ইসস চারটে বেজে গেছে!
চার লাফে বারোটা সিঁড়ি টপকে উঠে সে হলঘরে এল। ইতস্তত ছড়িয়ে—থাকা টেবিলগুলোয় এক একজন ঘুমোচ্ছে। কেউ লুঙ্গি, কেউ পাজামা, কেউ ধুতি পরে। টেবিলের কাগজপত্র, লেখার প্যাড, দোয়াত—কলম, টেলিপ্রিন্টারের কপিগাঁথা স্পাইক সবই চেয়ারের উপর নামিয়ে রাখা। পাখার হাওয়ায় টেলিপ্রিন্টার রোল থেকে মেঝেয় লতিয়ে নেমে আসা কাগজ উড়ছে। নারান কাগজ ডিঙিয়ে হলঘরের কোণের দিকে গেল। ওখানে কাঠের আলমারির মাথায় তার টিফিন ক্যারিয়ার রাখা থলিটা রয়েছে।
টেবিলে টোলুবাবু বাঁ কাত হয়ে ঘুমোচ্ছেন। এই সপ্তাহে রাতে স্পোর্টস ডিপার্টমেন্টে ওঁরই ডিউটি। রাত দুটোয় এক তলার প্রেস থেকে স্পোর্টস পাতা সাজিয়ে দিয়ে উঠে এসে শুয়েছেন। প্রতি রাতে শোবার আগে টোলুবাবু এক গ্লাস জল আর একটি ওষুধের বড়ি খান। নারান জলভরা গ্লাস তৈরি রাখে। সেটা হাতে নিয়ে মুখে তোলার আগে প্রতি রাতের মতো আজও আক্ষেপ করেছেন, ”কত ভাল ভাল খবর যে ধরানো গেল না।
”কেন, ধরাবার মতো জায়গা কি পাতায়….?”
”আরে না। ওলিম্পিক হচ্ছে হেলসিঙ্কিতে, ইউরোপের একটা দেশে। ওখানকার সঙ্গে কলকাতার সময়ের কত তফাত হয় জানিস?”
”অনাদিবাবু সেদিন বললেন পাঁচঘণ্টারও বেশি।”
”তবেই বোঝ। ইভেন্টগুলো শেষ হবে, রিপোর্ট লিখবে, তারপর পাঠাবে। কলকাতায় সেটা এসে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত বারোটা—একটা। কপিগুলো তর্জমা করবে কে? এগারোটা বাজলেই তো সবাই ট্রাম ধরতে ছুটবে। তারপর অ্যাত অ্যাত কপি আমি…।”
এক চুমুকে গ্লাস খালি করে টোলুবাবু শুয়ে পড়েন। হেলসিঙ্কিটা যে পৃথিবীর কোন দিকে, কোন জায়গায় নারান তা জানে না। তার ধারণা টোলুবাবুও জানেন না। কিন্তু সিনিয়ার সাব—এডিটারকে আভাসে—ইঙ্গিতেও একজন বেয়ারার পক্ষে সেটা জানানো যায় না!
নারান ঘুমন্ত টোলুবাবুর পাশ দিয়ে আলমারির কাছে গেল। হাত তুলে আলমারির মাথা থেকে থলিটা নামাবার সময়, সজোরে দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো ”হ—অ—অ—অ” একটা শব্দ শুনল। মুখ ঘুরিয়ে দেখল টোলুবাবু পিট পিট করে তাকে দেখছেন।
”নারান, তোদের ধান্যকুড়িয়ায় চালতা হয়?”
”ঠিক জানি না। নিশ্চয় কারও বাড়িতে গাছ আছে। কেন, আপনার দরকার?”
”না—হ—হ। ধানের সঙ্গে চালের সম্পর্কটা খুব কাছাকাছি তো তাই ভাবলুম…”
”আপনি ভাবছিলেন! এতক্ষণ তা হলে ঘুমোননি?”
”এল না। মনটা খচখচ করছে। যুগোশ্লাভিয়ার সঙ্গে খেলা…কী যে হবে। তোর কি মনে হয় বল তো?”
নারান এক—পা পিছিয়ে মাথা কাত করে ঘড়ি দেখল। চারটে—দশ! বনগাঁ লোকাল শেয়ালদা থেকে ছাড়বে চারটে—চল্লিশে। স্টেশনে কাগজ নিয়ে যাওয়ার ভ্যানটা অফিস গেট থেকে রওনা হওয়ার সময় হয়ে গেছে।
”আমার কিছু মনে হয় না। আমি এখন চলি, নইলে ভ্যানটা পাব না।”
”আরে দাঁড়া দাঁড়া। সারা রাত আমার ঘুম হল না এই চিন্তায়…প্রথম খেলায় তো ওয়ান নিলে তোরা হারিয়েছিলি, এবারও কি তাই করবি?” টোলুবাবু উঠে বসলেন।
নারান বিভ্রান্ত। অবাক হয়ে বলল, ”আজ্ঞে, ওলিম্পিকে তো আমার ইয়ে…আমাদের তো কোনও দল নেই!”
”ওলিম্পিক নিয়ে ভাবার জন্য আমার জেগে থাকার কোনও কারণ থাকতে পারে কি? সারা ভারতের লোক জানে, তুই জানিস হকিতে একটা গোল্ড আমরা পাব। আর কিছু নিয়ে মাথাব্যথা করে লাভ আছে কি?”
”আপনি ফুটবল টিমের জন্য ভাবছিলেন না? এই যে বললেন যুগোশ্লাভিয়ার সঙ্গে…”
”রাখ যুগোশ্লাভিয়া। সুইডেনের এক ক্লাব—টিমের কাছে স্টকহোমে দুই—তিনে, ডেনমার্কের এক ক্লাব—টিমের কাছে কোপেনহেগেন দুই—পাঁচে, হেলসিঙ্কিতে আমেরিকার ওলিম্পিক টিমের কাছে ফ্রেন্ডলি ম্যাচে এক—তিনে হেরেছে। ভাব একবার, শেষে কি না আমেরিকার কাছে, যারা ফুটবল কী বস্তু জানে না!”
”টোলুবাবু কাগজের ভ্যান ছেড়ে দিলে আমার…”
”তোর কী আবার? ভ্যান চলে গেলে পা তো আছে! আমার ঘুম যে জন্য এল না…হ্যাঁ রে নারান…তোদের এখন সতেরোটা খেলে সাতাশ, আমাদের ষোলোটা খেলে বাইশ। লিগ, ধর পেয়েই গেছিস। এখন তো তোরা একটা ম্যাচ হেরেও যেতে পারিস, কী রে পারিস না?”
এতক্ষণে নারান বুঝতে পারল টোলুবাবুর ঘুম হচ্ছে না কেন। ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে মোহনবাগানের রিটার্ন লিগ খেলাটা আর সাত দিন পরেই। আজই মোহনবাগান দ্বিতীয়বার এবছর জর্জ টেলিগ্রাফের সঙ্গে ড্র করে পয়েন্ট হারিয়েছে। টোলুবাবুর ঘুম ছুটে যাবারই তো কথা।
নারান হালদার যশোরের লোক। আট বছর বয়সে স্কুল মাঠে ফুটবলে পা ছোঁয়াবার দিন থেকেই সে ইস্টবেঙ্গল সাপোর্টার। খবরের কাগজ অফিসে তাকে চাকরি করতে হচ্ছে খেলার বিভাগে। মাত্র ছ’মাস হল সে এই বিভাগের বেয়ারার কাজ পেয়েছে। প্রথম দুদিনেই সে বুঝে গিয়েছিল বিভাগের হর্তাকর্তারা প্রায় সবাই মোহনবাগান সাপোর্টার। ওঁর যদি জানতে পারেন সে ইস্টবেঙ্গল ভক্ত তা হলে হয়তো অন্য কোনও ডিপার্টমেন্টে পাঠিয়ে দিতে পারেন। এটা ধরে নিয়েই সে মুখে চাবি দিয়ে কাজ করে। রিপোর্টার, সাব এডিটররা খেলা নিয়ে যখন তর্ক বা আলোচনা করেন সে মন দিয়ে শুধু শোনে। শুনতে তার ভাল লাগে। অনেক কিছু শিখতে, বুঝতে, জানতে পারে খেলা সম্পর্কে। খেলাকে সে ভালবাসে এবং এই বিভাগটিকেও।
”হ্যাঁ রে নারান, কী মনে হচ্ছে তোর?”
