সময় নষ্ট হল। মোষটা মোটেই হিংস্র নয়, এই ধারণা নিয়ে তুলসী এগিয়ে গিয়ে হ্যান্ডেল ধরে সাইকেলটি তুলেই বজ্রাহত হল। হ্যান্ডেলসহ সাইকেলটি তার হাতে উঠল সামনের চাকাটিকে জমিতে রেখে। হ্যান্ডেল থেকে সামনের চাকায় নেমে যাওয়া রডের যেখানে ঝালাই করা হয়েছে, সেখানেই রডটা দু’ টুকরো হয়ে গেছে। শুধু সরোবর আর তাকে ঘিরে যাবতীয় জড় ও চলমান দৃশ্যই নয়, তার সারা জীবনটাই যেন পুড়ে খাক হয়ে গেল। অন্ধকার ছাড়া চোখে আর কিছু সে এখন দেখতে পাচ্ছে না। ধীরে ধীরে সে রাস্তার ধারে বসে পড়ল।
ঠিক সেই সময় বলরাম ছিলেন সরোবরের বিপরীতে, তুলসীর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পেছনে। তিনি বারবার শুধু নিজেকে বলে যাচ্ছিলেন : আঁকুপাকু নয়, মাথা গরম নয়, পাশ দিয়ে সবাই চলে যাচ্ছে তো যাক। নির্দিষ্ট একটা স্পিড ধরে রেখে চালিয়ে যেতে হবে। সেই কচ্ছপ আর খরগোশের গল্পটা মনে রাখা দরকার। স্লো অ্যান্ড স্টেডি উইনস…। কম্পিটিশনের এখনও অর্ধেকও হয়নি। এর পর আছে দৌড়। সেজন্য দম জমা করে রাখতে হবে, পা দুটোর ক্ষমতা ধরে রাখতে হবে, এই ট্রায়াথলন শেষ করতেই হবে।
বলরাম ব্রেক কষলেন তুলসীকে ঘাসের ওপর বসে থাকতে দেখে। তার সামনে দু’খণ্ড হওয়া সাইকেলটি।
”এ কী হল?” বলরাম সাইকেল থেকে নেমে এগিয়ে এলেন। ”ভাঙল কী করে?”
তুলসী শূন্য চোখে বলরামের মুখের দিকে তাকাল। ধীরে ধীরে শুধু মাথা নাড়ল। মাথাটি নামিয়ে নিল। টসটস করে জল পড়ল গাল বেয়ে।
”মেসোমশাই, আমার ভাগ্য। বলেছিলেন, আমি নাকি জিতব। এই আমার জেতা দেখুন।” আঙুল দিয়ে সে ভাঙা সাইকেলটিকে দেখাল।
”আমার কথা মিথ্যে হবে না তুলসী, ওঠো।”
তুলসী মুখ নামিয়ে মাথা নাড়ল।
”ওঠো, ওঠো।” বলরাম চাপা স্বরে চিৎকার করে উঠেলেন। তেইশ নম্বর এই সময় সাইকেল নিয়ে তাদের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় আড়চোখে তাকাল।
বলরাম খপ করে তুলসীর ঘাড়ের কাছে গেঞ্জিটা বাঁ মুঠোয় ধরে তাকে টানলেন। হকচকিয়ে তুলসী উঠে দাঁড়াল।
”সময় নষ্ট কোরো না, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, এক্ষুনি ওঠো।”
নিজের সাইকেলটি বলরাম এগিয়ে দিলেন। তুলসী কিছু বলতে যাচ্ছিল, বলরাম তার আগেই তার ডান হাতটা তুলে হ্যান্ডেলে রেখে সাইকেল ছেড়ে দিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন সরোবরের জলের দিকে। সাইকেল পড়ে যাচ্ছিল, তুলসী শক্ত মুঠোয় হ্যান্ডেলটা ধরে ফেলল আর সঙ্গে সঙ্গে একটা কঠিন ইচ্ছা তড়িৎগতিতে তার ডান হাত বেয়ে চেতনায় ঢুকে গেল। সে শক্ত দু’ হাতে হ্যান্ডেল ধরে প্যাডেলে পা রাখল।
বলরাম জলের দিকে যেতে যেতে থেমে গেলেন। মুখ ঘুরিয়ে দেখতে পেলেন, তাঁর সাইকেলকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে কুঁজো হয়ে থাকা একটি পিঠ, যার দুই পা ওঠানামা করছে শিকার তাড়া করা চিতাবাঘের মতো। বলরাম দ্বিখণ্ডিত সাইকেলের কাছে ফিরে এলেন।
তেরো পাক শেষ হওয়ার আগেই তুলসী ধরে ফেলল মেয়েদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে থাকা চব্বিশ নম্বরকে। বহু আগেই সে একুশ নম্বরকে পেছনে ফেলে দিয়ে এসেছে। এখনও বাকি তিন পাক। তেইশ নম্বর ভাল চালায়, সাইকেলটাও দামি। তুলসীর সাইকেল বদলে যাওয়াটা বাবু প্রথম লক্ষ করে বলল, ”দেখুন দেখুন, দিদি মেসোমশাইয়ের সাইকেল দিয়ে চালাচ্ছে।”
”তাই তো। তা হলে বলরামবাবু গেলেন কোথায়?” ডাক্তারবাবু হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। ”লোকটা কি উবে গেল?”
”সেইসঙ্গে তুলসীর সাইকেলটারও তো পাত্তা নেই।”
”তা হলে তো খোঁজ করে দেখতে হয়।” ডাক্তারবাবুকে উদ্বিগ্ন দেখাল। ”আমি বরং একটা চক্কর দিয়ে আসি।”
পুরুষ বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা পাঁচজনের মধ্যে চলছে। প্রথম ছেলেটি সাইকেল থেকে নেমে দৌড় শুরু করার দু’মিনিটের মধ্যে আরও তিনটি ছেলে নামল। ওদের পাশ দিয়ে তুলসীর সাইকেল বেরিয়ে গেল। সরোবরের একদিক থেকে বিপরীত দিকের রাস্তায় চলাচল দেখা যায়। তুলসী লোকেশ্বর বাবার মন্দিরের কাছ থেকে সরোবরের অপর দিকে তাকিয়ে দেখল, কয়েকটা সাইকেল চলেছে। মসজিদের সামনের সাইকেল—আরোহীটিকে তার মনে হল, তেইশ নম্বর হলেও হতে পারে।
অনেক দূর। ওকে ধরতে হলে তাকে অনেক পথের ব্যবধান ঘোচাতে হবে। এটাই ওর শেষ পাক। সাইকেলের ফিনিশিং পয়েন্টে নেমে ও দৌড় শুরু করে দেওয়ার অনেক পরে আমি নামব, তারপর—তুলসী মনে মনে চমকে উঠল। তারপর কী? সূর্য সঙ্ঘের দশ কিলোমিটার রেসের সেই দৃশ্যটা পলকের জন্য চোখে ভেসে উঠল—মেয়েটি হুমড়ি খেয়ে রেল লাইনের আপ তিন নম্বর ট্র্যাকের পাশে, জমিতে দু’হাত রেখে ওঠার চেষ্টা করছে।
ভাগ্য সেদিন তাকে সাহায্য করেছিল। আজও ভাগ্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে তার হাতে তুলে দিয়েছে সাইকেলটা। কিন্তু বারবার তিনবার ভাগ্য কারও পাশে এসে দাঁড়ায় না। এবার আমাকে নিজেই জিততে হবে, নিজে, নিজে, নিজে…। জিততে হবে এই লোকটির জন্য। ”বাহাত্তর বছরে যদি ফিনিশ করতে পারে… আমার কথা অবিশ্বাস করছ কেন? আমি তো বাহাত্তরের অনেক কম।” আমাকে জিততে হবে। একটা মানুষ নিজের গড়া স্বপ্ন নিজের হাতেই ভাঙলেন… আর আমি অবিশ্বাস করছি না মেসোমশাই। ওহহও তুলসী, আরও জোরে, আরও জোরে।
সাইক্লিংয়ের সমাপ্তিসীমার দু’ধারে ভিড়। দু’—তিনজন হাত তুলে তুলসীকে থামতে সঙ্কেত দিচ্ছে। ছুটে এল ভলান্টিয়াররা। সাইকেল থেকে নেমেই সেটি তাদের হাতে প্রায় ছুড়ে দিয়ে তুলসী দৌড়তে শুরু করল। তার মাত্র পঁচাত্তর মিটার দূরে তেইশ নম্বর দৌড়ে যাচ্ছে। এবার দশ কিলোমিটার দৌড়তে হবে। এটা আমার নিজের ইভেন্ট।
