ডাক্তারবাবু হাঁটতে হাঁটতে দু’ধারে তাকাচ্ছেন। কোথায় বলরাম। রাস্তা থেকে সরোবরের পাড় পর্যন্ত ঘাসের জমিতে প্রচুর লোক। সবাই স্নান করতে এসেছে। বলরাম এমনই এক চেহারার, চট করে খুঁজে বের করাই মুশকিল। তবে হাঁটু পর্যন্ত গেঞ্জি আর মাথায় ‘তিপ্পান্ন’ সংখ্যা দেওয়া কাপড়ের টুপিটা তাঁকে খোঁজ দিতে সাহায্য করতে পারে।
দাঁড়িয়ে পড়লেন ডাক্তারবাবু। বহু লোক ঘাসে বসে রয়েছে, কেউ কেউ শুয়ে। একটা বিরাট অশ্বত্থ গাছ, নীচে বিশাল ছায়া। তিনি দেখলেন, ছায়াতে একটা সাইকেল পড়ে রয়েছে। গুটি গুটি এগিয়ে গিয়ে চমকে উঠলেন। বলরাম চিত হয়ে শুয়ে, চোখ দুটি বোজা। তাঁর পাশে দু’ খণ্ড হওয়া একটা সাইকেল।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করলেন, ব্যাপারটা কী? কিছুই বুঝতে না পেরে ডাকলেন ”বলরামবাবু, ও বলরামবাবু।”
চোখ খুললেন বলরাম, ভুরু কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড লোকটিকে চেনার চেষ্টা করে ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন। লজ্জিতভাবে বললেন, ”একটু ঘুমের মতো এসে গেছিল। জলের ওপর দিয়ে কী সুন্দর হাওয়া আর মিষ্টি রোদ…।”
”কিন্তু এখন তো আপনার হাওয়া খাওয়ার কথা নয়, ঘামার কথা।”
”এই দেখুন।” বলরাম ভাঙা সাইকেলটা দেখালেন।
”এটা তো তুলসীর।”
”হ্যাঁ, ভেঙে গেছে। তাই আমারটা দিলাম।” বলরাম খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার জানাবার মতো স্বরে কথাটা বললেন।
”দিয়ে দিলেন?”
বলরাম অবাক হয়ে তাকালেন। ”দেব না? আমার মাথায় চুল থাকলে সেগুলো সব সাদা হত। আমিই তো দেব।”
”কিন্তু ফিনিশ করলে দেশে আপনিই প্রথম সব থেকে বয়স্ক ট্রায়াথলিস্ট হওয়ার গৌরব পেতেন, একটা দৃষ্টান্ত হতে পারতেন।” ডাক্তারবাবু ক্ষুব্ধস্বরে বললেন, ”আমি কত আশা করে এসেছি অত দূর থেকে। আমাদের দেশে পঞ্চাশ পেরোলেই বুড়ো বলে বাতিল করে দেওয়া হয়, এটা যে কত ভুল ধারণা, সেটাই আজ স্বচক্ষে দেখব বলে এসেছি।”
বলরাম কথাটা শুনতে শুনতে দূরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। একটি মেয়ে দৌড়ে চলেছে। একটি মেয়ে তার পেছনে দৌড়ে আসছে। বলরাম চোখ তীক্ষ্ন করে বিড়বিড় করলেন, ”ওটা তুলসী।”
দুটি মেয়ে পাশাপাশি হয়েছে। প্রথমজন পাশে তাকিয়ে দৌড়ের বেগ বাড়াবার চেষ্টা করছে। বলরাম হেসে মাথা নাড়লেন। ”পারবে না। বৃথা চেষ্টা।” তারপর ডাক্তারবাবুর দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন, ”মেয়েদের কম্পিটিশনটা শেষ হয়ে গেল। ডাক্তারবাবু, এখানে এমন জল, এমন বাতাস, এমন রোদ, এত ভাল ছায়া, এবার একটু ঘুমিয়ে নিন। এ জিনিস চট করে পাবেন না।”
ডাক্তারবাবুও দূরে তাকিয়ে দৌড় দেখছিলেন। বললেন, ”সেকেন্ড মেয়েটা কে, তুলসী? ফার্স্টকে বিট করে বেরিয়ে গেল।”
কথাটা কানে না দিয়ে বলরাম বললেন, ”এটা ওর সাইকেল।”
দু’জনে তাকালেন সাইকেলটার দিকে।
”কম্পিটিশন থেকে ও বেরিয়ে গেছিল। আমি ফিরিয়ে আনলাম। ও ফার্স্ট হচ্ছে। ডাক্তারবাবু, আমার মনে হয় এটাই বয়সের ধর্ম, আমি তা পালন করেছি মাত্র। তুলসী আমাকে মর্যাদা দিয়ে জেতার জন্য চেষ্টা করছে। দৃষ্টান্ত হওয়ার থেকে এই পাওয়াটাই বা কম কী?” বলতে বলতে বলরাম মুখ ফিরিয়ে রাস্তার দিকে তাকালেন।
তুলসী ছুটে আসছে। তার অন্তত পঞ্চাশ মিটার পেছনে তেইশ নম্বর। তুলসী সোজা তাকিয়ে ছুটে যাচ্ছে তাই দেখতে পেল না, তার বাঁ দিকে একটু দূরেই অশ্বত্থের গুঁড়ির আড়াল থেকে এক জোড়া স্নিগ্ধ চোখ তাকে অনুসরণ করে চলেছে।
”এবার হয়তো চাকরি পাবে।” বলরাম অস্ফুটে বললেন।
”বলরামবাবু, আর আমার থাকার দরকার নেই, আমি এবার চলি।” ডাক্তারবাবু উঠে দাঁড়ালেন, ”একটা সিরিয়াস হার্ট পেশেন্ট ফেলে এসেছি।”
ডাক্তারবাবু চলে যাচ্ছেন। বলরাম তাঁকে ডাকলেন, ”এক মাঘেই শীত পালায় না, আমিও পালাব না। সামনের বছর—” বলরামের মুখ হাসিতে ভরে উঠল। তারপর আলতো করে ঘাসের ওপর নিজেকে বিছিয়ে দিয়ে তিনি চোখ বুজলেন।
.
বলরাম ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
”মেসোমশাই, মেসোমশাই। উঠুন, উঠুন, আমি তুলসী। এই দেখুন ট্রফি।”
বলরাম চোখ খুললেন। তার পাশে হাঁটু গেড়ে বসে রয়েছে তুলসী, পাশে সাইকেল হাতে ধরে দাঁড়িয়ে বাবু।
”কী খোঁজা যে খুঁজেছি আপনাকে। সারা সরোবরটা দু’জনে মিলে চক্কর দিয়েছি। মাথাটা তুলুন, প্রণাম করব।”
বলরাম উঠে বসলেন। তাঁর দুই পায়ের পাতার ওপর তুলসীর কপাল নেমে এল। বলরামের হাত নেমে এল তার মাথায়।
”জগন্নাথবাবু কোথায়?”
”উনি ওঁর ভাগ্নির বাড়িতে গেলেন।”
”কিছু বললেন?”
”বললেন, চাকরির জন্য চিন্তা কোরো না, হয়ে যাবে। মেসোমশাই, আমি কিন্তু ফিনিশিং লাইনে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাইনি।” ঝকঝকে চোখে অহঙ্কার ফুটিয়ে তুলসী বলল। ”তেইশ নম্বরকে আধ পাক পেছনে রেখে শেষ করেছি।”
”অজ্ঞান হলে না কেন? তা হলে ছবি উঠত।” বলরাম উঠে দাঁড়ালেন।
”অজ্ঞান হব কেন? আমি কুলডাঙার তুলসী রায় না?”
”তা হলে তুলসী রায়, এখন এই ভাঙা সাইকেল নিয়ে কী করব?”
”ট্যাক্সি করে বিধাননগর স্টেশন, সেখান থেকে ট্রেনে বিদ্যানগর আর তারপর জটাধারীর দোকানে গিয়ে তার পিণ্ডি চটকানো।”
নারান
নারান – মতি নন্দী – কিশোর উপন্যাস
।। ১ ।।
চোখের জলের ঝাপটা দিতে দিতেই নারান সিঁড়ির মাথায় দেয়াল ঘড়িটার দিকে উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে তাকাল।
