”দেখুন, এটা নিয়ে একটা কম্পিটিশনে নামব। জোড়াতালি দিয়ে সারালে ভেঙে যাবে না তো?”
”কীরকম কম্পিটিশন সেটা, যাতে এই সাইকেল নিয়ে নামার কথা ভাবছেন?” জটাধারী অবিশ্বাসভরে তাকিয়ে রইল।
অস্বস্তিতে পড়ল তুলসী। এই লোককে এখন ট্রায়াথালন ব্যাপারটা বোঝানোর সময় তার নেই। বাড়ি ফিরতে হবে চার মাইল হেঁটে বা দৌড়ে।
তুলসীর মুখ দেখে জটাধারীর মনে হল, মাঠে বা রাস্তা বন্ধ করে যেসব অবিরাম সাইকেল চালানোর প্রতিযোগিতা হয়, তেমন কিছুতে বোধহয় নামবে। তাছাড়া সাইকেল কম্পিটিশন, তাও এইরকম সাইকেলে চড়ে, এ রাজ্যে কোথাও হয়ে থাকে বলে তো সে শোনেনি। তুলসীকে আশ্বস্ত করার জন্য সে বলল, ”চলে যাবে। পঁচিশ—তিরিশ ঘণ্টা টানা চালালেও কিছু হবে না। ও ব্যাপারে গ্যারান্টি দিচ্ছি।”
”ঠিক তো?”
”ঠিক।”
”তা হলে যা বললেন ওইভাবেই করে দিন। পাঁচশোর বেশি দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। আমি কখন পাব?”
”কাল নয়, পরশু এই সময় আসুন। কাল কলকাতায় গিয়ে জিনিসপত্র কিনব। আর একটা কথা, ভাল কন্ডিশনে যদি সেকেন্ড হ্যান্ড পার্টস পাই, আনব কি? এতে টাকা বাঁচবে।”
”আনুন। আমি কিন্তু পরশু ঠিক রাত আটটায় আসছি।”
.
বলরাম রাত থাকতেই বিছানা থেকে ওঠেন। ঘড়ি ধরে সাড়ে চারটের সময়, তাঁর ছেলে বলাইয়ের পরিত্যক্ত একটা পশমের টুপি মাথায় বসিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরোন। তিনি যান বিদ্যানগর স্টেশনের দিকে। লেভেলক্রসিং পেরিয়ে আরও পশ্চিমের বি.টি. রোডে পৌঁছন। অতঃপর বাঁ দিকে ঘুরে, ফাঁকা মসৃণ রাস্তায় বেশ জোরে চালিয়েই বরানগরে টবিন রোড পর্যন্ত এলে পঁচিশ মিনিট সময় সম্পূর্ণ হয়। দূরত্ব ক্রমশ বাড়িয়ে আপাতত তিনি এই পর্যন্ত আসছেন। তারপর আবার একই পথ ধরে তিনি ফিরে আসেন। ঠিক পঞ্চাশ মিনিটে তিনি রামপ্রসাদ হস্টেলের সামনে এসে পৌঁছন এবং না থেমে আরও চোদ্দো মিনিটে কুলডাঙায় এবং রানিসায়রে। ঘড়ি ধরে এক ঘণ্টা চার মিনিটে তিনি সাইকেলের ওপরে থাকেন। অবশ্য কয়েক মিনিটের হেরফের কোনও কোনওদিন হয়। তাঁর লক্ষ্য সাইক্লিংয়ের সময়টাকে দেড়ঘণ্টা করা। এজন্য তিনি নিজেকে পাঁচদিন সময় দিয়েছেন।
একঘণ্টা সাইকেল চালিয়ে আসার পর রানিসায়রে পারাপার তাঁর কাছে কষ্টকর হয়। তিনি জানেন পারাপারে যতটা দূরত্ব, প্রায় ততটাই তাঁকে ট্রায়াথলনে অতিক্রম করতে হবে। গঙ্গার স্রোতের সঙ্গে সাঁতরানো আর স্থির জলে সাঁতার কাটার মধ্যে শারীরিক তাগদের পার্থক্য ঘটে। তাই ওপারে গিয়ে ফিরে আসার সময় তাঁর হাত ভার লাগে, সায়রের মাঝামাঝি বিশ্রাম নেওয়ার জন্য থেমে যান। কিছুক্ষণ জলে ভেসে থেকে আবার সাঁতার শুরু করেন। কিন্তু তাঁকে না থেমে পারাপার করতেই হবে যত মন্থরভাবেই হোক না কেন। এজন্য তিনি নিজেকে সারাদিন সময় দিয়েছেন।
বলরাম রানিসায়র থেকে ফিরে যাওয়ার আগেই তুলসী বাড়ির সামনে সাইক্লিং শেষ করে। সাইকেলটা বাবুর হাতে দিয়েই সে দৌড় শুরু করে। বাবু সাইকেল চালিয়ে দিদির সঙ্গে রাইহাটা পর্যন্ত মাইল তিনেক গিয়ে আবার তার সঙ্গেই ফিরে আসে।
জটাধারী কথামতো নির্দিষ্ট দিনেই সাইকেল মেরামত করে তুলসীকে দিয়েছিলেন। দেওয়ার সময় বলেছিলেন, ”দেখবেন দিদি, এই সাইকেলই কম্পিটিশনে আপনাকে ফার্স্ট করে দেবে।” শুনে তুলসীর মন খুশিতে ভরে গেছিল। সাইকেলের কিছু কিছু অংশ জটাধারী বদলে দিয়েছেন, কয়েক জায়গায় ঝালাই করেছেন। দুটো মাডগার্ডে এবং রডগুলোর কালো রংও করে দিয়েছেন, যেটা করার কথা ছিল না।
বলরাম কাউকে জানাতে চান না যে, তিনি ট্রায়াথলনের নামতে চান এবং সেজন্য নিজেকে তৈরি করছেন। যেহেতু তিনি মনে করেন, লোকে এ—কথা জানলে হাসবে বা আড়ালে হাসাহাসি করবে। এমনিতেই তো তাঁর চেহারা আর হাঁটা নিয়ে লোকে হাসত। হাঁটাটা সংযত করেছেন। কেউ আর তাঁর দিকে এখন তাকায় না। কিন্তু ট্রায়াথলনে নামবেন শুনলে আবার হাসিটা শুরু হয়ে যাবে। তুলসীকেও তিনি বলেননি। কথায় কথায় পাছে বলে ফেলেন, সেজন্য তিনি ওর সঙ্গে দেখা করেন না, বাড়িতে গিয়ে খবরও নেন না। রানিসায়রে যাওয়ার একটা নতুন পথ তিনি বের করে ফেলেছেন, যেটা তুলসীদের বাড়ির ত্রিসীমানায় নয়। তিনি জানেন, আমুদার ট্রেনিংসূচি তুলসী অনুসরণ করবে। সে ভোরে সাইকেল আর দৌড় নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, রানিসায়রে আসবে বিকেলে। তাই তিনি সাইক্লিং সেরে ভোরেই রানিসায়রে আসেন। তাঁদের মধ্যে আর দেখা হয় না।
বলরাম দৌড়চ্ছেন রাতে। ধাক্কাধাক্কি করে ট্রেনে উঠে তিনি অফিস থেকে সাড়ে ছ’টার মধ্যে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেন। আটটায় তিনি বাড়ি থেকে দৌড়তে বেরোন। এজন্য তিনি নতুন কেডস, হাফ প্যান্ট এবং স্পোর্টস গেঞ্জি কিনেছেন। মাথায় পশমের টুপিটা পরে তিনি ছুটতে যান গ্রামের দিকে, যেখানে রাত্রে রাস্তায় লোক প্রায় থাকেই না।
কিছু আলো—জ্বলা দোকান পথে পড়ে। দোকানে যারা থাকে, মুখ ফিরিয়ে তাঁর দিকে তাকায়। আর কিছু নয়। পথচলতি মানুষরাও তাকায়। বলরাম অন্ধকারে হোঁচট খান, গর্তে পা পড়ে, খোয়া, ইট পায়ে ফোটে। মাঝে মাঝে হাতঘড়ি দ্যাখেন আর একই গতিতে ছুটতে থাকেন এবং গতিটি খুবই মন্থর। তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। দাঁড়িয়ে হাঁপান। সারা শরীর অবসন্ন লাগে। সকালে সাইকেল, সাঁতার, অফিস করা, ট্রেনের ভিড় আর ধাক্কাধাক্কি; তারপর রাতে এই ছোটা। এক একসময় রাস্তার ধারের গাছে দু’হাতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে তিনি জিরোন। তিনি জানেন, প্রথম হওয়ার জন্য তিনি ট্রায়াথলনে নামতে চান না। আর এই বয়সে তা সম্ভবও নয়। তিনি চান সমাপ্ত করতে, সকলের শেষে পৌঁছেও।
