”হার ফাদার ওয়াজ আ ‘হেল্পার’ ইন দ্য আন্না সুইমিং পুল ইন ম্যাড্রাস। হার মাদার কুপ্পুম্মা স্টিল সেলস সুগারকেন জুস ফ্রম এ পুশ কার্ট অন মেরিনা বিচ। দ্য ফ্যামিলি অব টু ডটারস অ্যান্ড টু সনস, বিলংগড টু দ্য ফিশারমেন কমিউনিটি। দে লিভড ইন আ স্মল হাট ইন ট্রিপলিকেন…
”দ্য ফাদারস ইনকাম ওয়াজ পুয়োর। ফুড ওয়াজ নট আ রেগুলার অকারেন্স। ইট ওয়াজ দ্য টিপিক্যাল ইন্ডিয়ান স্টোরি অব আ লাইফ স্টিপড ইন পভার্টি অ্যান্ড আনসারটেনিটি। বাট দ্য গার্ল আমুদা ওয়াজ পজেজড অব হাই স্পিরিটস। ডেস্পাইট দ্য ল্যাক অব ফুড…”
বলরাম বিছানায় উঠে বসলেন। গোগ্রাসে রচনাটি প্রথমবার প্রায় গিলে ফেললেন। তারপর আবার পড়তে শুরু করলেন ধীরে ধীরে। সেই জায়গাটা তিনি দু’বার—তিনবার পড়লেন যেখানে আমুদা চিনের তিয়ানজিনে তার এশিয়ান চ্যাম্পিয়ান হওয়ার কথা বলেছে।
চিনে রওনা হওয়ার আগে আমুদাকে কে যেন বলেছিল, ”হয় মেডেল নিয়ে ফিরবি, নয়তো ওখানেই মরবি।” তাই সে ঠিক করেছিল, মরতে হয় তো মরব কিন্তু শেষ একটা চেষ্টা করে যাব। তিয়ানজিন সামার লেক—এ দেড় কিলোমিটার সাঁতার শেষে আমুদা রইল তৃতীয় স্থানে। তারপর চল্লিশ কিলোমিটার সাইক্লিং শেষে সে আরও পিছিয়ে গিয়ে রইল অষ্টম স্থানে। এর পর শুরু হল দশ কিলোমিটার দৌড়। ওর সামনে সাতটি মেয়ে দৌড়চ্ছে। অনেক পিছিয়ে আমুদা।
বলরামের মনে হল, তখন এই মেয়েটার নিশ্চয়ই মনে পড়ছিল, ”মরতে হয় তো মরব কিন্তু শেষ একটা চেষ্টা করে যাব।” হাল না ছেড়ে আমুদা দৌড়তে থাকে। পাঁচ কিলোমিটার দৌড় যখন সম্পূর্ণ হল তখন সে ছ’জনকে অতিক্রম করে গেছে। তবুও অনেকদূর এগিয়ে রয়েছে লিন ইয়েন নামে চিনা মেয়েটি। ইয়েন সাঁতারে ও সাইক্লিংয়ে প্রথম হয়েছে। আমুদা তখন, কে প্রথম হয়েছে না হয়েছে, মনে করে রাখেনি। নিশ্চয়ই তখন তার দৃষ্টিতে সামনের চিনা মেয়েটি ছাড়া বিশ্বচরাচরে আর কিছু ছিল না। গতি, গতি, গতি, সে শুধু গতি বাড়িয়ে গেছে। আট কিলোমিটারের মাথায় আমুদা ধরে ফেলল ইয়েনকে। তারপর সে আরও গতি বাড়াল। যখন আমুদা টেপ ছিঁড়ল তখন সে নিঃশেষিত। শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতাটুকু আর তার নেই। অজ্ঞান হয়ে সে লুটিয়ে পড়ল। সে জানে না ইয়েনকে শেষপর্যন্ত হারাতে পেরেছে কি না। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। দু’ ঘণ্টা পর আমুদার জ্ঞান ফিরে আসতেই সে দেখল, তার দিকে তাক করা ক্যামেরার আলো ঝলসে উঠছে। আমুদা ভাবল, তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে কাগজের ফোটোগ্রাফাররা তার ছবি তুলছে। ”কনগ্র্যাচুলেশনস, আমুদা, তুমিই জিতেছ।” এই কথা শোনার পর মেয়েটির মনের অবস্থা কীরকম হয়েছিল?
অনেকক্ষণ পত্রিকাটার খোলা পাতার দিকে তাকিয়ে বলরাম আনমনার মতো বসে রইলেন। একসময় তাঁর চোখ ভিজে এল। বাড়ি থেকে, দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বিভুঁয়ে, কী লড়াইটাই না করে এল আধপেটা খাওয়া এই গরিবঘরের মেয়েটি।
বলরাম পত্রিকাটি আবার তুলে নিয়ে ভূমিকাটা মনে মনে তর্জমা করলেন : যে আমলে ভারতীয় খেলাধুলোয় সাফল্যের কোনও অস্তিত্বই নেই, তখন সতেরো বছরের আমুদা চিন থেকে জিতে এল এশিয়ান খেতাব। তার এই সাফল্য আরও বেশি সমীহ জাগায় এইজন্যই যে, সে উঠে এসেছে সুযোগ—সুবিধে না পাওয়া পটভূমি থেকে, বিজয়ী হওয়ার জন্য সত্যিকারের প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে তাকে লড়াই করতে হয়েছে।
দিনের আলো ফোটার আগেই বলরাম সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। তুলসীদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে যখন ”তুলসী, তুলসী” বলে চেঁচিয়ে ডাকলেন, তখনও কুলডাঙা গ্রামের ঘুম ভাঙেনি। দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন তুলসীর মা। বলরামকে দেখে তো তিনি অবাক।
”এত ভোরে, আপনি?”
বলরাম একটু উত্তেজিত স্বরে বললেন, ”তুলসী একটা ব্যাপার জানার জন্য খোঁজ করছিল, আমি সেটা পেয়ে গেছি, বউদি।”
সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলানো ঝুলিটা থেকে তিনি স্পোর্টস টাইম পত্রিকাটি বের করলেন। ”ওকে একটু ডেকে দেবেন?”
একটু পরেই ঘুমজড়ানো চোখে তুলসী বেরিয়ে এল। কুণ্ঠিতভাবে সে বলল, ”মেসোমশাই, জানেনই তো কেউ এলে ঘরে বসানোর জায়গা নেই।”
”আরে বসার জন্য আমি আসিনি। এই লেখাটা পড়ানোর জন্য এসেছি। পড়ে দ্যাখো। ট্রায়াথলন কী, তা তুমি জানতে পারবে। বলেছিলে না, কতটা দৌড়তে হবে, কতটা সাঁতার কাটতে হবে, কতটা সাইকেল চালাতে হবে তা তুমি জানো না। সব এতে পাবে, আর পাবে একটা মেয়ের কথা।”
”কিন্তু মেসোমশাই::—” পত্রিকাটি হাতে নিয়ে তুলসী ইতস্তত করল।
”দেড় কিলোমিটার সাঁতারের পর চল্লিশ কিলোমিটার সাইকেল তারপর দশ কিলোমিটার দৌড়, এর মধ্যে ‘কিন্তু’র কী আছে? তুমি তো সেদিনই দশ কিলোমিটার দৌড়লে। রানিসায়রে একবার এপার—ওপার করলেই দেড় কিলোমিটার হয়ে যাবে, আর সেটা তুমি পারো। বাকি রইল চল্লিশ কিলোমিটার সাইকেলে। হ্যাঁ, এতটা তোমার অভ্যাস নেই। এটা তোমায় রেগুলার প্র্যাকটিস করতে হবে।”
”কিন্তু মেসোমশাই—”
”এতে আর একটা জিনিস পাবে।” তুলসীর কথা গ্রাহ্যে না এনে, হাত থেকে পত্রিকাটি টেনে নিয়ে বলরাম পাতা উলটিয়ে বললেন, ”আমুদা, মানে যে মেয়েটির কথা এতে আছে, সে রোজ কীরকম প্র্যাকটিস করেছে, তা এখানে লেখা আছে। শোনো, ভোর সাড়ে চারটেয় সে সাইকেল নিয়ে দেড়ঘণ্টা চালায়, তারপর দৌড়য় একঘণ্টা। বাড়ি এসে স্কুলে যায়। সওয়া আটটা থেকে দুপুর আড়াইটে পর্যন্ত স্কুল। বাড়ি ফিরে সামান্য কিছু খেয়ে সে সুইমিং পুলে গিয়ে তিন ঘণ্টা সাঁতার কাটে। বাড়ি ফিরে একটু পড়াশুনো, তারপরই শুয়ে পড়া।”
