ক্ষিতীশ আর কথা বাড়াল না। বিকেলে অ্যাপোলোয় গিয়ে দেখল কোনি আসেনি। পরদিন সকালে কোনি এল আধঘণ্টা দেরীতে। ক্ষিতীশ রেগে তাকে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই কোনি বলল, ”খাবারের বদলে বরং আমাকে রোজ একটা করে টাকা দেবেন।”
ক্ষিতীশের রাগটা মুহূর্তে অবাক হয়ে গেল।
”তার মানে? রোজ একটা করে টাকা দিতে হবে আমাকে তুই সাঁতার শিখবি বলে? এটা কি আমার পিতৃদায়?”
”অতো খাটাবেন আর খেতে দেবেন না?”
কোনির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ক্ষিতীশ হেসে ফেলল, কোনিও হাসল। দুজনের মধ্যে নিঃশব্দে যেন একটা বোঝাপড়া হয়ে গেল।
”তুই একটা আস্ত শয়তান। আমাকে চিনে ফেলেছিস দেখছি। দাঁড়া, তোকে আগে সাঁতারের মজাটা পাইয়ে দি, তারপর দেখব জলে নামিস কি নামিস না। এখন আমি তোকে খাটাচ্ছি, তখন তুই খাটার জন্য পাগল হয়ে উঠবি।”
কোনি কথাগুলো শুনল মুখে অবিশ্বাসের ভাব ফুটিয়ে। ক্ষিতীশ সেটা লক্ষ করে আবার বলল, ”লেকে একমাইল সাঁতারে যে মেয়েটার কাছে হেরেছিস, তার নাম হিয়া মিত্র। নামটা মনে রাখিস।”
কোনির চোখ দুটো সরু হয়ে এল। মুখ ঘুরিয়ে সে কস্ট্যুমের কাঁধের পটি ঠিক করতে লাগল।
”মনে রাখিস, অমিয়া বলেছে তোকে পা ধোয়া জল খাওয়াবে।”
কোনি ঘুরে দাঁড়াল। শীর্ণ দেহটা ঝাঁকিয়ে রুক্ষস্বরে বলল, ”কস্ট্যুম সাত দিনে আমি আদায় করব। কিন্তু লাল রঙের আমি পরব না, আমার রঙ কালো।”
অমিয়া আর বেলা পঞ্চাশ মিটার কোর্সে কিকিং বোর্ড নিয়ে প্র্যাকটিস করছে। কোনি পাড়ের কাছাকাছি। ক্ষিতীশ একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে। দু চোখে শুধু অনুমোদন আর কণ্ঠে বিড়বিড় : ‘হারামজাদী কোথাকার, আমাকে নিয়ে এতদিন রসিকতা হচ্ছিল! দাঁড়া, তোর ওষুধ আমি পেয়েছি—হিয়া মিত্তির।’
”ক্ষিতীশ, চলছে কেমন?”
নকুল মুখুজ্জে রেলিংয়ে দু’হাত রেখে শুকনো গলায় বলল, ”তুই কি কিছুই খবর রাখিস না! বি এ এস এ—র সিলেকশন কমিটি থেকে আমাকে আউট করে দিয়েছে। এ সবই জুপিটারের ধীরেনের কারসাজি। এদিকে অ্যাপোলোর আর্থিক অবস্থাও ভাল নয়। দু—একটা টাকাওলা লোক যোগাড় করে দিতে পারিস, প্রেসিডেন্ট করে রাখব।”
ক্ষিতীশের হঠাৎ মনে পড়ল বিষ্টু ধরকে। বলল ”চেষ্টা করব। কিন্তু নকুলদা, বি এ এস এ থেকে আউট হয়েছে বলে দুঃখ পাচ্ছ কেন! একটা ক্লাব ঢের বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্টেট অ্যাসোসিয়েশনের থেকে। ক্লাবই সুইমার তৈরী করে ওরা করে মোড়লি।”
”কিন্তু মোড়লদের দলাদলি ঝগড়া প্রতিপত্তির লোভ সুইমারের জীবন শেষ করে দিতে পারে।” নকুল মুখুজ্জে হেসে উঠে বলল, ”জেনে রাখ এবার অ্যাপোলোর কেউ বেঙ্গল টিমে আসছে না, শুধু ওই দুটো মেয়ে ছাড়া।” আঙুল দিয়ে সে অমিয়া আর বেলাকে দেখাল। ”ওরা, জেনে রাখ, সামনের বছরই জুপিটারে ফিরে যাচ্ছে।”
নকুল মুখুজ্জে চলে যাবার পর ক্ষিতীশ আবার কোনির দিকে মন দিল।
”হাঁটু ভেঙ্গে পায়ের পাড়ি…হাঁটু ভেঙ্গে। বলে দিয়েছি না, পা যখন পিছনে ঠেলবি তখন হাঁটু ভাঙ্গবে, ওঠার সময় সোজা থাকবে?”
এই পর্যন্ত চীৎকার করে বলেই তার মনে হল, অমিয়া বা বেলা শুনে নিয়ে যদি এইভাবে কিকিং শুরু করে! তারপরই ভাবল এখন আর ওদের পক্ষে আদ্যিকালের সিজার—কিক ছেড়ে এই শক্ত কিকিংয়ে আসা সম্ভব নয়। তা হলেও, শুনে নিয়ে ওরা হরিচরণকে বলে দিতে পারে। হরিটা অন্যদের এইভাবে শেখাবে হয়তো।
হাত নেড়ে ক্ষিতীশ ডাকল কোনিকে। পাড়ের কাছাকাছি আসতেই ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, ”যা বলছিলুম হচ্ছে না কেন? গোড়ালিটা টানটান থাকবে… এইরকম পিছন দিকে টান করে ঠেলে রাখবি। আর কিক করার সময় যতটা না নিচের দিকে, তার থেকে পিছন দিকেই পায়ের ধাক্কা বেশি দিতে হবে। এইভাবে শোলান্ডার সাঁতার কেটে চারটে গোল্ড জিতেছে টোকিওয়। ….আবার কর… সিক্স বিট, এক চক্কর হাত পাড়ি আর সেই সঙ্গে ছ’টা করে পা মারবি…করে যা, করে যা।”
ট্রেনিং শেষে ফেরার পথে ক্ষিতীশ জিজ্ঞাসা করল, ”তোর দাদার খবর কি রে, আসতে বলিস একদিন। দেখে যাক কেমন তুই শিখছিস।”
কোনি জবাব দিল না। ক্ষিতীশ লক্ষ করল ওর মুখটা কেমন যেন করুণ আর গম্ভীর হয়ে উঠল।
”দাদার অসুখ হয়েছে। দু’দিন কাজে যায়নি।”
”তাহলে তো দেখতে যেতে হয়। আচ্ছা পরে একদিন দেখতে যাব। আর শোন, আজ বিকেলে তোর ওজনটা নোবো। এবার থেকে একসারসাইজ শুরু করতে হবে। খাওয়াও বাড়াতে হবে। ট্রেনিং চার্ট, ডায়ার্ট চার্ট আমি তৈরী করেছি। ভিটামিন কি কি লাগবে সেটা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করব। হেমোগ্লোবিন লেভেল যদি পারি তো টেস্ট করাব।”
ক্ষিতীশ কথা বলতে বলতে বাজারের কাছে এসে দাঁড়াল। একটা টাকা কোনির হাতে দিয়ে বাজারের দিকে এগোচ্ছে, কোনি ডাকল—
”ক্ষিদ্দা, আর দুটো টাকা দেবেন? তাহলে দু’দিন আর আমায় দিতে হবে না।”
”টাকা? কিসের জন্য?” ভ্রূ কুঞ্চিত হল ক্ষিতীশের।
”চাল কিনব। দাদা তো কাজে যেতে পারছে না।”
কোনি চুপ করে গিয়ে মুখটা ঘুরিয়ে রইল।
প্রশ্ন না করে ক্ষিতীশ আরো দুটো টাকা দিল। এবং সঙ্গে সঙ্গে বুঝেও গেল, প্রতিদিন ডিম—কলা খাওয়ার জন্য যে টাকা দিয়েছে সেটা কিসে ব্যয় হয়।
ঘণ্টাখানেক পরই ক্ষিতীশ হাজির হল কোনিদের ঘরের দরজায়। তক্তপোশে ময়লা ছেঁড়া কাঁথার উপর কমল শুয়ে। একদৃষ্টে জানলার বাইরে তাকিয়ে। সব ছোট ভাইটি আর মা উনুনে ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ির সামনে বসে। ঘরে আর কেউ নেই। ক্ষিতীশ গলা খাঁকারি দিতে কমল তাকাল, অবাক হল এবং উঠে বসতে গিয়ে দুর্বলতার জন্য টলে পড়ল।
