তুলসী মুখোমুখি সোফায় বসল।
”চাকরিবাকরির খোঁজ পেলি?”
”না। একজন বলল কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হতে, এটা জানলে আজকাল চাকরি পেতে নাকি সুবিধা হয়। গেছিলাম একটা কম্পিউটার শেখানোর টিউটোরিয়ালে। এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হতে লাগবে পৌনে পাঁচশো টাকা আর মাসে মাসে আড়াইশো।” তুলসী মাথা নামিয়ে চুপ করে গিয়ে বুঝিয়ে দিল টাকাটা তার সাধ্যের বাইরে।
জগন্নাথবাবু কয়েক সেকেন্ড ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন, ”এখানে সূর্য সঙ্ঘের দশ কিলোমিটার দৌড় কম্পিটিশনে তুই নাকি প্রথম হয়েছিস?”
”হ্যাঁ।”
”কই, সে কথা আমায় বলিসনি তো? ক্লাবের সেক্রেটারি পূর্ণেন্দু কথায় কথায় কাল আমায় বলল।”
”এ আর বলার মতো কিছু নাকি?” তুলসীর স্বর লাজুক। মনে মনে বলল, বলে কোনও লাভ হবে না বলেই বলিনি।
”বলার মতো নয়! বলিস কী? দশ কিলোমিটার মানে ছ’ মাইল। একটা গেরস্তবাড়ির মেয়ে এই ভাঙাচোরা রাস্তায়… পূর্ণেন্দু বলল নখ উঠে যাওয়ায় খালি পায়ে যন্ত্রণা নিয়ে দৌড়ে প্রথম হয়েছে! তার মানে ভীষণ কষ্ট সইবার ক্ষমতা আর জেতার ইচ্ছেটা তোর আছে। এটা তো খুব বড় ব্যাপার। এটাই কি তোর প্রথম এই দৌড়ে নামা?”
”হ্যাঁ,” বলেই তুলসী লজ্জায় কুঁকড়ে রইল। সেদিনের মিথ্যে কথাটা জগন্নাথকাকা এখনও মনে করে রেখে থাকলে তার সম্পর্কে কী ধারণা করছেন।
”আমাদের অফিসের স্পোর্টস কন্ট্রোল বোর্ডের নির্দেশ আছে, চাকরি দিতে হবে সেই স্পোর্টসে, যেটা ওলিম্পিকে আছে। সামনের ওলিম্পিকে একটা নতুন স্পোর্টস ইনক্লুডেড হয়েছে। এদেশে সেটা নেই বললেই চলে।” জগন্নাথবাবু নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসলেন।
”নাম কী স্পোর্টস—টার?” কৌতূহলভরে তুলসী জিজ্ঞেস করল। ডাকিয়ে এনে জগন্নাথকাকা নতুন একটা স্পোর্টসের খবর দিচ্ছেন কেন?
”ট্রায়াথলন।”
জগন্নাথবাবু পিঠের থেকে বালিশটা কোলের ওপর এনে ঝুঁকে বসলেন। ”পেন্টাথলন, হেন্টাথলন, ডেকাথলন শুনেছিস তো, সেইরকমই এটা হল ট্রায়াথলন। তিনটে বিষয়ে স্পোর্টস পর পর করতে হবে। প্রথমে সাঁতার, তারপর সাইক্লিং, তারপর দৌড়।”
জগন্নাথবাবু পিটপিট করে তাকিয়ে রইলেন তুলসীর মুখের দিকে। মুখে পাতলা রহস্যময় হাসি। হাসিটার অর্থ একটু একটু করে তুলসীর কাছে পরিষ্কার হল যখন, তার শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল, শিরদাঁড়া বেয়ে গরম একটা ধারা নেমে এল।
”কাকাবাবু, আমি পারব। আমি ওই তিনটেই পারি।”
”আরে সেইজন্যই তো ডেকে পাঠিয়েছি। পূর্ণেন্দুর কাছে তোর কথা শুনেই আমার স্ট্রাইক করল। আমাদের কোটার চারটে মেয়ে তো নেওয়া হয়ে গেছে আর্চারিতে, একজন এখনও বাকি, তা হলে ট্রায়াথলনে নিলে কেমন হয়? একটা নতুন ব্যাপার হবে! আর আমার মনে পড়ল, সেদিন তুই বলেছিলি, সাঁতার জানি, সাইক্লিং জানি। মনে আছে?”
তুলসী ঘাড় নাড়ল। পাঁচ মাইল দৌড়ে তার ফার্স্ট হওয়ার কথাটাও কি কাকাবাবুর মনে পড়েছিল? কিন্তু সে—সম্পর্কে কিছু তো বলছেন না!
”নতুন স্পোর্টস বোর্ডের কাছে চিঠি লিখে অ্যাপ্রুভাল আনাতে হবে। যাকে নেব, তাকে তো আগে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হবে। ট্রায়াথলনের কোনও কম্পিটিশন বাংলা হয় কি না আগে সেটার খোঁজ করি। যদি হয়, তা হলে তাতে নেমে তোকে ফার্স্ট প্লেস পেতে হবে। তারপর তোর নাম বোর্ডের কাছে পাঠাব। ব্যাপারটা বুঝলি?”
তুলসী ঘাড় নাড়ল। সে বুঝেছে বন্ধ দরজাটা একটু ফাঁক হয়েছে। সেই ফাঁকের মধ্য দিয়ে অস্পষ্টভাবে একটা চাকরি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু ওটা তো অনেক দূরের ব্যাপার, তার আগে কাছের ব্যাপারটা তাকে জেনে নিতে হবে।
”কাকাবাবু, তিনটে বিষয় পর পর কম্পিট করতে হবে, বললেন। কিন্তু কোন বিষয় কতটা করে করতে হবে?”
জগন্নাথবাবুকে এবার সামান্য বিব্রত দেখাল। ”ব্যাপারটা আমার কাছেও নতুন, ডিটেইলে কিছুই জানি না। শুনেছিলাম মাদ্রাজে নাকি ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ানশিপ হয়েছে। আমি কালই খোঁজ নেব, তুই তিন—চারদিন পরে এসে জেনে যাস। তবে এটা জানি, সাঁতার, সাইক্লিং আর দৌড় পর পর তিনটে করতে হবে। তোর তো সাইকেল আছে।”
”আছে, তবে বড্ড পুরনো, বাবা কিনেছিলেন। ওটার অনেক কিছুই পালটাতে হবে।”
”তা হলে পালটে নে। প্র্যাকটিস তো করতে হবে, আর যত শিগগির শুরু করা যায়, ততই ভাল।”
জগন্নাথবাবুর বাড়ি থেকে তুলসী যখন বেরোল, তখন বলরামবাবু ধাক্কাধাক্কি করতে করতে বিদ্যানগর স্টেশনে ট্রেন থেকে নামলেন। তাঁর হাতে ‘স্পোর্টসটাইম’ নামে একটি ইংরেজি খেলার পত্রিকা। খবরের কাগজের খেলার পাতাটি খুঁটিয়ে পড়েন কিন্তু খেলার পত্রিকা তিনি কেনেন না, এটিও কেনেননি। পেয়ে গেছেন।
বাড়ি ফেরার জন্য বিধাননগর স্টেশনে বলরাম চল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করার পর একটি ট্রেন এল। এত ভিড় যে, কামরার দরজা দিয়ে মানুষ উপচে বেরিয়ে রয়েছে। প্ল্যাটফর্মে যারা অধৈর্য হয়ে অপেক্ষা করছিল তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল দরজায়। সেই ঝাঁপানোদের মধ্যে বলরাম নিজেকে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন এবং মুহূর্তে নিজের ভুল বুঝতে পেরে পিছিয়ে আসেন।
ট্রেনটি যখন ছাড়ল, তখনও কেউ কেউ ওঠার জন্য মরিয়া হয়ে ট্রেনের সঙ্গে ছুটল। বলরাম চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া ট্রেনটির দিকে যখন হতাশ চোখে তাকিয়ে, তখন একটি লোক যেতে যেতে থেমে গিয়ে, তাঁর পায়ের কাছ থেকে একটি রঙিন মলাটের পত্রিকা কুড়িয়ে তুলে নিয়ে বলল, ”আপনার ম্যাগাজিনটা পড়ে গেছে।”
