”কিন্তু মেসোমশাই, এই পত্রিকাটি যে ইংরেজিতে লেখা।” অবশেষে তুলসী তার বাক্যটি সম্পূর্ণ বলতে পারল।
”কিন্তু তুমি তো উচচ মাধ্যমিক পাস।”
”তা হলেই কি ইংরেজি পড়ে মানে বুঝতে পারব? পড়ার বইয়ের বাইরে তো পড়েছি শুধু নোটবই।”
বলরামকে অপ্রতিভ দেখাল। ”তা বটে, তা বটে। তা হলে বাবাকে ধরো। ওঁকে দিয়ে মানে করে নিয়ো। মোটকথা, এটা তোমায় পড়তেই হবে।”
বাড়ি থেকে বাবু বেরিয়ে এসে বলল, ”মা চা কচ্ছে, মেসোমশাই খেয়ে যাবেন।”
”অবশ্যই। আজ আর ইচ্ছে করছে না, কাল থেকে রানিসায়রে যাব। আর তুলসী, তুমিও কাল থেকে লেগে পড়ো। ভোরে সাইকেল নিয়ে—” বলরাম থেমে গেলেন তুলসীর মুখভাব দেখে।
”সাইকেলটা না সারিয়ে, চল্লিশ কিলোমিটার, মানে চব্বিশ মাইল, ওটা দিয়ে চালানো সম্ভব নয়।”
বলরামের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। খুব দ্রুত কী যেন ভেবে নিলেন।
”টেপরেকর্ডারটা কোথায়, বাড়িতে আছে?”
”হ্যাঁ।”
”ওটা নিয়ে যাব। মনে হয় খদ্দের একজন আছে।”
তুলসী বাড়ি থেকে টেপরেকর্ডার—ভরা বাক্সটা আনল, আর বাবু আনল কাপে ভরা চা।
বলরাম চা খেয়ে সাইকেলে ওঠার সময় বললেন, ”জগন্নাথকাকার কাছে আজকালের মধ্যেই যেয়ো। ট্রায়াথলন কোথাও হচ্ছে কি না জানার জন্য আমিও খোঁজ নেব।”
বাড়ি পৌঁছে বলরাম টেপরেকর্ডারটা বিমলার হাতে দিয়ে বললেন, ”তোমার জন্য আনলাম। খুব সস্তায়, মাত্র আড়াইশো টাকায় পেয়েছি। তুমি তো নাটক শুনতে ভালবাস, কালই সিরাজ—উদ—দৌলার ক্যাসেট এনে দেব।”
অফিসে তিনি মনোজ সামন্তর কাছে খোঁজ নিলেন। ”ট্রায়াথলন ব্যাপারটা কী তুমি জানো? এখানে কোনও ক্লাব আছে কি?”
মনোজ জানালেন, জীবনে এই প্রথম শব্দটা শুনলেন। ”তবে দোতলায় বিল্ডিং সেকশনের সমরেশবাবু ক্লাবটাব করেন, উনি হয়তো জানতে পারেন।”
একসময় বলরাম দোতলায় বিল্ডিং সেকশনে গিয়ে সমরেশবাবুকে ধরলেন। ”আপনি তো খেলাধুলোর লাইনে আছেন, বলতে পারেন ট্রায়াথলনের কোনও ক্লাব এখানে আছে কি না, বা কম্পিটিশন হয় কি না?”
সমরেশবাবু তখন খুবই ব্যস্ত অফিস এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের দু’জন কর্তার সঙ্গে আলোচনায়। খুব সংক্ষেপে তিনি বলরামকে জানালেন, ”ক্লাব আছে কি না বলতে পারব না, তবে একটা অ্যাসোসিয়েশন আছে, স্টেট চ্যাম্পয়ানশিপও নাকি করেছে। ওদের অফিস বোধহয় বিডন স্ট্রিটে। এর বেশি কিছু জানি না।”
বলরাম চেয়ারে ফিরে আসতেই মনোজ সামন্ত জিজ্ঞেস করলেন, ”খোঁজ পেলেন?”
”শুধু বললেন, বিডন স্ট্রিটে নাকি অ্যাসোসিয়েশন আছে।”
”আচ্ছা আমি সামন্তপুরে আমাদের ক্লাবে খোঁজ নেব। আমাদের প্রেসিডেন্ট ডাক্তার পাত্র খেলাটেলার খুব খবর রাখেন, বইটইও পড়েন, ওঁকেই বরং জিজ্ঞেস করব।”
”আর একটা কথা জানার আছে, সামন্ত। একটা টেপরেকর্ডারের দাম কত পড়বে বলতে পারো?”
”নানা দামের আছে। আটশো, হাজার, দেড় হাজার, দু’হাজার…কিনবেন তো? তা হলে একটু বেশি দামেরটাই—।”
”আরে না না, কিনব না। একজন বেচবে। এই মোটা একটা বইয়ের মতো দেখতে, বোধ হয় সস্তা দামেরই হবে। শ’পাঁচেক টাকা চাইলে অন্যায় হবে না, ব্র্যান্ড নিউ। কী বলো?”
পরদিন সকালে তুলসীদের বাড়িতে গিয়ে বলরাম পাঁচটি একশো টাকার নোট তাকে দিলেন।
”যে কিনল এর বেশি দেওয়ার সামর্থ্য তার নেই।” কুণ্ঠিত স্বরে তিনি বললেন, ”আমি প্রথমে আটশো টাকা চেয়েছিলাম।”
”কী উপকার যে করলেন। রেকর্ডার—টা তো টাকা দিয়ে কিনিনি, এর থেকে যা পাওয়া যায়, তাই লাভ। সাইকেলটা এবার সারাতে পারব।”
”রানিসায়রে যাবে নাকি?”
”যাব, আপনি এগোন।”
দু’দিন পর মনোজ সামন্তের সঙ্গে বলরামের দেখা হল অফিসে ঢোকার মুখে।
”এই যে গড়গড়িদা, ডাক্তারবাবুকে ট্রায়াথলনের কথা জিজ্ঞেস করেছি। আপনি খোঁজ করছেন শুনেই তো উনি রীতিমতো তেতে উঠলেন।”
”তেতে ওঠার কারণ?” বলরাম হালকা চালে বললেন।
”ওই যে সেদিন আমাদের ওখানে বলে এলেন ‘এই কাজ আবার করব, যতদিন পারব করে যাব’, এটাই ডাক্তারবাবুকে ভীষণ নাড়া দিয়েছে। ওঁর বাড়িতে আজই সকালে গেছিলাম। চেম্বারে যাবেন বলে বেরোচ্ছিলেন, যাওয়া বন্ধ রেখে বসে পড়লেন। বললেন, বলরামবাবুর নামা উচিত ট্রায়াথলনে। ওঁর মতো লোকেরাই পারবে। পড়াশুনো করা লোক তো, ট্রায়াথলন শুরুর ইতিহাসই বলে দিলেন। ভাবতে পারেন, উনিশশো আটাত্তর সালে, তার মানে মাত্র ক’বছর আগে হাওয়াইয়ে এই স্পোর্টস—টার জন্ম দিয়েছে নেভি—র দুটি লোক। চলুন ভেতরে যাই, টেবিলে না বসলে এসব কথা গুছিয়ে বলা যায় না।”
চেয়ারে বসেও মনোজ সামন্ত গুছিয়ে বলতে পারলেন না। ”বুঝলেন দাদা, অতসব কথা মনে থাকে না। আমি বরং দু—চারটে পয়েন্ট লিখে নিয়ে আসব। তবে ওই দুটো লোক নিজেদের মধ্যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছিল এই বলে যে, শরীরের সবক’টা প্রধান প্রধান মাসলসের ক্ষমতা আর সহনশক্তি কার কত বেশি তার একটা পরীক্ষা শুরু হয়ে যাক। আর সেই পরীক্ষার জন্য ওরা ঠিক করে—”
”দেড় কিলোমিটার সাঁতার, চল্লিশ কিলো—”
”আরে না না গড়গড়িদা, এসব তো নস্যি। কত দূরত্ব দিয়ে ট্রায়াথলনের শুরুটা হয়েছিল, জানেন?…সমুদ্রে আড়াই মাইল সাঁতার, একশো বারো মাইল সাইকেল রেস আর তারপর পুরো ম্যারাথন দৌড় অর্থাৎ ছাব্বিশ মাইল তিনশো পঁচাশি গজ। বাপস। শুনেই তো আমার হাত—পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছিল। এইভাবে শরীরের ক্ষমতার পরীক্ষা মানুষে দিতে পারে। এর নাম হল ‘আয়রনম্যান ট্রায়াথলন’। আপনি যেটার কথা বলছেন তার নাম ‘টিনম্যান ট্রায়াথলন’।”
