নারান বাড়ির দিকে রওনা হল। পিছন থেকে চেঁচিয়ে বিভূতি মুখুজ্জে বললেন, ”মূলধনটা সামলে খরচ করো, অসুখ—বিসুখ বলে একটা কথা আছে।”
ঘুরে দাঁড়িয়ে ঝকঝক দাঁত দেখিয়ে নারান বলল, ”অসুখ তো একটাই…ক্যানসার। হলে কিছুই করার নেই। তা ছাড়া আর কোনও অসুখ আমায় কাবু করতে পারবে না।”
অহঙ্কার দেখানো হয়ে গেল নাকি? বাড়ি ফিরতে নারান ভাবল, শরীরটা কি ভগবানের দেওয়া জিনিস, না কি মানুষ নিজেই গড়ে তোলে? নিজের ভাবনার জালে নিজেই আটকে পড়ল সে। চিন্তা—ভাবনা করার মতো লোক সে নয়। তবে বেঁচে থাকার জন্য পরিশ্রম আর নানা ধরনের মানুষের সংস্পর্শে এসে তার মনে মাঝে মাঝে অদ্ভুত সব প্রশ্ন জেগে ওঠে। অন্যদের ধরাবাঁধা গতানুগতিক নজরের মতো নয়, জীবনটাকে একটু আলাদা ভাবেই সে দেখতে পায়। নারান কখনও দিবাস্বপ্ন দেখে না, তবে মাঝে মাঝে মনের মধ্যে কিছু একটা ঝিলিক দেয়।
বাড়ি ফিরে সে ঝুড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ঘাস কাটতে। আট বছরের মেয়ে নয়ন তার সঙ্গ নিল ছাতা হাতে। ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে, উবু হয়ে বসে যখন নারান দক্ষ হাতে দ্রুত কাস্তে, চালায়, নয়ন তখন ছাতা ধরে থাকে তার মাথার উপর। এই কাজ করার জন্য কেউ তাকে বলে দেয়নি। বিঘৎ খানেক লম্বা ঘাস। মুঠোয় ধরে সে কাস্তে চালায় আর ঝুড়িতে ছুড়ে দেয়। উবু হয়ে কাটতে কাটতে এগোয় হাঁসের মতো দুলে দুলে আর নয়ন ঝুড়িটা তার পাশে পাশে এগিয়ে দেয়। একটা—দুটো কথা তাদের মধ্যে হয়। যেমন আজ নারান বলল, ”সাতের ঘরের নামতাটা মুখস্থ হয়েছে?”
নয়ন বলল, ”না। গড় গড় করে পারব না।”
নারান বললে, ”কাল মুখস্থ ধরব। ….প্রথম ভাগ?”
নয়ন বলল, ”দিঘঘইকার ধরেছি।”
পাড়ায় একটা মাত্র টিউবওয়েল। সেটা নারানেরই দূরসম্পর্কের এক দাদা শচীন হালদারের বাড়ির সামনে। শচীন তখন খেয়ে উঠে মুখ ধুচ্ছিল। বালতি হাতে নারান অপেক্ষা করছে। মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে থাকার পর তার মনে হল, শচীন যেন ইচ্ছে করেই অযথা সময় নিয়ে হাত ধুচ্ছে, পা ধুচ্ছে, মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে, কুলকুচি করছে। লোকটির সঙ্গে তার সদ্ভাব নেই। তার মাথা গরম হয়ে উঠল।
”কতক্ষণ লাগে হাত মুখ ধুতে? তাড়াতাড়ি করো।” নারান বিরক্ত স্বরে বলল।
”কেন, অত ধমকে কথা বলছিস কেন? ধুতে যতক্ষণ লাগবে ততক্ষণ ধোব। টিউকল কি তোর একার সম্পত্তি?”
”পাবলিকের সম্পত্তি। তাই বলে লোক দাঁড় করিয়ে রেখে…” নারান বালতিটা কলের তলায় বসিয়ে হ্যান্ডেল করল। ”অনেক মুখ ধোয় হয়েছে। এবার আমায় চান করতে দাও।”
”তুই আমাকে জোর করে সরিয়ে দিলি?” আচমকা শচীন চিৎকার করে উঠল। সামনের বাড়ির দাওয়ায় বেরিয়ে এল এক প্রৌঢ়। জানলায় উঁকি দিয়ে মেয়েদের মুখ। এখানে সব বাড়িই একতলা, খড়ের বা টালির চালের। বাড়ির সঙ্গে মাটির উঠোন। ওর চিৎকারে আরও অনেকে বেরিয়ে এল।
নারান কথা না বাড়িয়ে পাম্প করে বালতিতে জল ভরতে লাগল। শচীনের বাড়ি থেকে তখন বেরিয়ে এল তার সেজো ছেলে ভরত।
”কী ভেবেছ কী, য়্যাঁ? তুমি একাই কল দখল করে চান করবে?” ভরত রুক্ষ ভঙ্গিতে বলল।
বাবু হয়ে বসে নারান বালতি থেকে মগে জল তুলে মাথায় ঢালছিল। বলল, ”যা জানিস না, দেখিসনি, তাই নিয়ে ঝগড়া করতে আসিস না। বাড়ি যা।”
”নারানকাকা, তোমার গা—জোয়ারি কিন্তু…”
”এক চড়ে তোর দাঁতের পাটি ফেলে দেব যদি আর একটাও কথা বলিস। পায়ে পা বাধিয়ে তোর বাপই ঝগড়া শুরু করে বাড়ি যা।”
ভরত আরও কিছু কথা বলল অবশ্য গলা নামিয়ে। নারান তাতে কান না দিয়ে বালতিতে জল ভরে বাড়ি ফিরে এল। উঁচু স্বরে গলার আওয়াজ মহামায়া শুনেছে। তাই সে নারানের কাছে কারণ জানতে চাইল।
”কী আবার হবে, শচীনদার যা স্বভাব। আমায় খোঁচা দেবার চেষ্টা করল। অনেক কষ্টে রাগ সামলেছি।”
মহামায়া এই বিষয়ে আর কথা না বলে নারানকে ভাত বেড়ে দিল। সে জানে তার স্বামীর প্রকৃতি। মোটা চালের ভাত, পুকুরের কলমি শাক, ঘরের পিছনে ছাইগাদায় হওয়া মানকচু, বাড়ির উঠোনে মাছায় হাওয়া লাউ। এই সব দিয়েই তৈরি হয়েছে রান্না। নারান পেট ভরে খেয়ে, চাটাইয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করল। শিবপোতা থেকে আসার সময় সে অ্যালার্ম দেওয়া জাপানি টেবিল ঘড়িটা এনেছিল। বেশ জোরেই সেটা টিক টিক, টিক টিক শব্দ করে। নারান চোখ বুজে শব্দ শোনে, আর অপেক্ষায় থাকে কখন অ্যার্লাম বেজে ওঠে।
আধ ঘণ্টা পরই, চারটের সময় অ্যালার্ম বেজে উঠল, আর নারানও উঠে বসল। তার ছোটখাটো ঘরের কাজ রয়েছে। মহামায়া চার বাড়ি গোরু দুয়ে পাঁচ টাকা মাসে পায়। সে এইবার বেরোবে। গতকাল নারান বাঁশ কেটে রেখেছিল নতুন একটা মাচা তৈরি করবে বলে। কয়েকটা বাঁশ চিরে হাত চারেক লম্বা বাখারি করা। উঠোনের যেখানে মাচা হবে সেইদিকে বাখারিগুলো ছুড়ে দিতে দিতে, হঠাৎ কী যেন মনে পড়ায় মহামায়াকে উদ্দেশ করে নারান বলল, ”স্পোর্টসে বর্শা নিক্ষেপ বলে একটা ব্যাপার আছে। লম্বা সরু লাঠির মতো, বোধহয় লোহা টোহা দিয়ে তৈরি কিংবা অ্যালুমিনির, মুখটা ছুঁচলো। এর একটা কী যেন ইংরিজি নামও আছে। ওলিম্পিকে একটা বউ এই বর্শা ছোড়ার কম্পিটিশনে নাম দিয়েছে। তার বরের নাম জ্যাটোপেক, সে নাম দিয়েছে দৌড়ে। তিন রকম পাল্লার দৌড়ে নামবে। প্রথমটায় কাল জিতে গিয়ে সোনার মেডেল পেয়েছে। এবার দ্বিতীয়টায় দৌড়বে।”
