”কী আবার মনে হবে, আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমোন তো। এখনও ইস্টবেঙ্গলের অনেক খেলা বাকি, দু’চারটে হেরেও তো যেতে পারে। ….ভেঙ্কটেশ, আমেদ, সালে, চন্দন সিং নেই—”
”সে তো আমাদেরও মান্না, সাত্তার, রুনু নেই। তোদের আপ্পারাও, ধনরাজ, রমন আর ওই পাকিস্তানি ফকরি তো রয়েছে। উহহ, ওলিম্পিকগুলো এমন সময়ে হয় না! কেন যে পুজোর পর করে না! মান্নার জায়গায় এখন শরৎ দাসকে খেলাবার কথা হচ্ছে। চারবছর কোনও ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলেনি শরৎ, কী যে অবস্থা!”
”টোলুবাবু চারটে—চল্লিশে…”
”কী বললি? চারটে চল্লিশে?” এক ঝটকায় তাঁর শীর্ণ লম্বা—কাঠামো টেবলে খাড়া হয়ে গেল। ”চল্লিশে চার? …চার দিয়ে চল্লিশ ভাগ…ভাগফল দশ,…তার মানে দশ গোল!” টোলুবাবুর চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসার মতো অবস্থা।
”চারটে—চল্লিশে বনগাঁ লোকাল ছাড়বে।”
”নারান, ওটা বনগাঁ নয়, বনগাঁ নয়, ইস্টেবেঙ্গল লোকাল!”
টোলুবাবুর মুখ দেখে নারানের কষ্ট হল। তার থেকে কম করেও পনেরো বছরের বড়, এই সহজ, প্রাণখোলা সাতে—পাঁচে না থাকা মানুষটিকে তার খুব ভাল লাগে। শান্ত টোলুবাবু শুধু অশান্ত হয়ে ওঠেন মোহনবাগান আর ইস্টবেঙ্গলের মুখোমুখি হবার দিন যখন এগিয়ে আসে। ওঁর ব্লাডপ্রেসার নাকি খুবই উঁচুর দিকে। এই সময় অফিসের কেউ, ওঁর কানে যাওয়ার দূরত্বে থাকলে মুখ দিয়ে ফুটবল শব্দটি বার করেন না।
”আমি তা হলে এবার যাই টোলুবাবু। জানেনই তো, আমাকে আবার কাগজ বিক্রি করতে বেরোতে হবে। এই ট্রেনটা ফেল করলে…”
”তা হলে দশ ভাগফল?…রেজাল্টটা যখন তোর মুখ থেকেই…।”
নারান দু—তিন পা এগিয়ে গিয়েছিল। হতাশ, ভেঙে পড়া স্বর শুনে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ”আমার মুখ থেকে আবার কখন রেজাল্ট বেরোল! আমি তো ট্রেনের টাইম বললুম।”
”দৈববাণী রে, নারায়ণের দৈববাণী! যা তুই, তোর ট্রেন ছেড়ে দেবে। ধান্যকুড়িয়া, আমি টাইমটেবিলে দেখেছি, দশটা স্টেশন।…এক একটা স্টেশন আর এক একটা গোল।”
”কী আপনি বলছেন? ইস্টবেঙ্গল—মোহনবাগান ম্যাচে দশ গোল হয় কখনও? হয়েছে কখনও, না হবে কখনও? আপনি বরং এখন ওলিম্পিকের কথা চিন্তা করুন। সেখানে আমরা দশ গোল খাই কি না।” বলতে বলতে নারান বেরিয়ে গেল।
নীচে এসে দেখল ভ্যানে কাগজ তোলা হচ্ছে। গোবিন্দবাবু দাঁড়িয়ে। নারান তাকে বলল, ”টোলুবাবু দেরি করিয়ে দিলেন…উঠব?”
”আজ আর জায়গা হবে না। কাগজ বেশি ছাপা হয়েছে। হেঁটেই স্টেশন যাও।”
”হেঁটে যাব! ট্রেন পাব কি?”
”তা হলে দৌড়ে যাও।”
নারান গ্যাসের আলো—জ্বলা রাস্তার দু’ধারে তাকাল। বাড়িগুলো আবছা। সরু ফুটপাথে সার দিয়ে ঘুমন্ত মানুষ তাদের সঙ্গে কুকুরও ঘুমোচ্ছে। দূরের সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ থেকে মাঝে মাঝে ছুটন্ত লরির শব্দ ভেসে আসছে। গোবিন্দবাবু না বলেছেন যখন তখন আর সেটা হ্যাঁ হবে না। এই ভ্যান থেকেই শেয়ালদায় হকারদের কাছে কাগজ বিলি হবে আর মফস্বলের এজেন্টদের জন্য কাগজের প্যাকেট ট্রেনে উঠবে। ধান্যকুড়িয়ার এজেন্ট হরিহর ভট্টাচার্যের জন্য বরাদ্দ একশো কাগজ নিয়ে সেও ট্রেনে উঠবে। যদি এই ট্রেনটা না ধরতে পারে তা হলে এক ঘণ্টা দেরি হয়ে যাবে কাগজ বিলি করতে। ভোরের প্রথম ট্রেন ঘড়ি ঘরে প্ল্যাটফর্ম ছাড়ে।
নারান মালকোঁচা দিয়ে পরা ধুতিটা হাঁটু পর্যন্ত টেনে তুলে কোমরে গুঁজল। জুতো নেই তার পায়ে। চটি ছিঁড়ে যাবার পর, সেটা মুচির কাছে দিতেই সে একবার মাত্র তাকিয়ে বলেছিল, ‘এটা গঙ্গায় দিয়ে এসে একজোড়া নতুন কিনুন। সারাবার মতো জায়গা এতে আর নেই।’
ছুটতে শুরু করল নারান। প্রায় এক মাইল পথ। খোয়ার টুকরো পায়ের তলায় ফুটছে, ছোট গর্তে পড়ে আঙুল আর গোছ ব্যথা পাচ্ছে। সেদিকে নারানের মন দেওয়ার সময় নেই। প্রায় অন্ধকার ট্রামরাস্তা ধরে সে ছুটে চলেছে। ভোরবেলা ব্যায়ামের জন্য যেভাবে দৌড়োনো হয়, নারান সেই বেগে দৌড়চ্ছে না। তারও সাত—আটগুণ জোরে, দেড় হাজার মিটার রেসের প্রতিযোগীদের মতো তার ছোটা। গঙ্গাস্নানের জন্য কিছু মহিলা ও পুরুষকে সে পশ্চিম দিকে হেঁটে যেতে দেখল। তার শুধু একটাই তখন দুশ্চিন্তা—পুলিশ আর কুকুর। কিন্তু এদের কারও সঙ্গে সারাপথে তার একবারও দেখা হল না। যখন সে আমহার্স্ট স্ট্রিটের মোড়ে তখন সে দেখল কাগজের ভ্যানটা তার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। এই সময়ই একটা পেরেক গোড়ালিতে ঢুকে তাকে দাঁড় করিয়ে দিল। পেরেকটা টেনে বার করে সে আবার ছোটা শুরু করল।
নারান হালদারের বয়স বত্রিশ। ছিপছিপে, প্রায় ছ’ফুট। দূরপাল্লার অ্যাথলিটদের মতো পায়ের আঙুল থেকে কপাল পর্যন্ত তার দেহের গড়ন। গায়ের রং বালিমাটির মতো। মুখটি লম্বাটে, গালের হাড় সামান্য উঁচু, চোখ দু’টি তীক্ষ্ন জ্বলজ্বলে। চাহনিতে এমন একটা কাঠিন্য আছে যা থেকে মনে হয় লোকটি জেদি, একগুঁয়ে। হাঁটার ধরনে ব্যস্ততা প্রকাশ পায়। নারান ধৈর্যধারী নয়। চট করে রেগে ওঠে যেমন, জল হয়ে যেতেও বেশি সময় সে নেয় না। পরিশ্রমে কখনও সে কাতর হয় না। এই গুণটি তার জন্মগত।
হাতঘড়ি থাকলে নারান জানতে পারত, সে একমাইল পথ পাঁচ মিনিটেই দৌড়ে এসেছে। অবশ্য সময়টা নিয়ে সে অবাক হত না। এই রকম বেগে সে যখন—তখনই দৌড়তে পারে। স্টেশনে কাগজের ভ্যানটিকে ঘিরে তখন প্রচণ্ড ব্যস্ততা। থাক দিয়ে মাটিতে নামানো রয়েছে কাগজের স্তূপ। কলকাতার এজেন্টরা এখান থেকেই বিলি করে দিচ্ছে হকারদেব। তারা হেঁটে বা সাইকেলে কাগজ নিয়ে ছুটছে চিৎকার করতে করতে। আর বান্ডিল বান্ডিল কাগজ তোলা হয়েছে ট্রেনে। স্টেশনে স্টেশনে স্থানীয় এজেন্টদের লোকের হাতে সেগুলো দেওয়া হবে।
