সুভাষ সরোবর ওরা কেউই আগে দেখেনি। প্রথম দর্শনেই তুলসী বলল, ”মেসোমশাই, এটা কিন্তু রানিসায়রের থেকে অনেক বড়।”
”হোক না বড়, সেজন্য দেড় কিলোমিটারের বেশি তো আর সাঁতরাতে হবে না।”
সরোবরটি গোল বা চৌকো নয়, কিছুটা ডিম্বাকৃতির। এর পূবে একটি বড় এবং পশ্চিমে অপেক্ষাকৃত একটি ছোট দ্বীপ রয়েছে। ওই দ্বীপ দুটিতে হরিণ রাখা ছিল। এখন আর নেই। রানিসায়রের ঘাট বলতে যা বোঝায়, এখানেও সেইরকম। পাড় থেকে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া ভাঙাচোরা জমি, সেটাই হল প্রতিযোগিতার প্রথম বিষয় সাঁতারের শুরুর জায়গা। সংগঠকরা সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন, সাব—জুনিয়ার, জুনিয়ার ও সিনিয়ারদের কোন পথ ধরে কতটা সাঁতরাতে হবে। সিনিয়ারদের অর্থাৎ তুলসী ও বলরামকে প্রথমে বড় দ্বীপটা বেড় দিয়ে বাঁদিকে পশ্চিমে ছোট দ্বীপের দিকে যেতে হবে। ছোট দ্বীপটিকেও বেড় দিয়ে আরও এগিয়ে ভাসমান একটি পতাকা ঘুরে আবার ফিরে আসতে হবে শুরুর এই জায়গায়। মোট দেড় কিলোমিটার সাঁতার কেটে জল থেকেই উঠেই প্রায় তিরিশ মিটার ছুটে গিয়ে উঠতে হবে সাইকেলে। তার মধ্যেই চটপট পরে নিতে হবে জুতো আর একটা গেঞ্জি। নম্বর লেখা সাঁতারের টুপিটা অবশ্য মাথায় বাঁধাই থাকবে।
সরোবর বেড় দিয়ে যে আড়াই কিলোমিটার পিচের রাস্তা, তাই ধরে সাইকেলে তাদের ষোলোবার পাক দিতে হবে। ওরা সবাই চাক্ষুষ করবার জন্য রাস্তা ধরে হাঁটল। সাইকেল চালাবার পর এই রাস্তা ধরেই তাদের দৌড়তে হবে চারপাক। রাস্তাটি, বলরামের মনে হল, বিদ্যানগরের থেকে অনেক ভাল। তবে অনেক জায়গায় ভাঙাও রয়েছে। কিন্তু যে জিনিসটি তাঁর কাছে মসৃণ গতিতে স্থিরভাবে সাইকেল চালাবার পথে বিঘ্নকারী বলে মনে হল, সেটি হচ্ছে স্পিড ব্রেকার।
”মেসোমশাই, ওই দেখুন, সল্ট লেক স্টেডিয়াম দেখা যাচ্ছে।” রাস্তা দেখার থেকেও তুলসীর চোখ আশপাশের দিকেই বেশি। ”আপনি ওখানে কখনও খেলা দেখেছেন? আমি দেখিনি। খুব ইচ্ছে করে, একবার অন্তত রাত্রে একটা ফুটবল ম্যাচ দেখতে।”
”কিন্তু এখন ভাল করে দেখে নাও এই স্পিড ব্রেকারগুলোকে। ফুটবল ম্যাচ দেখার কথা পরে ভেবো। এই দ্যাখো”, বলরাম আঙুল দিয়ে দেখালেন, রাস্তার মাঝে আড়াআড়ি স্ফীত হয়ে থাকা জায়গাটি।
”অসুবিধের তো কিছু নেই।” তুলসীর সহজ ও সরল স্বর বুঝিয়ে দিল স্পিড ব্রেকার কোনও সমস্যা নয় তার কাছে। ”স্পিড কমিয়ে সাইকেল আস্তে করে নিলেই হবে। কেমন রাস্তা দিয়ে কুলডাঙা থেকে যাতায়াত করতে হয় তা তো জানেন। আচ্ছা মেসোমশাই, এটা কীসের মন্দির বলুন তো?”
”গিয়ে দেখে এসো।”
রাস্তা থেকে সরোবরে দিকের জমিতে সাদা একটি মন্দির গৃহ। তুলসী ছুটে গিয়ে ভেতরে উঁকি দিয়েই ফিরে এল।
”লেখা রয়েছে লোকেশ্বর বাবার পুরাতন মন্দির। ভেতরে শিবলিঙ্গ। হনুমান মূর্তিও রয়েছে। আচ্ছা মেসোমশাই, আপনি ভগবান মানেন?”
”মানি না, তবে কাল মানব।”
”আপনি কি কাল নামছেন?”
”হ্যাঁ।” বলেই তুলসীর মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলেন, এখনও বিশ্বাস করেনি।
”আচ্ছা, এই যে বিরাট বিরাট কংক্রিটের এত পাইপ পড়ে রয়েছে, এগুলো কী জন্য?”
তুলসীর কৌতূহল মেটাবার চেষ্টা না করে বলরাম তার নজর টেনে বললেন, ”রাস্তাটা দ্যাখো, এখানেও একটা স্পিড ব্রেকার।”
তুলসী দেখে বলল, ”এসব এখন দেখে কী হবে মেসোমশাই, যখন চালাব তখন চোখ রেখেই চালাব। সরোবরের এই দিকটা দেখে আমার কিন্তু রানিসায়রের কথা মনে পড়ছে। বেলা হলে রানিসায়রে চান করার জন্য যেরকম লোক হয়, গোরু—বাছুর এনে গা ধোওয়ায়, তাকিয়ে দেখুন অনেকটা সেইরকম। ওরে বাবা কতগুলো মোষও রয়েছে, কেন জানি এদের আমার খুব ভয় করে। আচ্ছা, মোষেরা কি খুব হিংস্র হয়?”
”বোধ হয়, হয়। শুনেছ তো, ওঁরা বললেন আজ রাত্রে এখানে সাইকেল রাখার ব্যবস্থা আছে। তুমি সঙ্গে করে আনলে না কেন? তা হলে আর কাল সকালে ট্রেনে চড়িয়ে আসতে হবে না।”
তুলসী মুচকি হেসে বলল, ”সে ব্যবস্থা আমার কাছে। এখানে জগন্নাথকাকার ভাগ্নি অনুদির বাড়িতে আজ রাতে আমি আর ভাই থাকব। সাইকেল নিয়ে আজই রাতের ট্রেনে চলে আসব।”
বলরাম ভাবলেন, সাইকেল এনে রেখে দিয়ে আবার তাঁর বিদ্যানগর ফিরে যাওয়ার থেকে বরং কাল প্রথম ট্রেনেই ভেণ্ডার কামরায় উঠে চলে আসাই ভাল। রোজই তো ভোরে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোন, সুতরাং বিমলা বুঝতেই পারবে না কোথায় যাচ্ছি। নিশ্চয়ই দুপুরের মধ্যেই বাড়ি ফিরে যাওয়া যাবে। দোকান—বাজার আজ রাতেই সেরে রাখতে হবে।
”মেসোমশাই, এই দেখুন একটা মসজিদ। জলের এপারে আর ওপারে মুখোমুখি মন্দির আর মসজিদ, অদ্ভুত নয়?”
”তুলসী, কাল তোমাকে যাদের সঙ্গে পাল্লা দিতে হবে তাদের সম্পর্কে কোনও খোঁজখবর কি নিয়েছ? এই যে কুড়ি—পঁচিশজন মেয়েকে দেখছি, এদের মধ্যে মনে হচ্ছে সিনিয়ার মেয়ে খুবই কম, সাত—আটজন বড়জোর। তোমার কী মনে হচ্ছে ওদের দেখে?”
”কিছুই মনে হচ্ছে না।” নির্বিকার মুখে তুলসী বলল। ”আগে থাকতে মনের মধ্যে ভয় ধরিয়ে রাখলে সেটা ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেড়েই যায়। তিনটে বিষয়ে কম্পিটিশন, সবাই তিনটেতে দড় হবে আপনি কি তাই মনে করেন?”
”না।”
”সাঁতারে কলকাতার মেয়েরা ভাল। ওরা রেগুলার শেখে, প্র্যাকটিস করে, কম্পিটিশনে নামে। আমি শিখিনি, কম্পিটিশনে কখনও নামিনি। আমি জানি সাঁতারে আমি পিছিয়ে থাকব, কিন্তু সাইকেলে আমি অনেকটা মেক—আপ করে নেব। মাঝের এটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। তবে আমার ভরসা রানিং। দশ কিলোমিটার দৌড়েছি তো, আমি জানি কীভাবে দৌড়তে হবে। আমুদার কথা মনে আছে আপনার?”
