তুলসী এবং বলরাম একই দিনে খবর পেলেন, রাজা ট্রায়াথলন চ্যাম্পিয়ানশিপ হবে কলকাতার পুবে বেলেঘাটায় সুভাষ সরোবরে, ডিসেম্বরের উনিশ তারিখ রবিবারে।
বলরামকে খবরটা দিলেন মনোজ সামন্ত।
”গড়গড়িদা, আপনাকে ডাক্তারবাবু দেখা করতে বলেছেন, পারলে আজই। উনি ফর্ম আনিয়ে রেখেছেন। আপনি আমাদের সামন্তপুর স্পোর্টিংয়ের হয়ে ট্রায়াথলনে নামবেন।”
”তা হলে ছুটির পর তোমার সঙ্গেই যাব। ওঁর বাড়ি তো আমি জানি না।”
মনোজের সঙ্গেই বলরাম ডাক্তারবাবুর চেম্বারে পৌঁছলেন। রোগীতে তখন অপেক্ষার ঘর ভর্তি। বাইরেও অনেকে দাঁড়িয়ে। মনোজ চেম্বারের মধ্যে ঢুকে আধ মিনিটেই বেরিয়ে এসে বলরামকে হাত নেড়ে ডাকলেন। ডাক্তারবাবুর সামনে তখন এক মহিলা তাঁর অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে বসে।
”আপনার এন্ট্রি ফর্ম”—ডাক্তারবাবু ড্রয়ার খুলে ব্যস্তভাবে ফর্ম বের করলেন। ”কোনও এন্ট্রি ফি নেই। স্পোর্টসটা পপুলারাইজ করার জন্যই ওরা কোনও ফি নিচ্ছে না। ডাক্তারের সার্টিফিকেট লাগবে, সেজন্য তো আমি আছিই। আর সাইক্লিং ইভেন্টের জন্য মাথায় দিতে হবে একটা সেফটি হেলমেট। জোগাড় করতে পারবেন?”
বলরাম অসহায়ভাবে মাথা নাড়লেন। ”এ জিনিস আমি পাব কোথায়?”
ডাক্তারবাবু কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে বললেন, ”অবশ্য না হলেও চলবে। একেবারে নতুন স্পোর্টস তো, ওরা বলেছে এটাকে পপুলার করার জন্য নিয়মকানুনের কড়াকড়ি করবে না। নিজের রিসকে কেউ যদি হেলমেট ছাড়াই সাইকেল চালায় তো চালাক, আপনি এই ওয়েভার অ্যান্ড ইনডেমনিটি ফর্মটায় সই করে দিন। মারা গেলে, পঙ্গু হয়ে গেলে, কি কোনও জিনিস হারালে সেজন্য স্টেট অ্যাসোসিয়েশন দায়ী থাকবে না বলে এতে লেখা আছে।”
বলরাম দু’পাতা জোড়া ইংরেজি ফর্ম না পড়েই সই করে দিলেন। ডাক্তারবাবু ফর্মটা আবার ড্রয়ারে রেখে বললেন, ”কিছু জানাবার থাকলে মনোজবাবুকে দিয়ে খবর দেব, আর উনিশে ডিসেম্বর আমি নিজে সুভাষ সরোবরে থাকব।”
ডাক্তারবাবুর চেম্বার থেকে বলরাম যখন বেরোলেন, তুলসীও তখন জগন্নাথবাবুর বসার ঘর থেকে বেরোনোর জন্য সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে।
”অনুকে তো তুই জানিস, আমার ভাগ্নি। ওর শ্বশুরবাড়ি সুভাষ সরোবরে খুব কাছে, হেঁটে তিন—চার মিনিট। আমি ফোন করে বলে রাখব, আগের দিন রাতে ওর বাড়িতে গিয়ে থাকবি। সাইকেলটা সঙ্গে নিয়ে যেতে ভুলিস না।”
তুলসী হেসে মাথা নাড়ল। ”আর যে ভুলই করি না কেন, এটা করব না।”
”কম্পিটিশনের আগের দিন সকালে কিন্তু অবশ্যই সুভাষ সরোবরে যাবি। সব কম্পিটিটারদের ওরা নিয়মকানুন আর রুট বুঝিয়ে দেবে। এটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। চিনে যেতে পারবি তো?”
”পারব। আপনি অনুদির ঠিকানাটা দিন। গ্রামে থাকি বলে কলকাতা চিনি না নাকি? কম্পিটিশনের দিন আপনি ওখানে থাকবেন তো কাকাবাবু?” তুলসী অসহায় চোখে তাকাল। এই ট্রায়াথলন তার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হতে চলেছে। একদম একা হয়ে, নিজের পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে, ভরসা পাওয়ার মতো একটা চেনা মুখও যদি তখন থাকে, তা হলে মনে কিছুটা জোর সে পাবে। কিন্তু সেখানে হাজির থাকার জন্য কাকে সে পাবে? ছোট ভাই বাবু ছাড়া এখান থেকে যাওয়ার মতো আর একজনই, এই জগন্নাথকাকা।
”যাব না মানে?” ঠাণ্ডা মাথায় জগন্নাথবাবু উত্তেজিত স্বরে বললেন। ”আমাদের স্পোর্টস কমিটিতে দু—তিনজন কথা তুলেছে ট্রায়াথলনে আবার রিক্রুট করা কেন? আমার নাকি মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমার মাথা যে ঠিক আছে, সেটা তোকে প্রমাণ করে দিতে হবে। দিল্লি থেকে বোর্ডের অ্যাপ্রুভাল আমি পেয়ে যাব। এখন বোর্ডে যিনি সেক্রেটারি তাঁর আউটলুকটা খুব মডার্ন, খেলার সব খবরাখবর রাখেন। এই রাজ্যে কোনও ট্রায়াথলনিস্ট এখনও কোথাও চাকরি পায়নি। আমার অফিস প্রথম চাকরি দেবে, এটাই হবে আমার সাফল্য।” জগন্নাথবাবু বাঁ হাতের তালুতে ডান হাতের ঘুসি মারলেন।
স্টেট চ্যাম্পিয়ানশিপের আগের দিন বলরাম বাজার করে দিয়ে বাড়ি থেকে বেরোলেন সকাল সাতটায়। শনিবার তাঁর অফিস বন্ধ। তিনি লেভেলক্রসিং থেকে দেখতে পেলেন কলকাতার দিকে একটা ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। ওই ট্রেনেই উঠেছে তুলসী। সে জানত না, বলরামও ট্রায়াথলনের একজন প্রতিযোগী। তাই সুভাষ সরোবরে স্পোর্টস কাউন্সিলের সুইমিং পুলে জমায়েত ছোট—বড় মিলিয়ে বয়সভিত্তিক তিনটি বিভাগের ষাট—সত্তরজন প্রতিযোগীর মধ্যে হঠাৎ বলরামকে দেখতে পেয়ে সে ভীষণ অবাক হয়ে গেল।
”মেসোমশাই, আপনি এখানে?”
প্রথমে বলরাম অস্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেন। তারপর মনে হল, আর গোপন রেখে কোনও লাভ নেই। কালই তো তুলসী দেখতে পাবে এই প্রতিযোগিতায় তিনিও একজন প্রতিযোগী। এবার সত্যি কথাটা বলে দেওয়াই ভাল।
”আমি তো কাল এখানে নামছি।”
”যাঃ।” তুলসী বিশ্বাস করল না। বলরাম মুহূর্তের জন্য বেদনা বোধ করলেন। তাঁর যোগ্যতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করছে। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বুঝলেন, তুলসীর অবিশ্বাস করাটা খুবই স্বাভাবিক। ট্রায়াথলনের মতো কষ্টসাধ্য খেলায় এদেশে তাঁর মতো বয়সের কেউ যে নামতে পারে, কে সেকথা বিশ্বাস করবে?
”বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি, বেশ, কালই দেখতে পাবে।”
”বেশ, দেখব।” তুলসী হেসে বলল বটে, কিন্তু ওর মুখ দেখে বলরাম বুঝলেন, তাঁর নামার কথাটাকে ঠাট্টা হিসেবেই নিয়েছে।
