নারান তার এজেন্টের জন্য নির্দিষ্ট কাগজের বান্ডিল ঘাড়ে নিয়ে ট্রেনে উঠল। এঞ্জিনের পিছনের কামরাটা প্রথম থেকেই বেছে নিয়েছে যেহেতু কয়লার গুঁড়ো কম ভিতরে ঢোকে। কিছু লোকও, যারা রোজই এই ট্রেনে যায়, এই কামরায় ওঠে, তারা সবাই পরস্পরকে চেনে। এদের কেউ ফড়িয়া, কেউ ব্যাপারি, দোকানি, কুলি, কম্পাউন্ডার বা সকালের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকও। কিন্তু নারানের সঙ্গে এদের ঘনিষ্ঠতা হয়নি শুধু একটা কারণেই। ট্রেনে উঠেই সে বাঙ্কে কাগজ রেখে, তাতে মাথা দিয়ে, লম্বা হয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
আজও সে তাই করল। তবে শোবার আগে কম্পাউন্ডারকে গোড়ালি দেখিয়ে বলল, ”কিছুক্ষণ আগে পেরেক ঢুকে গেছল, এখন একটু ব্যথা ব্যথা লাগছে। রাস্তার পেরেক, কিছু হবে না তো?”
”হতে পারে। পেকে পুঁজ হয়ে গ্রাংগ্রিন হতে পারে। হয়তো পা—টা কেটে বাদও দিতে হতে পারে। কিংবা ধনুষ্টঙ্কার হতে পারে। তাতে আপনি আজই মারা যেতে পারেন।” কম্পাউন্ডার পান মুখে দিয়ে হাতের তেলোয় গুণ্ডি ঢালতে লাগল।
ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল নারানের মুখ। সে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে বলল, ”মরে যেতে পারি?”
”পারেন। রাস্তার পেরেকে মরচে আছে। ওটা মারাত্মক জিনিস। অ্যান্টি—টিটেনাস ইঞ্জেকশন নেওয়া উচিত।”
”কত খরচ পড়বে?”
”টাকা চারেকের মধ্যেই হয়ে যাবে।”
আর কথা না বলে নারান শুয়ে পড়ল। চার টাকা তার কাছে অনেক টাকা। বউ, দু’টি ছেলেমেয়ে, চারটে গোরু, অথচ মাইনে ষাট টাকা! কাগজ বিলি করার জন্য হরিহর ভটচাজ দেয় তিরিশ টাকা। এই আয়ে চার টাকা দিয়ে ইঞ্জেকশন নেওয়া যায় না।
দমদম থেকে সিঙ্গল লাইন। এক একটা স্টেশনে ডাউন ট্রেনের সঙ্গে ক্রশিংয়ের জন্য কিছুক্ষণ ধরে আপ ট্রেনকে অপেক্ষা করতে হয়। নারান ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়েছিল। কাঁধে নাড়া খেয়ে চোখ মেলতেই দেখল মাথায় গামছা বাঁধা ভজনরামের মুখ।
”এ্যা নারান, উঠ উঠ…বারাসাত আ গিয়া।”
ভজরাম নেমে গেল। কম্পাউন্ডারও নামতে নামতে বলে গেল, ”সঙ্গে সঙ্গে চুন লাগানো উচিত ছিল। স্টেশনে নেমেই লাগিয়ে নেবেন।”
এখনও আধঘণ্টা বাকি ধান্যকুড়িয়ায় পৌঁছতে। নারান বাঙ্ক থেকে নেমে বেঞ্চে বসল। ট্রেনের শব্দ আর দুলুনিতে আবার তন্দ্রা আসছে। এইরকম সময়ে তার দেশের কথা মনে পড়ে। তার দাদাদের কথা, কাকার কথা; গাছ, দিঘি, খেত চোখে ভেসে উঠে।
নারানের তিন বছর বয়সে বাবা মারা যান। চৈত্রমাসে পাওনা আদায়ে বেরিয়ে, কুড়ি বিঘে জমি বায়না করে দুপুরে তিন ক্রোশ হেঁটে বাড়ি ফিরেই মাথা ঘুরে পড়েন। আর জ্ঞান ফেরেনি। ভীষণ রাগী মানুষ ছিলেন। খাটতেন দৈত্যের মতো। এক সময় তাঁর এক ছটাকও জমি ছিল না, বাড়ি ছিল না। মারা যাবার সময় সত্তর বিঘে জমি, দশটা বলদ, ছ’টা গাই, দই আর দুধের ব্যবসা, পাঁচ বিঘে জমিতে বাড়ি রেখে যান মাত্র চল্লিশ বছর বয়সেই। নারান মায়ের মুখে শুনেছে, বাবা নাকি তেইশ ঘণ্টা খাটতেন, একঘণ্টা ঘুমোতেন! স্বচ্ছলতার মধ্যে সে বড় হয়েছে। ক্লাস টেন—এ পড়ার সময় তার মা মারা গেলেন। ম্যাট্রিক পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি।
দেশভাগের পরই তাদের শিবপোতা গ্রামের কয়েকজনের সঙ্গে নারানও গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আসে বসবাসের জন্য জমির খোঁজে। বনগাঁ থেকে ঠাকুরনগর তারপর ধান্যকুড়িয়ায় এসে এক চেনা লোকের সঙ্গে তাদের হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। তাদের পাশের গ্রামেরই রতন ঘোষ। এখানে সে রেলের কেবিনম্যানের কাজ করে। রতনের মাধ্যমেই শিবপোতার বারোটি পরিবার ধান্যকুড়িয়ায় আট বিঘা জমি কিনল সাড়ে তিনশো টাকা বিঘেয়। তারপর আবার তারা গোপনে দেশে ফিরে গিয়ে পরিবারের লোকদের নিয়ে আসে। এই আসার ব্যাপারে তাদের সাহায্য করেছিল গ্রামের কয়েকজন মুসলমান।
নারান কিনেছিল দেড় বিঘা। কিছু টাকা, গহনা, তিন বছরের মেয়ে নয়ন আর বউ মহামায়াকে নিয়ে পৈত্রিক ভিটে ছেড়ে পাঁচ বছর আগে নারান পশ্চিমবঙ্গে চলে আসে চিরকালের জন্য। থাকার জন্য টালির চালের একটা মাটির ঘর, গোয়াল ঘর আর চারটে গাই কেনার পর হাতে আর টাকা ছিল না। শূন্য হাতে নারান দুধের ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু ধান্যকুড়িয়া সাধারণ একটা গ্রাম, লোকসংখ্যা কয়েকশো। দুধ বেচে দিনে এক টাকাও লাভ হয় না। নারানকে তাই চাকরির খোঁজ করতে হয় এবং খবরের কাগজের অফিসে কাজ পেয়ে যায়।
নারান তার ফেলে আসা গ্রাম শিবপোতার কথা যখনই ভাবে বুক ভারী হয়ে যায়। আর এই ভাবনাটা ভোরের ট্রেনেই তার মনে জেগে ওঠে। কিছুক্ষণের জন্য সে পারিপার্শ্বিক ভুলে চলে যায় সীমান্তের ওপারে, আবার এপারে ফিরে আসে ধান্যকুড়িয়ায় ট্রেন থামলে।
ট্রেন থেকে নামার সময় অন্য দিনের মতো আজও সে মনে মনে বলল—পুরনো দিনের কথা ভেবে লাভ নেই। যা ফিরে আসবে না তার জন্য হায় হায় করা বৃথা। বরং আবার কীভাবে মাথা তুলে দাঁড়ানো যায় সেটাই দেখা উচিত। এজন্য খাটতে হবে। সবাই মিলে, তাকে আর মহামায়াকে, খাটতে হবে।
হরিহর ভট্টাচার্যের বইয়ের দোকানের মধ্যে থাকে সাইকেলটা। খবরের কাগজ অফিস থেকেই এটা কিনে দেওয়া। স্কুলের পাঠ্য বই, খাতা, কাগজ, পেনসিল ইত্যাদি ছাড়াও ছোটখাটো ওষুধ, পাউডার, সাবান, লজেন্স এমন কী পোলট্রির ডিমও দোকানে বিক্রি হয়। একটা পাল্লা খুলে রেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে হরিহর দাঁতন করছিলেন। নারানকে দেখে বললেন, ”পেছনের চাকায় হাওয়া কম মনে হচ্ছে, একটু হাওয়া দিয়ে নাও। আর ঝাউডাঙার বাদল নস্করের কাগজের ও মাসের দামটা বাকি পড়ে আছে, তাগিদ দিয়ো।”
