বলরাম তার হাত থেকে পত্রিকাটা নেওয়ামাত্র লোকটি ব্যস্তভাবে চলে গেল। বলরাম তখন বলতে চেয়েছিলেন, এটা আমার নয়, ট্রেনে ওঠার সময় কারও হাত থেকে পড়ে গেছে। কিন্তু বলার সুযোগই পেলেন না। মলাটে স্টেফি গ্রাফ আর মোনিকা সেলেস—এর ছবি, প্রকাশের তারিখ, চার মাস আগের। ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা’ গোছের একটা মনোভাব হল বলরামের। আমি না পেলে আমার বদলে অন্য কেউ পেত, ব্যাপারটা তো একই হত। রাত্রে এটা পড়ব স্থির করে পত্রিকাটা ঝুলিতে রেখে তিনি পরের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।
বিদ্যানগর স্টেশন থেকে বেরিয়ে স্টেশন রোডে কলাওয়ালার কাছাকাছি হয়েছেন, তখন বলরাম শুনলেন তুলসীর গলা। ”মেসোমশাই, রানিসায়রে আর সাঁতার কাটতে যান না যে?”
অস্বস্তি বোধ করলেন। না যাওয়ার কারণটা এতদিন পর না বলাই ভাল। তুলসীর চোখের এবং কণ্ঠস্বরের আন্তরিকতা থেকে তিনি বুঝলেন, মেয়েটি মনে করে রাখেনি রূঢ়ভাবে তাঁর নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের কথা।
”ঠাণ্ডা লেগে সর্দি হয়েছিল।”
”তা হলে কলা খাবেন না।”
”না, না, এখন একদম সেরে গেছে। ভাবছি কাল থেকে আবার যাব।” সবুজ সিঙ্গাপুরি কলার একটা ছড়া তুলে বলরাম তাঁর ঝুলিতে ভরতে যাচ্ছেন, তখন তুলসী হাত বাড়িয়ে বলল, ”আমার একটা।”
”একটা নয়, দুটো।” বলরাম দুটো কলা ছিঁড়লেন ছড়া থেকে। ”সাইকেলে কোথায় গেছিলে?”
”ওপারে জগন্নাথকাকার কাছে। আমিও ভাবছি কাল থেকে জলে নামব। সাইকেলটাও সারাতে হবে। মনে হচ্ছে ভালই খরচ পড়বে।”
তুলসী একহাতে কলা খাচ্ছে অন্য হাতে ধরা সাইকেল—এইভাবে সে বলরামের পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। রাস্তার ভিড়ের অংশটুকু পেরিয়ে আসার পর বলল, ”আপনার চেনাজানা কেউ আছে যে, টেপরেকর্ডার কিনবে?”
”কেন! তুমি কি বিক্রি করবে?”
”হ্যাঁ। দশ কিলোমিটারে প্রাইজ পেয়েছিলাম। আমি ওটা দিয়ে কী করব বলুন? গান শুনতে হলে তো ক্যাসেট কিনতে হবে, তার মানে খরচ! আপনার জানাশোনাদের মধ্যে যদি কেউ থাকে তো বলবেন, কেমন? একদমই নতুন, পাশের বাড়ি থেকে ক্যাসেট এনে শুধু দু—তিনবার চালিয়েছি। নতুনের থেকে কমেই দেব।”
”তোমার কি খুব টাকার দরকার?”
”হ্যাঁ, সাইকেলটা সারাব। আমাকে ট্রায়াথলনে নামতে হবে।”
”কী থলনে?” বলরাম ঝুঁকে কানটা তুলসীর দিকে এগিয়ে দিলেন।
”নতুন একটা স্পোর্টস। ট্রা—য়া—থ—ল—ন। প্রথমে সাঁতার, তারপর সাইকেল, তারপর দৌড়। পর পর, মাঝে থামাথামি নেই।”
”সে কী! এ তো খুব কষ্টকর ব্যাপার।”
তুলসীর মুখে আত্মপ্রসাদ ফুটে উঠল, ”তা তো বটেই। কষ্ট না করলে আর স্পোর্টস কীসের?”
”তোমার পায়ের নখের অবস্থা এখন কেমন?”
”নতুন নখ উঠছে, ব্যথাট্যাথা নেই।”
”তা এই ট্রায়াথলনে কোথায় নামবে? কবে হবে?”
”কিছুই জানি না। কতটা দৌড়তে হবে, কতটা সাঁতার কাটতে হবে, তাও জানি না। আজই তো জগন্নাথকাকার কাছে প্রথম শুনলাম। উনি খোঁজখবর নিয়ে আমায় জানাবেন বললেন।” তুলসী দাঁড়িয়ে পড়ল, ”মেসোমশাই, এবার আমি যাব। টেপরেকর্ডারের কথাটা মনে রাখবেন।”
”হ্যাঁ, মনে থাকবে।”
প্যাডেলে পা রেখে উঠতে গিয়েও তুলসী উঠল না একটা কথা বলার জন্য। ”জগন্নাথকাকা বললেন, একটা চাকরি হতে পারে যদি ট্রায়াথলনে ফার্স্ট হতে পারি।” তুলসী সাইকেলে উঠে প্যাডেল শুরু করল।
.
রাত্রের খাওয়ার পর বিছানায় শুয়ে টেবল—ল্যাম্প জ্বেলে বলরাম খবরের কাগজ পড়েন। পাতাগুলোয় চোখ বুলিয়ে পড়ার মতো কিছু না পেয়ে, স্পোর্টস টাইম পত্রিকাটা তুলে ছবি দেখতে লাগলেন। দেখতে দেখতে শেষের দিকে এসে পেলেন একটা লেখা এবং তার সঙ্গে চারটি ছবি। প্রথম ছবিতে একটি কিশোরী সমুদ্রতীরে বালির ওপর দৌড়চ্ছে। পরনে কালো জামা, লাল শর্টস, কেডস, পিঠের ওপর বেণী, বাঁ হাতে ঘড়ি এবং নাকে নাকছাবি। মুখের গড়ন অনেকটাই তুলসীর মতো।
আর—একটি ছবিতে : মেয়েটি একটি রেসিং সাইকেল চালাচ্ছে সমুদ্রতীরের একটি রাস্তায়। তার পেছনে একটি বালক হাসতে হাসতে দৌড়চ্ছে।
আর—একটি ছবিতে : মেয়েটি কস্টিউম পরা, মাথায় আঁট করে বসানো রবারের টুপি। সমুদ্রের কিনারে দাঁড়িয়ে।
আর—একটি ছবিতে : ক্যারামবোর্ড ঘিরে মেঝেয় ছ’জন বসে। ছবিতে বোঝা যায়, এরা একটি পরিবার। স্বামী—স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। আগের ছবিগুলির মেয়েটিও এর মধ্যে রয়েছে।
বলরাম একটু কৌতূহল বোধ করলেন প্রথম তিনটি ছবির জন্য। একটি মেয়ে তিনটি খেলায়। হয়তো সাঁতারুই, দৌড় আর সাইক্লিংটা বোধ হয় সাঁতারের ট্রেনিংয়েরই অঙ্গ। পাতা উলটে যাওয়ার আগে লেখার শুরুতে মোটা অক্ষরে কয়েক লাইনের ভূমিকাটা তিনি পড়তে শুরু করলেন।
”ইন অ্যান এরা হয়্যার সাকসেস ইন ইন্ডিয়ান স্পোর্টস ইজ অলমোস্ট নন—এগজিসট্যান্ট, সেভেনটিন ইয়ার ওল্ড সি. আমুদা হ্যাজ ওন দ্য এশিয়ান জুনিয়ার ট্রায়াথলন চ্যাম্পিয়ানশিপ ইন চায়না রিসেন্টলি। হোয়াট মেকস হার অ্যাচিভমেন্ট অল দ্য মোর কমান্ডেবল ইজ দ্যাট, শি কামস ফ্রম অ্যান আন্ডারপ্রিভিলেজড ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যান্ড হ্যাড টু স্ট্রাগল এগেনস্ট রিয়েল অডস টু ট্রায়াম্ফ।”
বলরামের হাত দুটো একবার কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ করে উত্তেজনা কমানোর জন্য সময় নিলেন। একেই কি বলে জ্যাকপট পাওয়া। মেঘ না চাইতেই জল। এই ট্রায়াথলনের কথাই তো আজ তুলসী বলল। তিনি পত্রিকাটা চোখের আরও কাছে নিয়ে এলেন।
