”আয়রনই হোক আর টিনই হোক, লোকে তো স্বেচ্ছায় পরীক্ষা দিতে কম্পিটিশনে নামছে।” বলরাম গম্ভীর স্বরে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করলেন।
”নামছে বলে নামছে।” মনোজের দুই চোখের মণি বিস্ফারিত হল। ”শ’য়ে—শ’য়ে ট্রায়াথলন বছরে হচ্ছে পৃথিবীর বহু দেশে, আর আমরাই এ—সম্পর্কে কিছু জানি না। আর লোক বলতে শুধু কি পুরুষ? মেয়েরাও আয়রনম্যান—এ নামছে। কোথায় পড়ে আছি আমরা।” মনোজ মাথা নেড়ে আক্ষেপের সঙ্গে চুকচুক ধরনের একটা শব্দ মুখ দিয়ে বের করলেন।
বলরাম সান্ত্বনা দেবার মতো করে বললেন, ”আমাদের দেশে শুরু হোক, দেখবে প্রচুর ছেলেমেয়ে নামবে। দুঃখ হয় কী জানো, এসব স্পোর্টস আমাদের অল্পবয়সে ছিল না।”
”ছিল না তো কী হয়েছে, এখন তো হয়েছে। আপনি নামুন।”
”আমি নামব?” বলরাম হেসে উঠতে গিয়েও হাসলেন না। শুধু মাথা নাড়লেন, ”এত কঠিন পরীক্ষা এই বয়সে শরীর দিতে পারবে না।”
মনোজের মুখ এবার হাসিতে উদ্ভাসিত হল। ”পারবে না বলছেন? তা হলে এই বছরেরই গোড়ায় মাদ্রাজে যে ন্যাশনাল ট্রায়াথলন চ্যাম্পিয়ানশিপ হল, তার সঙ্গেই হল এশিয়ান কাপ সিরিজের প্রথম দফায় কম্পিটিশন। তাতে নেমেছিলেন জাপান ট্রায়াথলন ফেডারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাঁর বয়স কত জানেন?” মনোজ একটা নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি করলেন। ”বলুন, কত হতে পারে?”
বলরাম বুঝলেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট মশাই অবশ্যই বয়স্ক, নয়তো মনোজ রহস্যময় করে তুলত না প্রশ্নটাকে। ”কত হবে বলব কী করে, এই ধরো পঞ্চাশ—বাহান্ন।” বলরাম যথাসাধ্য বাড়িয়েই বললেন।
”বাহাত্তর।”
বলরামের বিস্ময়ে কোনও ভেজাল নেই। তিনি শুধু ”অ্যাঁ” বলে তাকিয়ে রইলেন।
”অ্যাঁ নয়, সত্যিই। বুড়ো পুরো ফিনিশ করেছে, তবে সবার শেষে।” মনোজের গলায় প্রচ্ছন্ন একটা শ্রদ্ধা আবিষ্কার করলেন বলরাম বাহাত্তর বছরের এক জাপানির জন্য।
”এই যে পঞ্চাশ—বাহান্ন বললেন, আমেরিকার একটি লোক তাঁর বাহান্নতম জন্মদিনের বছরটা পালন করেছেন কীভাবে জানেন?” মনোজ উত্তেজিত দৃষ্টিতে বলরামের দিকে তাকিয়ে রইল উত্তরের জন্য।
”আমি কী করে জানব? ডাক্তারবাবুর সঙ্গে তো আমার কথা হয়নি।”
”বাহান্নটা ট্রায়াথলনে কম্পিট করে। তার মানে হপ্তায় একটা করে। চোখ বুজে ব্যাপারটা ভাবুন তো। আমরা পারব?”
”লোকটাকে কি লোকাল ট্রেনে ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে কেরানির চাকরি করতে হয়?”
মনোজ থতমত হয়ে আমতা আমতা করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, সুযোগ না দিয়ে বলরাম বললেন, ”সবসময় ওই ডেভেলাপড কান্ট্রির লোকেদের সঙ্গে আমাদের মতো পিছিয়ে থাকা গরিব দেশের তুলনা কোরো না; নিজেদের ছোট চোখে দেখা উচিত নয়।”
বলরামের চাহনিতে এমন কিছু একটা রয়েছে, যেটা মনোজের মাথা নত করে দিল। টেবিলের ড্রয়ার খুলে তিনি কলম, পিন—কুশন, পেপার—ওয়েট ইত্যাদি বের করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতে লাগলেন।
”মনোজ, কোথাও যদি ট্রায়াথলন হয় আমি নামব। কথাটা কিন্তু এখন কাউকে বোলো না, তবে ডাক্তারবাবুকে জানিয়ে দিয়ো।”
বলরাম তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা বিমলাকেও জানাননি। তুলসীকেও নয়।
.
স্পোর্টস টাইম পত্রিকাটি নামিয়ে রেখে জগন্নাথবাবু বললেন, ”এতে তো যা জানার তা সবই রয়েছে। তুই ভাল করে তা হলে প্র্যাকটিস শুরু কর।”
”শুরু মোটামুটি করেছি। সাইকেলটা মেরামত করতে দিয়েছি ওপারে জটাধারী রিপেয়ারিং শপে। কাল পরশু দেবে। ভোরে এখন সাইকেলের বদলে দৌড়চ্ছি। আমাদের ভেতর দিকে চালতাতলা, রাইহাটা, দেবীপুর যাওয়ার রাস্তাটা পাকা, ভাঙাচোরা নয়। ওটা ধরে গত দু’দিন একঘণ্টা দৌড়ে এসে, জলে নেমে দু’বার রানিসায়রটা এপার—ওপার করেছি।” যেন অনুমোদন চায় এমনভাবে তুলসী তাকিয়ে রইল জগন্নাথবাবুর দিকে। তিনি মাথা নেড়ে বোঝালেন সন্তুষ্ট হয়েছেন।
”তবে সাইকেলটা পেলে আগে সাইকেল তারপর দৌড়, যেভাবে আমুদা করে। আর বিকেলে সাঁতার। সকালে দৌড়বার আগে কিছু খেয়ে নিস। খালি পেটে দৌড়বি না, ভেজানো ছোলা বা বাদাম খাবি।”
তুলসী মাথা নাড়ল।
”খবর নিয়েছি, ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ট্রায়াথলনের স্টেট চ্যাম্পিয়ানশিপ হবে। এন্ট্রি ফর্ম আনাবার ব্যবস্থা করে রেখেছি, বিডন স্ট্রিটে আমাদের অফিসের একটা ছেলে থাকে। তুই এখন বাড়ি যাবি কী করে, সাইকেলটা তো নেই।”
”হাঁটব। বিদ্যাসাগর ছাড়লেই তো অন্ধকার, তখন ছুটব।”
জগন্নাথবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে তুলসী এল জটাধারী হালদারের রিপেয়ারিং শপে।
”কতদূর হল জটুবাবু? কাল পাব তো?”
সিলিং থেকে চেন দিয়ে ঝোলানো একটা সাইকেল, তার দুটি চাকাই খোলা। জটাধারী সেটি নিয়ে ব্যস্ত। তুলসীর দিকে না তাকিয়েই বলল, ”যা বদলাতে হবে তাতে পাঁচশো টাকার বেশি পড়ে যাবে। হ্যান্ডেলের নীচের রডটা মরচে ধরে ক্ষয়ে গেছে, চেনটা পালটাতে হবে, পেছনের ব্রেক কাজ করে না, সামনের চাকার রিমটা তো গেছে, দুটো স্পোক ভাঙা। চালাতেন কী করে। খুব কম করে আরও তিন—চারশো টাকা লাগবে। বলেন তো করে দিচ্ছি। আর নয়তো ঝালাই করে জোড়া লাগিয়ে কাজ চলার মতো করে দিতে পারি। পাঁচশোর মধ্যেই হয়ে যাবে। এবার বলুন, কী করবেন?”
বিপন্ন বোধ করল তুলসী। আরও তিন চারশো টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া, ‘কাজ চলার মতো’ বলতেই বা কী বোঝায়?
