড়িয়ে যায়, কমলদিঘির জল জনশূন্য হয়ে আসে। কোনি যখন বিরক্ত হয়ে ওঠে, ক্ষিতীশ বলে, ”দাদার কাছে তো খুব ঘাড় নেড়েছিলিস! ভিকট্রি স্ট্যান্ডে ওঠা খুব সহজ ব্যাপার ভেবেছিস! রেকর্ড করাটা গঙ্গায় আম কুড়োনো নয়, বুঝলি?” ফেরার পথে গল্প করেছে পৃথিবীর বড় বড় সাঁতারুর, তাদের আন্তরিকতার, নিষ্ঠার, পরিশ্রমের।
অপেক্ষা করে অবশেষে ক্ষিতীশ বেরিয়ে পড়ল অ্যাপোলো থেকে। বিষ্টু ধরের বাড়ি পৌঁছল মিনিট দশেকের মধ্যে। তাকে দেখেই বিষ্টু ব্যস্ত হয়ে বলল, ”এই একটু আগে দর্জিপাড়া বয়েজ লাইব্রেরির লোকেরা এসেছিল ওদের অ্যানুয়াল সোশ্যালে চিফ গেস্ট করার জন্য। প্রেসিডেন্ট হবে কে জানেন? ঐ বিনোদ ভড়। আমি রাজী হয়ে গেছি। ওখানে দারুণ একটা ইস্পিচে ওকে ডাউন দিতে হবে। বুঝলেন, ক্ল্যাপ ওকে পেতে দোব না।”
বিষ্টু ধরের উত্তেজিত মুখ দেখে ক্ষিতীশ চটপট মতলব ভেঁজে নিয়ে বলল ”শুধু একটা বক্তৃতায় ডাউন দিয়ে কি লাভ হবে। লোকে কিছুদিন মনে রেখে তো ভুলে যাবে। তার থেকে এমন একটা কিছু দরকার যাতে বিনোদ ভড় রেগুলার ডাউন খায়।”
”কি রকম?” বিষ্টু কৌতূহল দেখাল। ”রেগুলার ডাউন কিভাবে সম্ভব!”
”ভাবতে হয়েছে, তিনদিন ধরে ভেবেছি।” ক্ষিতীশ নিজেকে গুরুত্ব দেবার জন্য গলার স্বর ভারিক্কি করে তুলল । ”ভেবে দেখলুম বিনোদ ভড় যে যে অর্গানাইজেশনে আছে,তার পাল্টাগুলোয় ঢুকতে হবে। ও যদি ড্রামা ক্লাবে থাকে, আপনাকেও একটি হরিসভায় ঘাঁটি করতে হবে। ও যদি কোন সুইমিং ক্লাবের প্রেসিডেন্ট হয়…”
”আছে!” বিষ্টু ধর প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, ”জুপিটারের প্রেসিডেন্ট বিনোদ ভড়।”
ক্ষিতীশ মাথা হেলিয়ে বলল, ”আপনাকে জুপিটারের রাইভল ক্লাবে ঢুকতে হবে।”
”সেটা তো অ্যাপেলো। কিন্তু ঢুকব কি করে?” বিষ্টু ধর বিমর্ষ গলায় বলল। ”পারেন একটা কিছু করে দিতে?”
”চেষ্টা করতে হবে। আজও আমি নকুল মুখুজ্জের সঙ্গে কথা বলেছি। সাত হাজারের কমে রাজী হচ্ছে না।”
”সাত হাজার! মানে?”
”মানে, প্রেসিডেন্ট হতে গেলে ডোনেশান তো দিতে হবে। অমনি অমনি কি আর হওয়া যায়। বিনোদ ভড়ও তলায় তলায় চেষ্টা করছে ওর দাদাকে অ্যাপোলোয় ঢোকাবার জন্য। পাঁচ হাজার পর্যন্ত অফার করেছে।”
”কিন্তু সাত হাজার! কমসম করা যায় না?”
”কতো কমাবেন? পাঁচ হাজার অফার তো পেয়েই গেছে। বিনোদ ভড় এম এল এ, মন্ত্রী হবারও চান্স খুব, ওকে তো সবাই হাতে রাখতে চাইবে। আপনি যদি বেশি টাকা না দেন তাহলে ওদের লাভটা কি হবে বলুন?”
”তা তো বটেই!” বিষ্টু ধর চিন্তিত হয়ে পেটে হাত বুলোতে লাগল।
ক্ষিতীশ কিছুক্ষণ ওকে লক্ষ করে আবার বলল, ”দেরী করলে চলবে না। দু—একদিনের মধ্যেই ঠিক করে ফেলতে হবে। বিনোদের পার্টি উঠে—পড়ে লেগেছে।”
