”রাখো ক্রিকেট, বলো ফুটবলের খবরটা।”
”ম্যানেজার এম দত্তরায় খেলার এক ঘণ্টা আগে স্পষ্টই স্বীকার করেন ভারতের পক্ষে জেতার কোনও সম্ভাবনা নেই…সাতজন খালি পায়ে খেলেছে…ওলিম্পিক স্টেডিয়ামের পাশের এক মাঠে খেলা হয়…আর, খেলা শেষের কয়েক সেকেন্ড আগে কুড়ি গজের শটে আমেদ খাঁ গোল দেয়।”
”দশটা গোল হল কখন?”
”প্রথম মিনিটেই, তারপর তেরো, আঠারো, তেইশ, চুয়াল্লিশ। ফাইভ নিল। তারপর পঞ্চাশ, একষট্টি, তেষট্টি, আটষট্টি, অষ্টআশি!”
”ওরে বাবা, তুমি তো নামতা পড়লে দেখছি! অষ্টাশি মিনিটেও ছাড়েনি! আমাদের টিমে খেলেছে কারা? টিম দিয়েছে?”
”দিয়েছে—বি অ্যান্টনি, আজিজ, মান্না, লতিফ, চন্দন সিং, সম্মুগম, ভেঙ্কটেশ, সাত্তার, মৈনুদ্দিন, আমেদ, জে অ্যান্টনি।”
”কলকাতার প্লেয়ারই তো বেশি।”
এই বলেই নারান সাইকেলে উঠে পড়ল। একটা কথা মনে পড়ায় তার অবাক লাগছে—টোলুবাবু তাকে ভোর রাতে এই খেলার রেজাল্ট সম্পর্কে বিন্দুবিসর্গও জানাননি। নিশ্চয়ই বেশি রাতে, খেলার বিভাগের সবাই বাড়ি চলে যাবার পরই, খবরটা এসেছিল। আগে এলে তো টেবিলে হইচই পড়ে যেত, সেও জেনে যেত। বেশি রাতে খবর এসেছে, খবরটা টোলুবাবুই তর্জমা করেছেন, তিনিই প্রেসে গিয়ে কাগজের পাতায় খবর বসিয়েছেন। আর আশ্চর্য এটা নিয়ে সামান্য উচ্চবাচ্যও করলেন না! শুধু মোহনবাগান—ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে কী হবে তাই নিয়ে দুশ্চিন্তায় ঘুমোতে পারছেন না! খেলা পাগল কি একেই বলে? শুধুই মোহনবাগান, তার বাইরে পৃথিবীতে আর কিছু নেই! বয়স্ক লোকেরা খেলা নিয়ে কত যে ছেলেমানুষি করেন! হেলসিঙ্কির দশটা গোল হয়তো ওঁর মাথায় ঘুরছে আর আঁতকে উঠছেন। সব কিছুর মধ্যেই উনি দশ গোল দেখতে পাচ্ছেন।
পাগল, দশ গোল বড় ম্যাচে হয় নাকি! নারান চাকরিতে ঢোকার আগে একবার মাত্র ধান্যকুড়িয়া থেকে কলকাতায় এসে ইস্টবেঙ্গলের খেলা দেখেছে। তারপর নাইট ডিউটি করে, কাগজ বেচে, বাড়ি ফিরেই কাস্তে নিয়ে গোরুর জন্য ঘাস কাটতে বসা। তারপর আবার ট্রেন ধরে অফিসে ডিউটি করতে যাওয়া—সময় কোথায় তার মাঠে যাওয়ার? সাইকেল প্যাডেল করতে করতে নারান শূন্য চোখে সামনে তাকিয়ে। তারও ফুটবলার হবার সাধ ছিল। পনেরো বছর আগেও স্বপ্ন দেখত ইস্টবেঙ্গল টিমে খেলার, কিন্তু এখন তার এ সবের জন্য সময় নেই। সংসারটাকে আগে দাঁড় করাতে হবে তারপর খেলাধুলোর কথা ভাবা যাবে।
কিন্তু কবে? বয়স তো আর থমকে থাকবে না, বেড়েই যাবে। বুড়ো বয়সে দাবা আর লুডো ছাড়া আর কী—ই বা খেলবে? অথর্ব শরীরে দৌড়োদৌড়ি করা তো যাবে না! অথর্ব শব্দটা মনের মধ্যে ঢুকে পড়তেই নারানের মাথা গরম হয়ে গেল। সে কী! আমি অথর্ব হব? অসম্ভব…অসম্ভব।
প্রচণ্ড গতিতে তার দুটো পা ওঠা—নামা করতে শুরু করল প্যাডেলে চাপ দিয়ে। চোয়াল শক্ত, হ্যান্ডেল ধরা হাতের পেশি ফুলে উঠেছে। মাথার মধ্যে একটা প্রতিজ্ঞা সাইকেলের চাকার মতো বনবন ঘুরছে—বুড়ো হব না…বুড়ো হব না।
ধান্যকুড়িয়া রেল স্টেশনের পুব দিকে নারানের বাড়ি। সাইকেলটা হরিহর ভটচাযের দোকানে রেখে, নগদ বিক্রির টাকা ওর ছেলে ঝণ্টুকে বুঝিয়ে দিয়ে সে হেঁটে বাড়ি ফেরে। রেললাইন পার হয়ে একটু পা চালিয়ে হাঁটলে মিনিট দশেকের পথ। লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে তার সঙ্গে দেখা হল বিভূতি মুখুজ্জের। হাবড়ায় বাড়ি। এখানে ওঁর জমি জায়গা আছে। ভাগে চাষ করান।
ইনি নারানকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ”অন্যের হয়ে কাগজ না বেচে, নিজেই কিনে এনে বেচ না!” নারান বলেছিল, ”কাগজ কিনে আনব যে, তার টাকা কোথায়? কাগজ পিছু তিন টাকা করে সিকিউরিটি—মানি জমা রাখতে হবে। যদি দেড়শো কাগজ আনি তা হলে সাড়ে চারশো টাকা! বাপস! সাড়ে চার টাকা দেবারই ক্ষমতা আমার নেই, আর কিনা…।” বিভূতি মুখুজ্জে বলেছিলেন, ”ফিফটি ফিফটি শেয়ারে ব্যবসা করো। সিকিউরিটি—মানিটা আমি দেব, তুমি কাগজের দামটা দিয়ো।”
কয়েক দিন প্রস্তাবটা নিয়ে সে ভেবেছিল। অফিসের ষাট টাকা আর হরিহর ভটচাযের তিরিশ টাকা, এই নব্বুই টাকা আর দুধ বেচে যে ক’টা টাকা পাওয়া যায়। এই টাকায় তো আর বছরের পর বছর চলা যায় না! খরচ তো বাড়বেই। মহামায়াকে বলা মাত্র সে বলেছিল, ”ভালই তো, আয় বাড়াবার জন্য নিজেই ব্যবসাটা ধরো। আমার কাছে এখনও ভরি—দেড়েক সোনা তো রয়েছে।” নারান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, ”ভারতে এসে চার বছর বেকার ছিলাম। হাতের টাকা সবই গেল ভিটেটা কিনতে আর দু’বেলা খেতে। তোমার সাত ভরি গয়না তিনশো টাকায় বন্ধক রয়েছে। সুদে আসলে কত যে হয়েছে আজও তার হিসেব করিনি। ওই গয়না ছাড়িয়ে না আনা পর্যন্ত আমি আর কিছু নেব না তোমর কাছ থেকে। তাতে যদি ব্যবসা করা না হয় তো হবে না!”
লেভেল ক্রসিংয়ে সে বিভূতি মুখুজ্জেকে বলল, ”টাকা দিয়ে ব্যবসা করার মতো অবস্থা হলে করব। আগে কিছু জমাই তারপর আপনাকে বলব।” দাঁড়িয়ে কথা বলার মতো অবস্থা তার এখন নয়। শ্রান্তিতে আর খিদেয় শরীর অবসন্ন। এখন বাড়ি ফিরে আবার ঘাস কাটতে বেরোতে হবে।
”নারান, তিরিশ টাকার জন্য এই অমানুষিক পরিশ্রম কত দিন করবে?”
”যত দিন না বেশি টাকার কাজ পাচ্ছি। এই তিরিশ টাকাই বা কে দেয় বলুন? যা পাওয়া যায় তা আর ছাড়ব কেন? আমার মূলধন তো এই শরীরটা, দেদার খরচ করতে পারি!”
