নারান দোকানে ঢুকে হাতের ছোট থলিটা কাউন্টারের নীচের তাকে রাখল। তারপর দেয়ালে হেলানো সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে পিছনের চাকায় দু’আঙুলে টিপতেই সামান্য বসে গেল। পাম্পার দিয়ে চাকায় হাওয়া ঢুকিয়ে সে সাইকেলটা বার করে আনল। হ্যান্ডলের উপর অর্ধেক আর পিছনের ক্যারিয়ারে অর্ধেক কাগজ সাজিয়ে রাখতে রাখতেই সে রাস্তার ওপারের চায়ের দোকানের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলল, ”হাবু, চা দে।”
গ্লাসে চা আর এক আনা দামের একটা সুজির বিস্কুট হাবু দিয়ে গেল। দোকানের পাল্লা বন্ধ করে তালা দিয়ে হরিহর বললেন, ”কলকাতা যাব এগারোটার ট্রেনে, টাকাপয়সা ঝণ্টুকে বুঝিয়ে দিয়ো।”
নারান ধীরে ধীরে চিবিয়ে বিস্কুটটা খেল। যতক্ষণ না মুখের মধ্যে গলে যাচ্ছে ততক্ষণ সে কোদাল দিয়ে কাদা ছানার মতো বিস্কুটের টুকরো জিভে নাড়ল। মহামায়ার করে দেওয়া চারখানা মোটা রুটি আর লাউপাতা দিয়ে আলুর ছেঁচকি রাতে অফিসে খেয়েছে। এখন পাঁচটা গ্রামে—শালকোনা, আন্দুলিয়া, ঝাউডাঙা, রঘুরামপুর, তুবড়িয়া—সাইকেল চালিয়ে যেতে হবে। একশো কাগজ দিতে একশোবার নামা আর ওঠা। মোট রাস্তা প্রায় আঠাশ মাইল।
ধান্যকুড়িয়ায় ফেরার সময় সাইকেল চালাতে চালাতে নারানের তখন মনে হয়, একটা রাক্ষস তার পেটটা মুঠোয় ধরে টিপছে আর ছাড়ছে। এক আনার বিস্কুট তখন গলায় উঠে এসে আটকে থাকে। তখন রাস্তার ধারের টিউবওয়েল থেকে সে পেট ভরে জল খেয়ে নেয়। ঝাঁ ঝাঁ রোদে দূরের গাছ আর বাড়ি চোখে তিরতির করে কাঁপে। রাস্তার ভাঙা ইটগুলো মাটি থেকে মাথা তুলে সারাক্ষণই সাইকেলটাকে ঝাঁকি দেয়। লরি আসে, বাস আসে সামনে—পিছন থেকে। গোরুর গাড়ির চাকার গর্ত সামলে রাস্তার ধারে বারবার সরে যাওয়া। ঘণ্টা—পাঁচেক পর, দুপুর দুটো নাগাদ বাড়ি ফেরা। তখন তার পেটভর্তি শুধু টিউবওয়েলের জল!
নারান চায়ে চুমুক দিতে দিতে কাচের বোয়েমে থাক দিয়ে সাজানো বিস্কুটগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল। গুনতে শুরু করল। এক, দুই, তিন…এগারো, বারো….গোনা বন্ধ করল। বিস্কুটগুলো খাওয়ার দুটো উপায় আছে—পয়সা দিয়ে কিনে নেওয়া, নয়তো ঝপ করে বোয়েমটা তুলে সাইকেল চালিয়ে সরে পড়া।
মাথা নেড়ে নারান হেসে ফেলল, নিজের উদ্ভট চিন্তায়। তার পকেটে একটা সিকি আছে বটে, কিন্তু এটা নিরুপায়। কোনও অবস্থায় পড়লে তবেই খরচ করার জন্য। মরে গেলেও সে এটা দিয়ে বিস্কুট কিনে খাবে না। আর বোয়েম লুঠ করার মতো কাজের প্রবৃত্তি তার রক্তে নেই।
”হ্যাঁ রে হাবু, একটু চুন পাওয়া যাবে?”
হাবু চালার নীচে থেকে গলা বাড়িয়ে ডান দিকে তাকাল। ”রসময়ের দোকান এখনও খোলেনি। কী হবে চুন দিয়ে?”
”পায়ে একটা পেরেক ফুটেছিল সকালে, সামান্য টাটাচ্ছে জায়গাটা।”
”ও অমন একটু—আধটু টাটাবে, কিছু হবে না। রাস্তায় পানের দোকান পাবে, লাগিয়ে নিয়ো।”
কাগজ বিলি করতে করতে নারানের আর মনে ছিল না চুন লাগাবার কথা। ঝাউডাঙার বাদল নস্করের বাড়ির দরজার সামনে সাইকেল থেকে নামার সময় গোড়ালিটা পড়ল একটা ইটের উপর। ব্যথা লাগতেই তার মনে পড়ল, চুন লাগাতে হবে।
বাদল নস্কর চাষের কাজ দেখতে ক্ষেতে গেছে। কাগজের পাওনা টাকা না নিয়ে নারান আজ আর ফিরে যাবে না ঠিক করেছে।
”ক্ষেত কত দূর?” নারান জিজ্ঞেস করল নস্করের ক্লাস এইটে পড়া নাতিকে।
”আধ—মাইলটাক হবে।”
”আমার পায়ে পেরেক ফুটেছে, হাঁটতে পারব না। তুমি গিয়ে বরং খবর দাও কাগজওয়ালা ওমাসের দাম নেবার জন্য বসে আছে। এমাসের আজ একুশ, টাকা না পেলে কাল থেকে আর কাগজ দিতে পারব না।”
”কাগজ দেবেন না? ওলিম্পিক চলছে যে!” ছেলেটির মুখে অসহায় ভাব ফুটে উঠল।
”ওলিম্পিক বলে কি কাগজ ফ্রি হয়ে গেছে? কাগজ তো পয়সা দিয়ে আমাদের কিনে আনতে হয়! দশ পয়সা করে হলে তিরিশ দিনে কত হয়?”
ছেলেটি মনে মনে গুণ—ভাগ—বিয়োগ করে বলল, ”চার টাকা চুয়াল্লিশ পয়সা।”
”যদি ওলিম্পিকের খবর পেতে চাও তা হলে এক্ষুনি গিয়ে দাদুর কাছ থেকে টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করো।” হাতের কাগজ খুলে সে খেলার পাতাটা ছেলেটির সামনে মেলে ধরল। এতেই কাজ হল। ছুটে চলে যাচ্ছিল তখন নারান আবার ডাকল।
”বাড়িতে পান খায়?”
”হ্যাঁ।”
”একটু চুন এনে দাও তো, গোড়ালিতে লাগাব।”
নারান দরজার সিঁড়ির চওড়া ধাপে বসল। হাতের কাগজটা খুলে চোখ বোলাচ্ছে তখন ছেলেটি ফিরে এল বাড়ির মধ্যে থেকে। আঙুলে কুড়িটা পানে দেবার মতো চুন।
”অত কী হবে।” বলতে বলতে নারান ওর আঙুল থেকে নিজের আঙুলে চুন তুলে নিল। ছেলেটি দৌড়ে চলে গেল। চুন লাগানো গোড়ালি হাঁটুতে তুলে নারান আবার কাগজে চোখ দিল।
একটা খবরে তার চোখ আটকে গেল :
”এমিল জ্যাটোপেকের স্বর্ণ জয়।” ওলিম্পিকের দশ হাজার মিটার দৌড়ে তিনি নতুন রেকর্ড গড়েছেন ২৯ মিঃ ৫৯.৬ সেকেন্ড সময় করে। এর আগে ১৯৪৮—এর লন্ডন ওলিম্পিকেও তিনি স্বর্ণপদক জয় করেছিলেন নতুন ওলিম্পিক রেকর্ড করে। লন্ডনে তিনি পাঁচ হাজার মিটার দৌড়েও রৌপ্যপদক অর্জন করেছিলেন। ওঁর স্ত্রী ডানা জ্যাটোপেকও এই ওলিম্পিকে জ্যাভেলিন নিক্ষেপ বিভাগে চেকোশ্লোভাকিয়ার প্রতিনিধিত্ব করছেন। এমলি জ্যাটোপেকের ১০০ গজ পিছনে থেকে ফ্রান্সের মিমুঁ ১০ হাজার মিটারের রৌপ্যপদক লাভ করেছেন।
