খবরটা অসাধারণ বা চমকপ্রদ নয়।
নারান চোখ সরাতে যাচ্ছে পাশের ক্রিকেট টেস্ট ম্যাচের খবরে। তখন জ্যাটোপেকের একটা কথা তার নজরে এল : ”জয়ের পর এক সাংবাদিক তাঁর কাছে জানতে চান—চার দিন পর পাঁচ হাজার মিটার দৌড়েও তিনি অংশগ্রহণ করবেন, এ কথা কি সত্যি? জবাবে জ্যাটোপেক বলেন, ‘ম্যারাথন প্রতিযোগিতার তো অনেক সময় বাকি। তাই ততক্ষণ বসে না থেকে কিছু একটা তো করতে হবে।’
তারপর আর একটা বাক্য—”জ্যাটোপেক দম্পতির জন্ম একই বছরে একই দিনে, ১৯২২—এর ১৯ সেপ্টেম্বর।
হঠাৎই নারানের শরীরে হালকা শিহরন জাগল। তারও তো জন্ম ১৯ জন্ম সেপ্টেম্বর! তবে জ্যাটোপেকের দু বছর আগে। হোক ন দু বছর আগে কি পরে, তারা তো প্রায় সমবয়সিই! নারানের শরীরে একটা সতেজ ভাব নাড়াচাড়া করে উঠল। কেন যে সে প্রফুল্লতা বোধ করছে তার কোনও কারণ সে বলতে পারবে না। শুধু তার মনে হচ্ছে, তারই সমবয়সি একজন পৃথিবীতে তার বিভাগে সেরা।
আর তার ভাল লেগেছে ওই কথাটাও—”ততক্ষণ বসে না থেকে কিছু একটা তো করতে হবে।” রসিকতা করেই জ্যাটোপেক বলেছেন, কিন্তু নারান এর মধ্যে তার নিজের মনের ছবিটাই যেন ফুটে উঠতে দেখছে। সেও তো কখনও বসে থাকে না। তার বউ মহামায়াও কখনও অলস হয়ে সময় কাটায় না। তারা দুজনেই কিছু না কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এই জ্যাটোপেক লোকটাও তাই করে।
নারান এই মুহূর্তেই দৌড়তে ভালবেসে ফেলল। সাইকেলটার দিকে সে তাকাল। ভাবল, এটাকে বাতিল করে দৌড়ে দৌড়ে পাঁচটা গ্রামে কাগজ বিলি করলে কেমন হয়? তারপরই মনে হল, এক একটা আট পাতার একশো কাগজ বগলে কি মাথায় নিয়ে দৌড়লে কাজটা বোকার মতোই হবে। বিলি করতে করতে একটা একটা করে কাগজ কমে যাবে ঠিকই, কিন্তু সময়ও তো বেশি লাগবে! দেরি হলে খদ্দেররা চটবেই, আর তার কাছ থেকে কাগজ নেওয়াও বন্ধ করে দেবে।
থাক, দৌড়ে আর দরকার নেই, সাইকেলই ভাল! নারান জ্যাটোপেককে মন থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য ইংল্যান্ডে ভারতের সঙ্গে তৃতীয় টেস্ট ম্যাচের খবরে চোখ রাখাল। এই একটা খেলা যার মাথামুণ্ডু সে একদমই বোঝে না, অবশ্য বোঝার কোনও চেষ্টাও করে না। কাজকর্ম ফেলে পাঁচ দিন ধরে মাঠে বসে যারা খেলা দেখে, তারা যে কী ধরনের লোক সেটাও সে বুঝতে পারে না!
অফিসের রবিবাবু তো ক্রিকেটের উপর ভীষণ খাপ্পা। একদিন টেবিল চাপড়ে চিৎকার করে বলছিলেন, ”পৃথিবীতে যেসব দেশ উন্নতি করেছে, শক্তিশালী হয়েছে, যেমন আমেরিকা, রাশিয়া, এরা কেউ ক্রিকেট খেলে না। এটা হচ্ছে রাজারাজড়াদের রোদ পোয়াবার একটা ফিকির। আরে বাবা, আমাদের হল গরিব দেশ। স্বাধীনতা পেয়েছি, এবার দিন—রাত পরিশ্রম করে দেশটাকে দাঁড় করাতে হবে। এখন কি আমাদের সময় নষ্ট করার খেলায় মেতে ওঠা উচিত? আর খেলিও তো আমরা তেমনি! এই দ্যাখো না ট্রুম্যান নামে নতুন এক ছোকরা অ্যায়সা জোরে বল করল যে আমাদের ব্যাটসম্যান ভয়ে পিছু হটে আম্পায়ারের কাছাকাছি চলে গেল।”
রবিবাবু অসহযোগ আন্দোলনে জেল খেটেছেন। খদ্দরের ধুতি পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য কিছু পরেন না। কুস্তি, বকসিং, সাঁতার, জিমন্যাসটিকসের ভক্ত। ওঁর কথাবার্তার মধ্যে দিয়ে কীসের যেন জ্বালা আর রাগ বেরিয়ে আসে। টাক মাথাটায় হাত বুলোতে বুলোতে একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ”হ্যাঁ রে নারান, যদি দেশটা ভাগ না করা হত, তা হলে তুই এখানকার থেকে ভাল থাকতিস না মন্দ থাকতিস?” নারান কয়েক মুহূর্ত ভেবে জবাব দিয়েছিল, ”ভাল থাকতুম ঠিকই, তবে সেখানে জীবনটা সাজানো ছিল তো…এখন নতুন করে আবার গড়ে তুলতে হচ্ছে। গড়ার একটা আলাদা সুখ, আলাদা আনন্দ আছে। রবিবার সেটা আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারব না। আমার বউ এটা বোঝে।”
স্টিলফ্রেমের গোল কাচের চশমাটা কপালের উপর তুলে দিয়ে পঞ্চাশ বছর বয়সি রবিবার কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, ”তুই দেখছি, আলাদা ধরনের মানুষ! ওপার থেকে যত উদ্বাস্তু এসেছে সবাই বলে কষ্টের কথা, দুঃখের কথা, আর তাই দুঃখ—কষ্টের মধ্যে কিনা আনন্দ খুঁজে পাস?…আলাদা মানুষ তুই।”
নারান অন্যমনস্ক হয়ে একদৃষ্টে কাগজের দিকে তাকিয়ে থেকে ভেবে যাচ্ছিল রবিবাবুর কথাগুলো। লক্ষ করেনি ছেলেটি তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
”দাদু বললেন, ফিরতে ঘণ্টাখানেক দেরি হবে। আপনি কি ততক্ষণ থাকবেন?”
”থাকলে আমার চলবে না। তেরো—চোদ্দো মাইল…আমাকে ফিরতে হবে।”
”কাগজ দেবেন না?” ছেলেটির গলায় হতাশা, মিনতি। নারানের মায়া হল। কাগজটা এগিয়ে ধরে বলল, ”কাল অবশ্যই যেন টাকা পাই।” কাগজটা ব্যগ্র হাতে ধরিয়ে দিয়ে সে আবার বলল, ”খেলার খবর পড়তে চাও, কিন্তু কী আছে আমাদের পড়ার জন্য? শুধু তো হকির একটা মেডেল।”
”কেন ফুটবল আছে!”
নারান আর কথা না বলে সাইকেল নিয়ে রাস্তায় উঠে এল। প্যাডেলে পা রেখে সিটে বসার উদ্যোগ করছে, তখন সে ছেলেটিকে আহত স্বরে বলতে শুনল, ”এ কী! দ—অ—শ গোল! …ওম্মা! এক দিনেই দুটো ইনিংস শেষ!”
নারান বুঝতে পারল না, কেন ছেলেটির মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মনে হচ্ছে যেন কলেরার রোগী।
”কী হল?” চেঁচিয়ে প্রশ্ন করে, নারান সাইকেল হাতে উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে রইল।
”দশ গোল খেয়েছে ইন্ডিয়া, একটা গোল শুধু শোধ করেছে…যুগোশ্লাভিয়ার কাছে! আর ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে খেলার থার্ড দিনে ভারত দু’বার আউট হয়েছে, আটান্ন আর বিরাশি রানে…ইনিংস আর দুশো সাত রানে হেরে গেছে।”
