”আছে। কিন্তু তুমি কি জানো মাদ্রাজে একজন বাহাত্তর বছরের জাপানি ট্রায়াথলনে কম্পিট করে ফিনিশও করেছেন?”
‘কই না তো।” তুলসী বিস্মিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ”বাহাত্তর বছরের?”
বলরাম আলতো হেসে বললেন, ”তা হলে তুমি আমার কথা অবিশ্বাস করছ কেন? আমি তো বাহাত্তরের অনেক কম।”
”মেসোমশাই…সত্যি।”
তুলসী আবেগের বসে বলরামের দুই হাত চেপে ধরল। ”কী দারুণ ব্যাপার, আমরা দু’জনেই কাল নামছি।”
”হ্যাঁ নামছি। আর আমার মন বলছে তুমি জিতবে।”
তুলসী ঝপ করে বলরামকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ”আমার মন বলছে আপনি ফিনিশ করবেন।”
তুলসীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলরাম মনে মনে বললেন, ”চাকরি যেন পায়। কাল নয়, ভগবান, আজ থেকেই তোমায় আমি মানছি।”
.
বেলেঘাটা সুইমিং অ্যাসোসিয়েশনের ঘাটে, সুভাষ সরোবরের হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে বারোটি ছেলে ও চারটি মেয়ে। তাদের পেছনে পায়ের পাতার জলে ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে, মাথায় কাপড়ের টুপি ও কস্টিউম—পরা একজন পুরুষ প্রতিযোগী। তাঁর আচরণের মধ্যে কোনওরকম অধৈর্যের বা নার্ভাস হওয়ার ভাব প্রকাশ পাচ্ছে না। ইনি বলরাম গড়গড়ি। চারটি মেয়ের অন্যতম তুলসী। তার ভাই বাবু উৎকণ্ঠা আর উত্তেজনা নিয়ে দিদির দিকে তাকিয়ে। ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে জগন্নাথবাবু।
সকাল আটটা থেকে রাজ্য ট্রায়াথলন চ্যাম্পিয়নশিপ প্রথমে সাব—জুনিয়ার ছেলে ও মেয়েদের দিয়ে শুরু হয়। তারপর হয় জুনিয়ার ছেলে ও মেয়েদের। এখন শুরু হতে চলেছে সিনিয়ারদের প্রতিযোগিতা। অভিভাবক, সংগঠক, ভলান্টিয়ার আর দর্শকদের ভিড় ও ব্যস্ততায় সরোবরের দক্ষিণ দিকটা সরগরম। না উষ্ণ না শীতল। এমন একটা বাতাবরণ বিরাজ করছে সরোবর ঘিরে। ছুটির দিন; তাই প্রচুর মানুষ। তারা ব্যস্ত হয়ে পথ চলছে, ঘাসে বসে গল্প করছে অথবা জলে নেমে স্নান করছে। একটা কিছু প্রতিযোগিতা হচ্ছে জানতে পেরে বহু মানুষ ধারেকাছের বাড়ি থেকে এসে দর্শক হয়েছে।
শুরুর সঙ্গে সঙ্গে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রতিযোগীরা। বলরাম কোমর জলে নেমে গিয়ে সামনে তাকালেন। ষোলোজোড়া হাত ও পায়ের তাড়নায় জলে ফেনা কাটছে। ষোলোটি লাল টুপির মধ্যে ‘বাইশ নম্বর’ লেখা টুপিটিকে খুঁজলেন, কিন্তু দেখতে পেলেন না। একবার পেছনে তাকিয়ে খুঁজলেন ডাক্তারবাবুকে। বলেছিলেন তো আসবেন। অতঃপর সময় নষ্ট না করে তিনি জলের হাতে নিজেকে ছেড়ে দিলেন।
বড় দ্বীপটা প্রায় দেড়শো মিটার দূরে। বলরাম সেটিকে বেড় দিয়ে যখন ছোট দ্বীপটার দিকে যাচ্ছেন তখন সামনের ষোলো জনের ঝাঁক থেকে বেরিয়ে সাত—আটটি ছেলে এগিয়ে গেছে। সব থেকে পিছিয়ে থাকা সাঁতারুটির থেকেও বলরাম একশো মিটার পিছিয়ে। তিনি জানেন, ওদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার কোনও তাগিদ তাঁর নেই। তাঁকে দম আর ক্ষমতা সঞ্চয় করে রাখতে হবে।
তুলসী ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে না, সে সিনিয়ার মেয়েদের বিভাগের চারজনের একজন। তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাকি তিনজনের সঙ্গে এবং তার পূর্ব—অনুমান মতোই সে তাদের থেকে পিছিয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় দ্বীপ ছাড়িয়ে আরও প্রায় দুশো মিটার দূরের ফ্ল্যাগটার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় সে একবার মুখ তুলে দেখল অন্তত বারোটা লাল টুপি ফ্ল্যাগটাকে ঘুরে স্টার্টিং পয়েন্টে ফিরে যাচ্ছে। এখন তার পাশে শুধু দুটি ছেলে, যারা অর্ধেক পথ এসেই শ্রান্ত হয়ে পড়েছে। সে চেষ্টা করল ওদের টুপিতে ‘তিপ্পান্ন নম্বর’ লেখা আছে কি না দেখতে। কিন্তু দেখতে পেল না। দেখার কথাও নয়, কেননা বলরাম তখন তার প্রায় তিনশো মিটার পেছনে। তুলসী অন্য তিনটি মেয়ের নম্বর মনে করে রেখেছে। একুশ নম্বর একটু বেঁটে, পায়ের ডিমদুটো খুব পুষ্ট, নাকটা বসা। তেইশ নম্বর তারই মতো ছিপছিপে, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা, দাঁত উঁচু। চব্বিশ নম্বর বোধ হয় নেপালি মেয়ে, চোখ—মুখ গায়ের রং সেইরকমই। এরা তিনজনই এখন তার থেকে অনেক এগিয়ে।
বলরাম ফ্ল্যাগটাকে ঘুরে যখন প্রায় এক কিলোমিটার অতিক্রম করেছেন তখন প্রথম ছেলেটি সাঁতার শেষ করে জল থেকে উঠল এবং তার অর্ধ মিনিটের মধ্যে আরও সাতজন। এই সময় দেখলেন তাঁর সামনের ছেলেটি জলে ডুবে গিয়ে আবার ভেসে উঠল। দু’হাত তুলে মাথা নেড়ে হাঁ করছে আর ডুবছে। ডাঙায় দর্শকদের মধ্যে চাঞ্চল্য। একজন লাইফ সেভার জলে ঝাঁপিয়ে সাঁতারে ছেলেটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই দেখে বলরাম থমকে গেলেন। ছেলেটিকে ধরে লাইফ সেভার ডাঙার দিকে নিয়ে যাচ্ছে দেখে তিনি আবার সাঁতার শুরু করলেন।
তুলসী সাঁতার শেষ করল দুটি ছেলের সঙ্গে, কিন্তু তিনজন মেয়েরই পেছনে। জল থেকে উঠেই সে দৌড়ে গেল সাইকেলের দিকে। দ্রুত হাতে কস্টিউমের ওপরই পরে নিল হাফ প্যান্টটা, পায়ে পরে নিল কেডস জোড়া এবং গায়ে দিল গেঞ্জিটা। এক মিনিটের মধ্যেই তিনটি কাজ শেষ করে সে সাইকেলে চেপে বসল। তখন তেইশ নম্বর এক কিলোমিটার এগিয়ে গেছে এবং তার পেছনেই চব্বিশ ও একুশ নম্বর।
সকলের শেষে বলরাম জল থেকে উঠে দেখলেন বুকে ব্যাজ আঁটা চার—পাঁচজন লোক তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে। সবচেয়ে বর্ষীয়ান প্রতিযোগী হিসেবে ইতিমধ্যেই তিনি খ্যাত হয়ে গেছেন। তাঁর প্রতি একটু বেশিই যেন নজর দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁর মনে হল।
