অপেক্ষমাণদের একজন রাজ্য ট্রায়াথলন অ্যাসোসিয়েশনের সচিব। তিনি ব্যস্তভাবে বললেন, ”বলরামবাবু, চটপট জুতো আর গেঞ্জিটা পরে নিন। প্রথম ছেলেটি দু’পাক এই শেষ করল।”
শ্রান্তিভরা মুখে একটু হেসে বলরাম কেডস পরলেন। গেঞ্জির ঝুলটা তাঁর প্রায় হাঁটুর কাছাকাছি পৌঁছল। হাফ প্যান্ট পরার দরকার হল না। তিনি সাইকেলে উঠতে উঠতে দেখলেন ডাক্তারবাবু আসছেন প্রায় ছুটেই।
”বেরোবার মুখে হঠাৎ এক হার্ট অ্যাটাকের কল…।” তিনি কথা সম্পূর্ণ করার আগেই বলরাম তাঁর পাশ দিয়ে চলে গেলেন।
অনেক পিছিয়ে গেছি, ব্যবধানটা আমাকে কমাতেই হবে, এই চিন্তাটা মাথায় নিয়ে তুলসী সাইক্লিং শুরু করল। বহুদূরে তিন—চারজন সাইক্লিস্টের পিঠের দিকে তাকিয়ে সে জোরে জোরে প্যাডেল করে একশো মিটার যাওয়ার পরই সাইকেলটা ছিটকে লাফিয়ে উঠল। ঘুরে যাওয়া হ্যান্ডেল শক্ত হাতে বসে এনে তুলসী স্পিড ব্রেকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে গেল। আরও দুশো মিটার পর লোকেশ্বর বাবার মন্দিরের আগে আর—একটি স্পিড ব্রেকার। সাইকেলের গতি কমিয়ে সেটা অতিক্রম করে সে গতি বাড়াল এবং ক্রমশই বাড়তে থাকল।
রাস্তা থেকে ধারে সরে যাচ্ছে পথচারীরা। বাইরে থেকে যেসব রাস্তা এসে ঢুকেছে সরোবরের এই রাস্তায়, তার মুখগুলিতে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। হঠাৎ কোনও সাইকেল, মোটরবাইক ঢুকে এসে বিপত্তি তৈরি যেন না করে, সেটা রোধ করাই তাদের কাজ। কিন্তু বিঘ্ন ঘটায় তো মানুষই। দুটি বাচ্চচা মেয়ে এমন সময়ে রাস্তা পার হচ্ছিল যখন এক পুরুষ সাইক্লিস্ট প্রায় তাদের ওপর এসে পড়ছিল। ব্রেক কষে সে টলে পড়ে গেল। মেয়ে দুটি ভয় পেয়ে দৌড় দিল আর তুলসী তখনই সেই সাইক্লিস্টকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল।
ডান দিকে কলকাতা কর্পোরেশনের কর্মীদের জন্য বোধ হয়, সারি দিয়ে একতলা টালির চালের কোয়ার্টার। বড় বড় কংক্রিট পাইপ পড়ে রয়েছে, তারপর সরোবরের বাইরে থেকে ভেতরে ঢোকার একটা চওড়া প্রবেশ পথ। তার আগে একটা স্পিড ব্রেকার। তারপর মসজিদ। তুলসী কুঁজো হয়ে প্যাডেল করতে করতে একবার মুখ তুলে দেখে নিল তার পঞ্চাশ মিটার দূরে একটি মেয়ের পিঠ। এইবার একে আমি পেছনে ফেলব, নিজেকে এই বলে সে আরও ঝুঁকে, সিট থেকে নিজেকে সামান্য তুলে প্যাডেলে চাপ দিল। পিস্টনের মতো ওঠানামা করতে লাগল তার দুই পা।
একুশ নম্বর পেছনে পড়ে গেল। মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তুলসী যখন তাকাল তখনই একটি স্পিড ব্রেকারের উপর উঠল তার সাইকেল। একটা বড় ঝাঁকুনি খেল সে। মনে মনে সে বলল, ভাগ্যিস সাইকেলটা সারিয়ে নিয়েছিলাম, নয়তো এতক্ষণে চাকাটাকা খুলে বেরিয়ে যেত। একুশ গেল, এবার ধরতে হবে তেইশ বা চব্বিশকে।
বলরামের কাউকে ধরার জন্য তাড়া নেই। তাঁকে বনবন করে পেরিয়ে গেল এক সাইক্লিস্ট। বলরাম মুচকি হাসলেন এবং ধাওয়া করলেন। ছেলেটা কত পাক দিয়ে ফেলেছে কে জানে। কিন্তু খুব বেশি পিছিয়ে থেকে কম্পিটিশন শেষ করাটা মর্যাদাকর হবে না। এবার একটু স্পিড বাড়ানো যেতে পারে। এই ভেবে বলরাম গতি বাড়ালেন, আর তখনই তাঁর পাশ দিয়ে যাওয়া সাইকেল থেকে তুলসী চেঁচিয়ে বলল, ”মেসোমশাই, আর একটু জোর লাগান।”
ফিনিশিং পয়েন্টে এখন ভিড়। গণ্যমান্য অতিথিরা রাস্তার ধারে চেয়ারে বসে। সেখানে টাইমকিপার আর রেকর্ডাররা। নম্বর দেখে তাঁরা চেঁচিয়ে জানিয়ে দিচ্ছেন প্রতিযোগীদের, আর কত পাক সাইকেল তাদের চালাতে হবে। প্রত্যেকের নামের পাশে সংখ্যার ঘরে টিক পড়ছে। মেয়েদের মধ্যে এগিয়ে আছে তেইশ নম্বর। টাইমকিপারদের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তুলসী শুনল, চিৎকার করে কে বলল ”ইলেভেন টু গো।” আর শুনল, ”দিদি, সামনেই তেইশ।” সে আড়চোখে দেখল জগন্নাথকাকা ভিড় থেকে একটু দূরে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে, মুখ ফ্যাকাশে। ”তুলসী, আরও জোরে”, এইটুকু ছাড়া আর কিছু তিনি বলতে পারলেন না।
আরও জোরে। সামনে তেইশকে সে দেখতে পাচ্ছে। স্পিড ব্রেকার দেখেও সে গতি কমাল না, শুধু সিট থেকে নিজেকে তুলে দিল। এতটা ঝাঁকুনি সহ্য করল সাইকেলটা… আরও জোরে। প্রথম তাকে হতেই হবে।
ডান দিকে কর্পোরেশনের কোয়ার্টারগুলো। তারপর সিমেন্টের পাইপগুলো, তারপর বাইরে যাওয়ার চওড়া রাস্তা। তুলসী এগোচ্ছে রাস্তার দিকে। আর ঠিক তখনই সার দিয়ে বাইরে থেকে সরোবর এলাকায় ঢুকল তিনটি মোষ, তাদের সঙ্গে একটি বাচ্চচা মোষ। কী খেয়াল হল বাচ্চচাটার সে হঠাৎ ওদের সঙ্গ ছেড়ে বাঁদিকে ছুট দিল যেদিক থেকে তুলসী আসছে। তিনটি মোষের একটি, বোধ হয় বাচ্চচার মা, মুখ ফিরিয়ে বাচ্চচাটার উদ্দেশে একটা ডাক দিল।
তুলসী দেখল, বাচ্চচা মোষটা তার দিকেই লাফিয়ে লাফিয়ে আসছে আর তার মা, থলথলে মাংসল চেহারায়, শিংওয়ালা একটি মোষ, বিস্ফারিত চোখে, বোধ হয় তার দিকেই তাকিয়ে ছুটে আসছে, হয়তো ধরে নিয়েছে তার বাচ্চচাকে সাইকেল আরোহী আক্রমণ করবে।
কী করব এখন? প্রশ্নটা মাথার মধ্যে ঝলসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তুলসী সাইকেলের হ্যান্ডেল ডান দিকে ঘোরাল। সেইদিকেই পড়ে রয়েছে কংক্রিটের পাইপ। সামনের চাকা পড়ল স্পিড ব্রেকারে, সে ব্রেক কষল।
এর পর তুলসী নিজেকে দেখতে পেল সাইকেল থেকে উড়ে গিয়ে জমির ওপর পড়তে আর সাইকেলটি পাইপে সজোরে ধাক্কা খেয়ে তার থেকে দশ মিটার দূরে পড়ে আছে। মোষটি তুলসীর দিকে না তাকিয়ে সোজা ছুটে গেল বাচ্চচার দিকে। কিছু লোক ঘটনাটি দেখল, কিন্তু তুলসীকে চটপট উঠে দাঁড়াতে দেখে তারা সাহায্যের জন্য আর এগিয়ে এল না। পরপর দু’জন সাইক্লিস্ট তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকিয়ে দেখে গেল।
